বিতর্কের মঞ্চ থেকে রাজনীতির মালঞ্চে
- ৯০ দশকে দেন ঢামেক বিতর্ক দলে নেতৃত্ব
- মন্ত্রিত্বে নিজের পেশাগত অভিজ্ঞতাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন
- ২০০৯ সালে যুক্ত হন রাজনীতিতে

স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত
একসময় বিতর্ক ছিল তার মঞ্চ। যুক্তিজালে প্রতিপক্ষকে আটকাতেন, আবার প্রতিপক্ষের কথাও শুনতেন মন লাগিয়ে। নব্বই দশকের শুরুতে ঢাকা মেডিকেল কলেজের বিতর্ক দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন। ১৯৯২-৯৩ সালে জাতীয় টেলিভিশন বিতর্ক প্রতিযোগিতায় তার দল চ্যাম্পিয়ন হয়। সেই দলের প্রথম বক্তা ছিলেন দিলশাদ হোসেন, দ্বিতীয় বক্তা শামসুল কবির বাবু আর দলনেতা এম এ মুহিত। সেই দলনেতাই এখন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী। ইংল্যান্ডে ডাক্তারি করছেন প্রথম বক্তা। আর দ্বিতীয় বক্তা হলি ফ্যামিলি মেডিকেল কলেজের হেপাটোলজির প্রফেসর।
তবে বিতর্কে এম এ মুহিতের পথচলা শুরু আরও আগে। রেসিডেনসিয়াল মডেল স্কুলের বিতর্ক দলের অধিনায়ক ছিলেন, পরে ঢাকা কলেজের দলেও নেতৃত্ব দিয়েছেন। দীর্ঘ সময় কেটেছে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সঙ্গে। তার সময়ের বিতর্কের পরিসরও ছিল বিস্তৃত— ঢাকা মেডিকেল কলেজ, বুয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে বিতর্ক ছিল এক ধরনের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অংশ।
সেই সময় ১৯৯০-এর গণআন্দোলনের পর কবিতা আবৃত্তি, পথনাটক, নাটক, বিতর্ক— সব মিলিয়ে সাংস্কৃতিক পরিসরে যে জাগরণ তৈরি হয়েছিল, এরই অংশ ছিলেন তারা। সেই সময়ের কথা বলতে গিয়ে এম এ মুহিতের চোখে যেন ফিরে আসে অন্য এক বাংলাদেশ।
ব্যান্ডসংগীতের সুরের মূর্ছনা, ছন্দের অনুরণনে মুখর কবিতা উৎসব, বিতর্কের তির্যক যুিক্ত আর নাটকের রূপক সংলাপ। মুহিতের ভাষায়— সময়টা ছিল সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণের। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর যার দেখা মেলেনি। কিন্তু বিতর্ক তার কাছে শুধু প্রতিযোগিতার বিষয় ছিল না। বরং জীবন ও পেশায় সেটি হয়ে উঠেছিল এক ধরনের প্রশিক্ষণ। বিতর্ক তাকে শিখিয়েছে— মতভেদ মানেই বিরোধ নয়। অন্যের কথা শুনতে হয়, যুক্তি দিয়ে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে হয় আর আলোচনার উদ্দেশ্য শুধু জেতা নয়; প্রয়োজনে অন্যের যুক্তিতে নিজের অবস্থানও বদলাতে হয়।
এ শিক্ষার ব্যবহার তিনি পেয়েছেন পেশাজীবনেও। চিকিৎসাশাস্ত্রে পড়াশোনা শেষ করে উচ্চশিক্ষার জন্য যান ইংল্যান্ডে। সেখানে জনস্বাস্থ্যে পিএইচডি করেন, দুটি মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন, যুক্ত হন শিক্ষকতা ও গবেষণায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর সময়ও বিতর্কের অভিজ্ঞতা কাজে দিয়েছে। কারণ গবেষণার বিষয় গুছিয়ে উপস্থাপন করা, প্রশ্নের উত্তর দেওয়া এবং যুক্তি দিয়ে নিজের বক্তব্য প্রতিষ্ঠা করা— সবকিছুর সঙ্গে বিতর্কের মিল আছে।
তবে তার জীবনের আরেকটি মঞ্চ তৈরি হয়েছিল আরও আগে— বাবার সঙ্গে গ্রামে গ্রামে ঘুরে। বাবা এম এ মতিন ছিলেন চিকিৎসক ও চক্ষুবিশেষজ্ঞ। গ্রামে চোখের ছানি অপারেশনের ক্যাম্প হতো। বাবার সঙ্গে ছোটবেলায় সেসব ক্যাম্পে যেতেন মুহিত। এক দিনের একটি দৃশ্য তার মনে গেঁথে আছে। বাবা বলেছিলেন, ‘আজকে তোমাকে ম্যাজিক দেখাব।’ অস্ত্রোপচারের আগে যিনি নিজের আঙুলও গুনতে পারতেন না, ব্যান্ডেজ খোলার পর সেই রোগী আঙুল গুনতে পারছেন। শিশুমনে সেটিই ছিল ম্যাজিক। আর সেই ম্যাজিক দেখানো মানুষটিই হয়ে উঠেছিলেন তার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জাদুকর। তখনই চক্ষু চিকিৎসক হওয়ার ইচ্ছা তৈরি হয়।
