জামায়াত ব্যারিস্টার রাজ্জাকের কথা শুনলে সমাধান হতো অনেক প্রশ্নের : আইনমন্ত্রী

আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। ছবি : সংগৃহীত
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী দল হিসেবে তাদের সাবেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাকের কথা শুনলে অনেক প্রশ্নের সমাধান হয়ে যেত বলে দাবি করেছেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়কমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান।
আজ শুক্রবার সকালে রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে আব্দুর রাজ্জাকের লেখা বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে এমন দাবি করেছেন মন্ত্রী। ব্যারিস্টার রাজ্জাকের লেখটা বইটির নাম ‘বাংলাদেশ জামায়াত-ই ইসলামী : ইটস হিস্ট্রি অ্যান্ড পলিটিক্স’। এ বইটি প্রকাশ করেছে দ্য ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড।
ব্যারিস্টার রাজ্জাক জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ছিলেন। ২০১১ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আসামি পক্ষের প্রধান কৌঁসুলিও দায়িত্ব পালন করেছেন। ব্যারিস্টার রাজ্জাক ১৯৪৯ সালের ৬ মার্চ জন্মগ্রহণ করেন। ৭৫ বছর বয়সে ২০২৫ সালের ৪ মে তিনি মারা যান।
আব্দুর রাজ্জাক ১৯৭১ সালের জামায়াতের ভূমিকার জন্য দলটিকে জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তার লেখা ‘বাংলাদেশ জামায়াত-ই ইসলামী : ইটস হিস্ট্রি অ্যান্ড পলিটিক্স’ বইয়ে বিষয়টি উঠে এসেছে।
বইটির প্রকাশনা অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় এ প্রসঙ্গ টেনে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, রাজ্জাক সাহেব ১৯৭১ নিয়ে যে মূল্যায়ন করেছেন, উনি যে জাতির কাছে একটি স্টেটমেন্ট করার কথা বলেছেন। রাজ্জাক সাহেবের এই স্টেটমেন্টটা ২০১৬ সালে যদি সাইন করত, জামায়াতের অনেক প্রশ্নের সমাধান হতো।
ব্যারিস্টার রাজ্জাককে উদ্ধৃত করে মন্ত্রী বলেছেন, ব্যারিস্টার রাজ্জাকের ড্রাফটে তিনি একাত্তরে জামায়াতের ভূমিকাকে জাতির সামনে আনার চেষ্টা করেছেন। জামায়াত ইনডাইরেক্টলি ‘না’ ভোট না দেওয়ার মধ্য দিয়ে একাত্তরের সেই ভূমিকাকে মেনে নিল, বাই পার্টিসিপেটিং ইন দ্য পার্লামেন্টারি প্রসেস। এখানেই রাজ্জাক সাহেবের দূরদর্শিতা প্রকাশ পায়।
‘জামায়াত কিন্তু এই প্রশ্নটাই এখন মেনে নিয়েছে। এই স্টেটমেন্টের আলোকেই জামায়াতের আজকের পজিশন’, যোগ করেন মন্ত্রী।
বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার রাজ্জাককে নিয়ে বলেছেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান বর্তমান প্রজন্মকে বড় একটি শিক্ষা দিয়েছে। সময়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নতুন প্রজন্ম যেভাবে অন্যায়কে তছনছ ও ভেঙে দিতে পারে, ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাকের চিন্তাধারায় সেই নির্দেশনাই ছিল।
আইনমন্ত্রী বলছিলেন, আমরা যদি বলি, ইসলামি শাসন কায়েম করে চাপিয়ে দেব, সেটা হবে একটা ভ্রান্ত নীতি। বরং সমাজ থেকে ইসলামিক মূল্যবোধের আলোকে একটি রাষ্ট্র গঠিত হোক, রাষ্ট্র পরিচালিত হোক— সেটাই হবে প্রকৃত ইসলামিক রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েমের সঠিক পথ।
‘ব্যারিস্টার রাজ্জাকের বইয়ে ঠিক এইভাবে বিষয়টা এসেছে, আমি দেখলাম। আমি রাজ্জাক সাহেবের ইসলামিক রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েমের চিন্তার সাথে দ্বিমত পোষণ করতে পারি, কিন্তু একটা মূল্যবোধের জায়গা থেকে, একটা রাষ্ট্রব্যবস্থার জায়গা থেকে আমার ধারণা, দিস ইজ দ্য প্রোস ফর জুরিস্ট’, ব্যাখ্যা করেন মন্ত্রী।
বইটি সম্পর্কে মন্ত্রী বলেছেন, ‘এই বইটা আমার কাছে সাহিত্য মনে হয়নি, গবেষণাধর্মীও মনে হয়নি, এটা একটা জীবন্ত একজন মানুষের এনসাইক্লোপিডিয়ার মতো মনে হয়েছে। রাজ্জাক সাহেব একটা সমাজকে তার জীবন দিয়ে যেভাবে দেখেছেন, তার জীবন দর্শন যেভাবে ছিল— এই বইটা তার একটা রিফ্লেকশন।’
ব্যারিস্টার রাজ্জাকের বইয়ের মোড়ক উন্মোচনে জামায়াতের সংশ্লিষ্টদের উপস্থিত না থাকার সমালোচনাও করেন আইনমন্ত্রী। তিনি বলেছেন, আজকে জামায়াতের যারা মেইনস্ট্রিমের আইনজীবী হিসেবে আমাদের অঙ্গনে পরিচিত, জামায়াতের যারা লিডারশিপে আছেন— আমার প্রত্যাশা ছিল এই আলোচনায় তারা থাকবেন। তারা কেউ উপস্থিত হতে পারেনি। এটা তাদের দীনতা, এটা তাদের ব্যর্থতা, এটা তাদের সংকীর্ণতা ও সীমাবদ্ধতা।
মন্ত্রী বলছিলেন, তারা উপস্থিত হয়ে বইয়ের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করতে পারতেন। কারণ দিস ইজ ডেমোক্রেসি। আপনি রাজ্জাক সাহেবের সব কথার সঙ্গে একমত হবেন— এটা যেমন সত্যি না, আবার তার সমালোচনা গ্রহণ করতে পারবেন না— এটাও সঠিক না।
বইটি নিয়ে বিএনপির দৃষ্টিভঙ্গির কথা উল্লেখ করে আসাদুজ্জামান বলেছেন, এই বইয়ের মধ্যে বিএনপি সম্পর্কে সমালোচনা করা হয়েছে, ফাইন। উই হ্যাভ টু অ্যাকসেপ্ট। আমরা যদি এটা ধারণ করতে না পারি, সমাজব্যবস্থা নিয়ে আমরা এগিয়ে যেতে পারব না।
অনুষ্ঠানে আইনমন্ত্রী ছাড়াও অংশ নিয়েছেন জাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী, যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর অধ্যাপক আলী রীয়াজ, দ্য ডেইলি স্টারের কনসাল্টিং এডিটর কামাল আহমেদ, ওয়াশিংটনভিত্তিক সংস্থা রাইট টু ফ্রিডমের প্রেসিডেন্ট জন ড্যানিলোভিচ এবং সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম।



