রোহিঙ্গা সংকট
‘মিয়ানমারেই সংকট, সমাধানও মিয়ানমারে’ জাতিসংঘে ৫ প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর

ছবি: আগামীর সময়
রোহিঙ্গা সংকটের মূল কারণ মিয়ানমারে, তাই এর সমাধানও মিয়ানমারেই করতে হবে বলে জাতিসংঘে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, মানবিক সহায়তা রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তার অজুহাত হতে পারে না। একই সঙ্গে অনির্দিষ্টকাল এই সংকটের বোঝা বাংলাদেশের ওপর চাপিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়।
আজ বুধবার সকালে নিউইয়র্কে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আয়োজিত উচ্চপর্যায়ের এক বৈঠকে দেওয়া বক্তব্যে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশ ও গাম্বিয়ার যৌথ আয়োজনে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সাইডলাইনে বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, কয়েক দশক ধরে মিয়ানমারে বৈষম্য, নিপীড়ন ও বঞ্চনার শিকার হয়ে আসছে রোহিঙ্গারা। ১৯৭৮ সালসহ পরবর্তী সময়ে কয়েক দফায় বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের আগমন ঘটে। বিভিন্ন সময়ে প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও ২০১৭ সালের সহিংসতার পর সংকট আরও গভীর হয়।
‘৯ বছরেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। মিয়ানমারে সহিংসতার কারণে এখনো মানুষ পালিয়ে আসছে। শরণার্থী শিবিরগুলোতে প্রতিবছর হাজার হাজার শিশুর জন্ম হচ্ছে। ফলে দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে নতুন একটি প্রজন্ম’— উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।
তারেক রহমান বলেন, মায়েরা নিরাপদ ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখছেন। তরুণরা অনিশ্চয়তার মধ্যে বেড়ে উঠছে। আর বয়স্করা ফেলে আসা ঘরবাড়ি ও গ্রামে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা পোষণ করছেন।
১২ লাখ রোহিঙ্গার ভার বাংলাদেশের কাঁধে
প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানবিকতার তাগিদেই বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের জন্য সীমান্ত খুলে দিয়েছিল। বর্তমানে শিবিরগুলোতে খাদ্য ও স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হচ্ছে। প্রায় ৬ হাজার শিক্ষাকেন্দ্রে মিয়ানমারের পাঠ্যক্রম অনুসারে রোহিঙ্গা শিশুদের শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। তরুণদের সক্ষমতা ও দক্ষতা উন্নয়নে প্রশিক্ষণও দেওয়া হচ্ছে, যাতে ভবিষ্যতে তারা রাখাইন রাজ্যে ফিরে পুনর্বাসিত হতে পারে।
তবে দীর্ঘ সময় বসবাসের জন্য শরণার্থী শিবির কোনো আদর্শ স্থান নয় বলেও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।
রোহিঙ্গা সংকটের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপরও পড়ছে বলেও উল্লেখ করলেন প্রধানমন্ত্রী। এতে বাংলাদেশের ওপর সামাজিক, অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও নিরাপত্তাজনিত চাপ বাড়ছে।
দীর্ঘ অনিশ্চয়তা ও হতাশা থেকে মানবপাচার, অভিবাসী পাচার, মাদক পাচারসহ বিভিন্ন আন্তঃসীমান্ত অপরাধের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে বলেও সতর্ক করলেন তারেক রহমান। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অনেকে নৌপথে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার চেষ্টা করছেন। একটি দেশের অমীমাংসিত কোনো সংকট পুরো অঞ্চলের জন্য একটি নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জে পরিণত হতে পারে বলেও মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী।
কমছে মানবিক সহায়তা
রোহিঙ্গা সংকটে আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা কমে যাওয়ার বিষয়টিও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
‘২০২৫ সালের যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনায় ৯৩৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি সহায়তা চাওয়া হয়েছিল। ২০২৬ সালের জন্য সেই আবেদন কমিয়ে প্রায় ৭১০ মিলিয়ন ডলারে আনা হয়েছে। এই অর্থ কেবল ন্যূনতম জীবনরক্ষাকারী প্রয়োজন মেটানোর জন্য প্রয়োজন’—উল্লেখ করেন তারেক রহমান।
