ঢাকার বাসে দিনে চাঁদা ৫২ লাখ
- পরিবহন কোম্পানি চালানোর নামে এই টাকা তোলা হয়
- সব পরিবহন ধরলে ঢাকায় চাঁদা ২ কোটি ছাড়াবে

সংগৃহীত ছবি
সাইনবোর্ডে ১২০, শনির আখড়ায় ২০০, বৌদ্ধমন্দির ১১৭০, খামারবাড়ি ৪০, রেডিও কলোনি ৭০, বাইপাইল ৫০— এখানে শেষ। আবার উল্টো— বাইপাইল ৪০, রেডিও কলোনি ৭০, কলেজগেট ৪০, মৌচাক ৫০, বৌদ্ধমন্দির ৭০, শনির আখড়া ২০০। সাইনবোর্ড থেকে বাইপাইল, মধ্যে ঢাকা। এই পথে নিত্য চলা অনেক বাসের একটি লাব্বাইক পরিবহনের চাঁদা তোলার অঙ্ক এটি। এসব জায়গায় বাস থামলেই লাব্বাইকের প্রতিটি বাসকে নির্দিষ্ট অঙ্কের চাঁদা দিয়ে পরের গন্তব্যে রওনা দিতে হয়। প্রথম ট্রিপে চাঁদার পরিমাণের তুলনায় দ্বিতীয় ট্রিপে চাঁদার টাকা কম থাকে।
যাত্রাপথে এমাথা থেকে ওমাথা যেতে ছয় জায়গায়, আবার ফিরতি পথেও ছয় জায়গায় দিতে হয় চাঁদা। লাব্বাইক বাসের সাইনবোর্ড থেকে বাইপাইল যেতে দিতে হয় ১ হাজার ৬৫০ টাকা। ফিরতি পথে ৪৮০ টাকা। পরেরবার যাওয়ার পথে দিতে হয় ৫৫০ টাকা। ফিরতি পথে অঙ্ক একই থাকে ৪৮০ টাকা। একটি বাস দিনে দুই ট্রিপে মোট ২৪ জায়গায় চাঁদা দেয়। সব মিলিয়ে লাব্বাইক পরিবহনের একটি বাস থেকে চাঁদা তোলা হয় ৩ হাজার ১৬০ টাকা। এই চাঁদা থেকে কোম্পানির পরিচালন বোর্ড, চাঁদা তোলায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের বেতন-ভাতা বাবদ খরচ হয় ৬৯২ টাকা। লাব্বাইক পরিবহনের বাস চলে প্রায় ৭০টি। অর্থাৎ কোম্পানির খরচের নামে প্রতিদিন চাঁদা তোলা হয় ২ লাখ ২১ হাজার ২০০ টাকা। আর টোলসহ কোম্পানির দৈনিক খরচ হয় ৪৮ হাজার ৪৪০ টাকা।
এ তো গেল এক পরিবহনের কথা। ঢাকা পরিবহন মালিক সমিতির তথ্য বলছে, প্রায় ছয় হাজারের মতো বাস উপযুক্ত রয়েছে ঢাকায় চলাচলের জন্য। এর মধ্যে দিনে গড়ে চার থেকে সাড়ে চার হাজার বাস চলে ঢাকার সড়কে। সব বাসকেই কমবেশি চাঁদা দিয়ে চলাচল করতে হয়। সর্বনিম্ন চাঁদার পরিমাণ ৫০০ টাকাও হয়ে থাকে। সব মিলিয়ে গড়ে একটি বাস থেকে ১ হাজার ২৫০ টাকা চাঁদা তোলা হয়। প্রতিদিন গড়ে ৪ হাজার ২০০ বাস চলাচল করে ধরে এই হিসাবে দিনে অন্তত সাড়ে ৫২ লাখ টাকা চাঁদা তোলা হয়।
লাব্বাইক পরিবহনের বাস থেকে চাঁদা নেওয়া প্রসঙ্গে জানতে চাওয়া হলে কোম্পানিটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ হাসান কথা বলতে রাজি হননি। তিনি বললেন, ‘আমি এ বিষয়ে কথা বলব না। আপনার খোঁজ আপনি নেন।’
তবে কোনো ধরনের ভণিতা ছাড়াই বিষয়টি স্বীকার করে নেন ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব সাইফুল আলম। আগামীর সময়কে তিনি বলছিলেন, ‘দিনে ৫০ লাখ টাকার মতো চাঁদা উঠতে পারে। পরিবহন মালিকরা কোম্পানি চালানোর নামে এই চাঁদা তোলেন। তবে কোম্পানি চালাতে যতটুকু খরচ প্রয়োজন ততটুকু নেওয়া উচিত। লাব্বাইক যে পরিমাণে চাঁদা নিচ্ছে সেটি অস্বাভাবিক। যদিও এসবের সঙ্গে সমিতির কোনো সম্পর্ক নেই। সমিতি কোনো চাঁদা তোলে না, চাঁদার কোনো ভাগও নেয় না। চাঁদার বড় অংশ মালিকরা পুলিশকেও দেয়। তা না হলে নাকি পুলিশ বেশি টাকার মামলা করে। আমি মালিকদের বলি, আপনারা সব ঠিক রাখেন, তাহলে পুলিশ মামলা দেওয়ার সুযোগ পাবে না।’
ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান বলছিলেন, ‘চাঁদাবাজির টাকার বড় একটা অংশ পুলিশকে দেওয়া হচ্ছে– এ কথার ভিত্তি নেই। তাদের বলেন সব জায়গায় চাঁদা দেওয়া বন্ধ করে দিতে। তারপর কাগজপত্র সব ঠিক থাকলে পুলিশ কীভাবে মামলা দেয় আমি দেখব।’
সব পরিবহন ধরলে ঢাকায় চাঁদা ২ কোটি ছাড়াবে
ঢাকায় চলাচলকারী বাসের বাইরে ছোট-বড় অন্য সব গণপরিবহন ও পণ্যবাহী যানের চাঁদা যুক্ত করলে চাঁদার পরিমাণ প্রতিদিন ২ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় ছোট-বড় মিলিয়ে মোট ৯৫ ধরনের টার্মিনাল ও স্ট্যান্ড রয়েছে। এর মধ্যে ৬৬টি ঢাকা মহানগরীতে অবস্থিত। এসব জায়গাকে কেন্দ্র করেই যাত্রী ও পণ্যবাহী যান চলাচল করে। এর মধ্যে ৩৭টি লেগুনা স্ট্যান্ড, সাতটি স্থানীয় বাস স্ট্যান্ড, পাঁচটি পিকআপ স্ট্যান্ড, চারটি স্থানীয় এবং আন্তঃজেলা বাস স্ট্যান্ড, চারটি অটোরিকশা স্ট্যান্ড, তিনটি আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল, তিনটি অটোরিকশা স্ট্যান্ড, দুটি ট্রাক স্ট্যান্ড এবং একটি মাইক্রোবাস স্ট্যান্ড।
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ঢাকার ৫৩টি পরিবহন টার্মিনাল ও স্ট্যান্ড থেকে প্রতিদিন ২ কোটি ২১ লাখ টাকা চাঁদা তোলা হয়। এর মধ্যে ১ কোটি ১৭ লাখ টাকার চাঁদা তোলা হয় পরিবহন মালিক সমিতির নামে। বাকিটা সিটি করপোরেশন, টার্মিনাল কর্তৃপক্ষের ফি, কাউন্টার ও টার্মিনালের খরচ, শ্রমিক, লাইনম্যান, পরিচ্ছন্নতাকর্মী এবং নিরাপত্তারক্ষীদের ফি আদায়ের নামে।
২০২৪ সালের ৫ মার্চ ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে বলা হয়, দেশের বেসরকারি বাস ও মিনিবাস খাতে প্রতি বছর অন্তত ১ হাজার ৫৯ কোটি ৩৭ লাখ টাকা চাঁদা ও অনিয়মের অর্থ আদায় করা হয়। এর মধ্যে প্রায় ৯০০ কোটি ৫৯ লাখ টাকা যানবাহনের নিবন্ধন, ফিটনেস ও নবায়নসহ বিভিন্ন সেবার ক্ষেত্রে ঘুষ হিসেবে বিআরটিএর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছে যায়। এ ছাড়া ২৪ কোটি ৯৭ লাখ টাকা রাজনৈতিক পরিচয়ধারী ব্যক্তি বা গোষ্ঠী, ৮৭ কোটি ৫৭ লাখ টাকা ট্রাফিক ও হাইওয়ে পুলিশ, ৩৩ কোটি ৪৮ লাখ টাকা সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার প্রতিনিধি এবং ১২ কোটি ৭৬ লাখ টাকা মালিক-শ্রমিক সংগঠনের অতিরিক্ত আদায় হিসেবে নেওয়া হয়।
চাঁদা তোলার নির্দেশিকাও মানা হচ্ছে না
