ছেঁড়া-ফাটা ১০-২০ টাকার নোট হয়ে উঠেছে ঝগড়ার কারণ
- বাজারে থাকা ১০ ও ২০ টাকার বেশিরভাগ নোটই এখন ছেঁড়া-ফাটা
- ছেড়া নোট নিয়ে বাসে-বাজারে প্রতিনিয়ত হচ্ছে বচসা
- বাংলাদেশ ব্যাংক জানাল, ২০ টাকার নতুন নোট ছাপা হচ্ছে, ১০ টাকারও হবে

বাজারে থাকা ১০ ও ২০ টাকার নোটের অধিকাংশই এখন এমন জীর্ণ। ছবি: আগামীর সময়
‘অন্য টেকা থাকলে দেন, না থাকলে নাইমা যান’- বাসযাত্রীকে কথাটা বললেন চালকের সহকারী মো. শাহাবুদ্দিন। তারপরই লাগল ঝগড়া। এর সূত্রপাত ১০ টাকার একটি নোট, যা ওই যাত্রী ভাড়া হিসেবে দিয়েছিলেন। কিন্তু শাহাবুদ্দিন তা নেবেন না। কারণ ছেঁড়া এই নোট চালানো যাবে না। শাহাবুদ্দিন যুক্তি দেখালেন, ‘এই ছেঁড়া টেকা আমি যদি আপনারে দিই, আপনিও তো নিবেন না।’
রাজধানীর ৮ নম্বর রুটের বাসের তিন দিন আগের গল্প এটি। এমন ঝগড়া এখন বাসে নিত্যদিনের। আর তা মূলত ১০ ও ২০ টাকার নোট নিয়ে। এই মূল্যমানের নোটের ব্যবহার বেশি, অতি ব্যবহারে এগুলো জীর্ণও হয়েছে বেশি। তাই যাত্রী-পরিবহনকর্মী কেউই নিতে চান না।
এই ১০ কিংবা ২০ টাকার নোট নিয়ে সমস্যার কথা জানালেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবী জোনায়েদ আহমেদ। বাজারে থাকা এই মূল্যমানের বেশিরভাগ নোটের অবস্থা একই বলে বাধ্য হয়ে নিতে হয় বলে জানান তিনি।
তার ভাষ্যে, ‘১০ টাকা আর ২০ টাকার এই দুই নোটের অবস্থা দেখলে মনে হয় যে কেউ নেবে না। একবার নিলে মাথায় চিন্তা শুরু হয়ে যায়, এই টাকা আবার কাকে দেব?’
ছেঁড়া টাকা নিয়ে বাগবিতণ্ডা হয়েছে কি না- জানতে চাইলে জোনায়েদ বলেন, ‘লোকাল বাসের হেলপারদের সাথে প্রায়ই তর্ক হয়। শুধু আমার না, বাসের অন্য যাত্রীদের সাথেও মাঝেমধ্যেই ঝামেলা শুরু হয়।’
পরিবহনকর্মী শাহাবুদ্দিনও জানালেন, ভাড়া তুলতে গিয়ে যাত্রীদের সঙ্গে প্রতিনিয়ত ঝগড়া হয়।
‘আমি ছিঁড়া টেকা নিমু, সমস্যা নাই। কিন্তু সেই টেকা যদি আবার আরেক যাত্রীরে দেই, সে নিতে চায় না। যদি কোনো দোকান থেকে কিছু কিনতে যাই, সেও নিতে চায় না। যদি সবাই নিত, তাইলে আমিও নিতাম,’ বলেন তিনি।
শুধু বাসে নয়, মুদি দোকানেও একই সমস্যা। দোকানিরা জানালেন, ১০ টাকা ও ২০ টাকার নোটের মান এখন খুবই খারাপ।
মুদি দোকানি বিল্লাল হোসেন বললেন, ‘এখন এই দুইটা নোটের অবস্থা কাগজের চাইতেও খারাপ হইয়া গেছে। প্রতিদিন যদি ১০০টা ১০ টাকার নোট পাই, তার মধ্যে ৯৫টাই ছেঁড়া। বাকি ৫টার অবস্থা যে খুব ভালো থাকে, তাও না।’
‘কাস্টমারের কাছে থিকা না নিতে চাইলে বলে আমিই নাকি এই ছেঁড়া নোট দিছি। তখন তো আর না নেওয়া ছাড়া উপায় থাকে না।’
সেই নোট নিয়ে আবার বিপত্তিতে পড়তে হয় বিল্লালকে।
‘আমরা নিই ঠিকই, কিন্তু আমরা যদি আবার কোনো কাস্টমাররে দিই, তারা আবার নিতে চায় না।’
তখন এই ছেঁড়া নোট নিয়ে কী করেন- এ প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘যেসব কোম্পানি থিকা মাল নেই, সেই কোম্পানির লোকদের দিয়া দেই। আর যদি তারাও না নিতে চায়, তাইলে অনেকগুলো জমলে গুলিস্তান যাই। সেখান থিকা টাকা চেঞ্জ কইরা আনি।’
ঢাকার গুলিস্তান, মতিঝিলে নতুন নোট কেনাবেচা হয়; যদিও ব্যাংকগুলোতে গিয়ে ছেঁড়া নোট বদল করে নেওয়া যায়। তা দেওয়ার নির্দেশনাও বাংলাদেশ ব্যাংকের রয়েছে।
কিন্তু ব্যাংকে গিয়ে অনেক সময়ই সেই সেবাটি পাওয়া যায় না বলে অভিযোগ যেমন রয়েছে, আবার ভিড়ের কারণে অনেকে ব্যাংকমুখো হতে চান না। আবার ব্যাংকে গিয়ে যে ছেঁড়া নোট বদলে নেওয়া যায়, তা অনেকে জানেনই না।
এই বিড়ম্বনার অবসান ঘটাতে পারে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নতুন নোট সরবরাহ বাড়ানো, এমনটাই মনে করেন বেসরকারি চাকরিজীবী জোনায়েদ।
তিনি বলেন, ‘সরকারের উচিত, দ্রুত নতুন টাকা ছাপিয়ে বাজারে ছাড়া। বিশেষ করে ১০ এবং ২০ টাকার নোট। কারণ এই অবস্থায় চলতে থাকলে কয়দিন পর ভালো কোনো ১০ টাকা আর ২০ টাকার নোটই পাওয়া যাবে না।’
বাংলাদেশ ব্যাংক তা কি করবে? জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেছেন, ‘আমরা ২০ টাকার নোট ছাপানো শুরু করেছি। ১০ টাকার নোট ছাপানোও কিছুদিনের মধ্যে শুরু করব।’