বাংলাদেশের পাশে থাকা আন্তর্জাতিক অংশীদারদের প্রতি কৃতজ্ঞতাও জানালেন প্রধানমন্ত্রী। বললেন, এখন তাদের সহায়তা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রয়োজন।
‘মানবিক সহায়তা রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তার অজুহাত নয়’
রোহিঙ্গা সংকটের দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানবিক সহায়তা রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তার অজুহাত হতে পারে না। একইভাবে অনির্দিষ্টকাল ধরে এই দায়িত্ব শুধু বাংলাদেশের পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে এবং এর সমাধানও মিয়ানমারেই নিহিত। রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতি এখনো গভীরভাবে উদ্বেগজনক।
রোহিঙ্গারা এখনো জোরপূর্বক নিয়োগ, নির্বিচারে আটক, চলাচলে বিধিনিষেধ ও জোরপূর্বক শ্রমসহ বিভিন্ন ধরনের নিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখি হচ্ছে। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ও আরাকান আর্মি—উভয়ের বিরুদ্ধেই গুরুতর লঙ্ঘনের অভিযোগের তথ্য রয়েছে উল্লেখ করেন তারেক রহমান।
এ অবস্থায় রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ এখনো নিশ্চিত হয়নি বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে পাঁচ প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর
রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে পাঁচটি জরুরি পদক্ষেপ তুলেও ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রথমত, রোহিঙ্গাদের দ্রুত, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক অংশীজনদের একটি স্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে। মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ তৈরিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও অন্যান্য রাষ্ট্রকে তাদের প্রভাব কাজে লাগাতে হবে।
দ্বিতীয়ত, রোহিঙ্গাসহ মিয়ানমারের বেসামরিক মানুষের ওপর সহিংসতা বন্ধ করতে হবে। নিজভূমিতে রোহিঙ্গাদের মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তারা ফিরে যাওয়ার বিষয়ে আস্থা পায়।
তৃতীয়ত, রোহিঙ্গা ও আশ্রয়দাতা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত ও পূর্বানুমানযোগ্য মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার কারণে কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন যেন বাধাগ্রস্ত না হয়, সেদিকেও নজর দিতে হবে।
চতুর্থত, টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে জবাবদিহি নিশ্চিতের উদ্যোগে গাম্বিয়ার নেতৃত্বের প্রশংসা করেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক বিচারিক ও তদন্ত প্রক্রিয়ায় অব্যাহত সমর্থনের আহ্বান জানান তিনি। গুরুতর অপরাধের জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার কথাও বলেন প্রধানমন্ত্রী।
পঞ্চমত, মাদকভিত্তিক অর্থনীতি, মানবপাচার, ডিজিটাল প্রতারণা, অবৈধ অস্ত্রসহ অন্যান্য আন্তঃসীমান্ত অপরাধ মোকাবিলায় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করতে হবে।
‘রোহিঙ্গাদের চিরদিন বাস্তুচ্যুত থাকতে হবে না’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ চায় না রোহিঙ্গারা চিরদিন বাস্তুচ্যুত অবস্থায় থাকুক। তাদের নিজভূমি মিয়ানমারে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তন এবং অধিকার সুরক্ষাই বাংলাদেশের লক্ষ্য
প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরি হলে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশ সহায়তা করতে প্রস্তুত বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।
তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশ মানবিকতার জায়গা থেকে তার দায়িত্ব পালন করেছে। এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কেও দৃঢ়তার সঙ্গে নিজেদের দায়িত্ব পালন করতে হবে।
রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ যেন নিপীড়ন, বিতাড়ন ও বাস্তুচ্যুতির আরেকটি গল্প না হয়—বরং তা যেন ন্যায়বিচার, মর্যাদা ও আশার গল্প হয় বিশ্বনেতাদের কাছে এমন প্রত্যাশাও রাখলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।