সাধারণত মূল পেশাকে সেকেন্ডারি করে ফেলেন সেলিব্রেটিরা। ইংল্যান্ডে গিয়ে চক্ষুবিজ্ঞানে আর পাবলিক হেলথে পড়াশোনা করেছেন, শিক্ষকতা ও গবেষণা করেছেন। সার্কেলটা পূর্ণ করে রাজনীতিতে এসেছেন। কোনটা ঠিক? মাঝপথে অন্য কিছুর সঙ্গে মিশে যাওয়া নাকি পূর্ণতা নিয়ে জার্নি শেষ করে কোনো কিছুর সঙ্গে যুক্ত হওয়া।
গত ২২ সেপ্টেম্বর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে নিজের দপ্তরে এই প্রতিবেদককে বলেছিলেন মুহিত। তার কাছে মনে হয়েছে সবকিছুর পূর্ণতায় যাওয়া দরকার। চিকিৎসক হওয়ার পথ পেরিয়ে কাজের পরিধি বাড়িয়েছেন। দেশের ৬৪ জেলায় প্রান্তিক মানুষের স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। তার নিজের ভাষায়— জীবনের নানা অভিজ্ঞতা ছিল আলাদা আলাদা ‘ডট’। শিক্ষা, গবেষণা, বিতর্ক, জনস্বাস্থ্য— একসময় সেসব ডটকে যুক্ত করে তিনি বুঝলেন, মানুষের কাছাকাছি দীর্ঘমেয়াদে কাজ করতে হলে রাজনীতিও একটি পথ হতে পারে।
২০০৯ সালে দেশে ফেরার পর সরাসরি বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত হন তিনি। নির্বাচনী এলাকা সিরাজগঞ্জ-৬, শাহজাদপুর। তবে রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার আগেই মানুষের জন্য কাজের একটি পরিসর তৈরি করেছিলেন। যদিও ২০০০ সাল থেকেই তার প্রতিষ্ঠিত চাইল্ড সাইট ফাউন্ডেশন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষের জন্য কাজ করছে।
রাজনীতি কোনো অচেনা জগৎ ছিল না। তার বাবা ডা. এম এ মতিন, জিয়াউর রহমানের প্রথম মন্ত্রিসভায় স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে স্বাস্থ্যমন্ত্রীসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন। হয়েছিলেন এরশাদ সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। মাতামহও ছিলেন মন্ত্রী। মামা ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু রয়েছেন বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে।
তবে পারিবারিক রাজনৈতিক পরিচয় নিজের রাজনীতিতে প্রবেশের একমাত্র কারণ হিসেবে দেখেন না মুহিত। বরং তার পরিবারে একটি ধারণা ছিল— আগে নিজের পেশায় প্রতিষ্ঠিত হতে হবে, তারপর রাজনীতিতে আসা।
এ কারণেই মন্ত্রিত্বের ক্ষেত্রে নিজের পেশাগত অভিজ্ঞতাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন তিনি। প্রতিবেদককে বলছিলেন, যে মন্ত্রণালয়ের বিষয় সম্পর্কে একজন মন্ত্রীর পূর্বজ্ঞান থাকে, সেখানে কাজের সুবিধা হয়। জনস্বাস্থ্য নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করার কারণে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাজের ‘অন্য পাশ’টিও তিনি বুঝতে পারেন— যাকে নিজের বাড়তি সুবিধা হিসেবে দেখেন।
তবে পেশাগত যোগ্যতাই রাজনীতির সবকিছু নয়। তার জীবন বরং দেখায়, একটি থেকে আরেকটি পেশায় যাওয়ার পথ সরলরেখার মতো নয়। বিতর্কের মঞ্চে দাঁড়িয়ে যে মানুষটি যুক্তি সাজাতে শিখেছিলেন, চিকিৎসাবিদ্যা তাকে নিয়ে গেছে জনস্বাস্থ্যে, জনস্বাস্থ্য তাকে পৌঁছে দিয়েছে দেশের নানা প্রান্তের মানুষের কাছে আর সেই অভিজ্ঞতার পর তিনি বেছে নিয়েছেন রাজনীতির পথ।
বিতর্কের সেই পুরনো শিক্ষা অবশ্য এখনো তার সঙ্গে আছে— কথা বলার আগে শুনতে হয়। প্রতিপক্ষের যুক্তিকে ব্যক্তিগত আক্রমণ হিসেবে নেওয়া যায় না। যুক্তির মোকাবিলা করতে হয় যুক্তি দিয়ে। আর আলোচনার উদ্দেশ্য শুধু জয় নয়— বোঝাপড়া তৈরি করা।
তাই তার জীবনের গল্পটিকে শুধু একজন চিকিৎসক, জনস্বাস্থ্যকর্মী কিংবা রাজনীতিকের গল্প বললে হয়তো পুরোটা বলা হবে না। এক মঞ্চ থেকে আরেক মঞ্চে যাওয়া একজন মানুষের গল্প এটি। যে মঞ্চে একসময় ছিল বিতর্ক, সেখানে শিখেছিলেন যুক্তি; পরে জনস্বাস্থ্যের মাঠে শিখেছেন বাস্তবতা; আর এখন দাঁড়িয়ে আছেন রাজনীতির উত্তপ্ত ময়দানে।
বিতর্কের মঞ্চ থেকে রাজনীতির উত্তপ্ত ময়দানে— এম এ মুহিতের পথচলাটা তাই আসলে আলাদা আলাদা গল্প নয়; পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাওয়া কয়েকটি ‘ডট’-এর গল্প।