সড়ক ও মহাসড়কে দীর্ঘদিনের ‘চাঁদাবাজি বন্ধে’ ২০২০ সালে পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলো যৌথভাবে ‘সড়ক পরিবহনে সংগঠন পরিচালন ব্যয়/সার্ভিস চার্জ সম্পর্কিত নির্দেশিকা’ প্রণয়ন করে। কোন যানবাহন থেকে কোথায়, কীভাবে এবং সর্বোচ্চ কত টাকা পরিচালন ব্যয় নেওয়া যাবে, তার বিস্তারিত নির্ধারণ করা হয়। একই সঙ্গে সড়ক বা মহাসড়কে দাঁড় করিয়ে চাঁদা আদায়, ২৪ ঘণ্টায় একাধিকবার টাকা নেওয়া এবং নির্ধারিত স্থানের বাইরে অর্থ সংগ্রহ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়।
নির্দেশিকা অনুযায়ী, ঢাকা মহানগরে চলাচলকারী বাস ও মিনিবাস থেকে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি বা ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি সর্বোচ্চ ২০ টাকা এবং সংশ্লিষ্ট টার্মিনাল মালিক সমিতি সর্বোচ্চ ৩০ টাকা পরিচালনা ব্যয় নিতে পারবে। অর্থাৎ একটি বাস থেকে সুযোগ রয়েছে সর্বোচ্চ ৫০ টাকা আদায়ের।
গাবতলী থেকে পরিচালিত বাসের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বাস-ট্রাক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন সর্বোচ্চ ৪০, টার্মিনাল মালিক কমিটি ১০ এবং সংশ্লিষ্ট সংগঠন ৩০ টাকা নিতে পারবে। এক্ষেত্রে সর্বোচ্চ মোট আদায়ের সীমা ৮০ টাকা। ঢাকার চারটি বাস টার্মিনালে শ্রমিক সংগঠনগুলোর জন্য আলাদা হার। সংশ্লিষ্ট শ্রমিক ইউনিয়ন ৩০, টার্মিনাল শ্রমিক কমিটি ১০ এবং বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন ১০ টাকা নিতে পারবে। এ ছাড়া বাস টার্মিনাল, ইজারাপয়েন্ট ও ইন্টারসেকশনে কমিউনিটি পুলিশিংয়ের জন্য আরও ১০ টাকা নেওয়ার বিধান রয়েছে।
এ ছাড়া কোনো মালিক বা শ্রমিক সংগঠন জোরপূর্বক অর্থ আদায় করলে বা নির্ধারিত হারের বেশি অর্থ নিলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা রয়েছে। নির্দেশিকায় আছে, সড়ক ও মহাসড়কে ‘চাঁদা’, ‘কল্যাণ তহবিল’, ‘বেকার ভাতা’ বা অন্য কোনো নামে অর্থ আদায় করা যাবে না। প্রকৃত পরিবহন শ্রমিক ছাড়া অন্য কেউ শ্রমিক ইউনিয়নের সদস্য হতে পারবেন না এবং শ্রমিক ইউনিয়নের তহবিলে মালিকদের কাছ থেকেও কোনো অর্থ নেওয়া যাবে না।
‘তারা নির্দেশিকা তৈরির কে’— এমন প্রশ্ন তুলে এই নির্দেশিকাকে অবৈধ আখ্যা দিয়েছেন পরিবহন শ্রমিক নেতা মোহাম্মদ হানিফ খোকন। তিনি বলেছেন, ‘শ্রম আইন ও সড়ক পরিবহন আইনে টার্মিনালের বাইরে চাঁদা তোলার সুযোগ নেই। অথচ বিভিন্ন সমিতির নেতারা মিলে একটা নির্দেশিকা বানিয়ে চাঁদাবাজিকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। সেই ধারাবাহিকতা এখনো চলছে। আবার তাদের বানানো নির্দেশিকাও তারা মানছে না। একবার চাঁদা তোলার কথা অথচ দিনে তোলে ৩০ বার। সরকার কঠোর না হলে, দলীয় নেতাদের নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারলে চাঁদাবাজি বন্ধ হবে না।’



