বাংলাদেশ-সিঙ্গাপুর বৈঠক : বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আলোচনা

সিঙ্গাপুরের বিভিন্ন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। ছবি: সংগৃহীত
বাণিজ্য, বিনিয়োগ, দক্ষ জনশক্তি উন্নয়ন, জ্বালানি ও জলবায়ু সহযোগিতা এবং রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে সিঙ্গাপুরের সঙ্গে আলোচনা করেছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে বাংলাদেশ-সিঙ্গাপুর মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) দ্রুত সম্পন্ন এবং বাংলাদেশে সিঙ্গাপুরের বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর দেওয়া হয়েছে গুরুত্ব।
মঙ্গলবার সিঙ্গাপুরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. ভিভিয়ান বালাকৃষ্ণান এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জুলকারনাইন আবদুল রহিমের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। বৈঠকে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের বিষয়ে সন্তোষ প্রকাশ করে এবং দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা আরও জোরদার করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে দুই পক্ষ।
সিঙ্গাপুরের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়। শামা ওবায়েদ ইসলাম তৈরি পোশাকের পাশাপাশি ওষুধ, সিরামিক, কৃষিপণ্য এবং পাট ও পাটজাত পণ্যসহ বিভিন্ন পণ্যে বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়ানোর সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন। তিনি লজিস্টিকস, সরবরাহ ব্যবস্থা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও গবেষণা খাতে সিঙ্গাপুরের বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানান।
বাংলাদেশ-সিঙ্গাপুর এফটিএ দ্রুত সম্পন্ন করার আশাবাদ ব্যক্ত করে উভয় পক্ষ। এ ছাড়া দক্ষতা উন্নয়ন, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা এবং সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহযোগিতার বিষয়েও হয় আলোচনা। সিঙ্গাপুরের প্রবীণ সেবা ও নার্সিং খাতে বাংলাদেশি নার্সদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর প্রস্তাব দেন শামা ওবায়েদ ইসলাম।
বৈঠকে জলবায়ু পরিবর্তন, পানি নিরাপত্তা, কার্বন ক্রেডিট, গবেষণা, সাইবার নিরাপত্তা ও ডিজিটালাইজেশন নিয়েও মতবিনিময় হয়। মশাবাহিত রোগ মোকাবিলায় সহযোগিতার বিষয়টিও আলোচনায় আসে।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্তমান সরকারের ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির কথা তুলে ধরে শামা ওবায়েদ ইসলাম জানান, স্থিতিশীলতা, শান্তি ও গণতন্ত্র, অর্থনৈতিক কূটনীতি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সুশাসনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। সার্ক পুনরুজ্জীবিত করার বিষয়ে বাংলাদেশের আগ্রহের কথাও জানান।
বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আলোচনা করে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও টেকসই প্রত্যাবাসনে সিঙ্গাপুরের সমর্থন চান শামা ওবায়েদ ইসলাম। সংকটটির ব্যাপক নিরাপত্তাগত প্রভাবের কথাও তুলে ধরেন। জবাবে জুলকারনাইন আবদুল রহিম অব্যাহত সংলাপ ও সম্পৃক্ততার গুরুত্ব তুলে ধরে রোহিঙ্গাদের প্রতি সিঙ্গাপুরের মানবিক সহায়তার কথা উল্লেখ করেন।
পরে সিঙ্গাপুরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. ভিভিয়ান বালাকৃষ্ণানের সঙ্গে বৈঠকে দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন শামা ওবায়েদ ইসলাম। এ সময় বাংলাদেশে বিশেষ করে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, লজিস্টিকস, গবেষণা ও উদীয়মান খাতে সিঙ্গাপুরের বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি। একটি ব্যবসাবান্ধব ও অনুমানযোগ্য বিনিয়োগ পরিবেশ তৈরিতে বাংলাদেশের অঙ্গীকারও পুনর্ব্যক্ত করেন প্রতিমন্ত্রী।
বৈঠকে জ্বালানি নিরাপত্তা, জ্বালানি সরবরাহ, নৌপরিবহন, বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার ঝুঁকি, জলবায়ু পরিবর্তন, পানি নিরাপত্তা এবং অবৈধ ও অনিয়মিত অভিবাসন নিয়েও আলোচনা হয়। নিরাপদ, নিয়মিত ও সুশৃঙ্খল অভিবাসনের গুরুত্ব তুলে ধরেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান এবং তাদের মিয়ানমারে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও টেকসই প্রত্যাবাসনে সিঙ্গাপুরের সমর্থনও চান তিনি। একই সঙ্গে সার্ক পুনরুজ্জীবন এবং আসিয়ানের সংলাপ অংশীদার হওয়ার বাংলাদেশের আগ্রহের কথা তুলে ধরে সিঙ্গাপুরের সহযোগিতা কামনা করেন।
বৈঠকের পাশাপাশি পোর্ট অব সিঙ্গাপুর অথরিটি (পিএসএ) পরিদর্শন করেন শামা ওবায়েদ ইসলাম। সেখানে পিএসএর মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া, আফ্রিকা ও তুরস্ক অঞ্চলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ভিনসেন্ট এনজি এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন তিনি। এ সময় পিএসএর বৈশ্বিক কার্যক্রম এবং অটোমেশন ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে দক্ষ, টেকসই ও স্মার্ট বন্দর উন্নয়নের বিষয়ে তাকে অবহিত করা হয়।
ভিনসেন্ট এনজি বে টার্মিনাল প্রকল্পে অংশগ্রহণের আগ্রহ প্রকাশ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, এ প্রকল্প চট্টগ্রাম বন্দর এবং বাংলাদেশের বাণিজ্য ও যোগাযোগব্যবস্থা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর সম্ভাবনা রাখে। পিএসএর আগ্রহকে স্বাগত জানিয়ে বন্দর উন্নয়ন, লজিস্টিকস, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে সহযোগিতা বাড়ানোর আশা প্রকাশ করেন শামা ওবায়েদ ইসলাম।
পরে বিকেলে তুয়াস ওয়েস্ট-টু-এনার্জি প্ল্যান্ট পরিদর্শন করেন এ মন্ত্রী। সেখানে দেশটির বর্জ্য সংগ্রহ ও পরিশোধনের সমন্বিত ব্যবস্থা সম্পর্কে তাকে অবহিত করে সিঙ্গাপুরের জাতীয় পরিবেশ সংস্থা (এনইএ)।





