আত্মহত্যা প্রতিরোধে মন খুলে কথা বলার আহ্বান সিএসডব্লিউএবি-এর

সংগৃহীত ছবি
বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস ২০২৬ উপলক্ষে ‘মন খুলে কথা বলি, আত্মহত্যা প্রতিরোধ করি’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে র্যালি ও সচেতনতামূলক কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছে। ক্লিনিক্যাল সোশ্যাল ওয়ার্ক অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (সিএসডব্লিউএবি) আয়োজিত এ কর্মসূচিতে ছাত্র, শিক্ষক, চিকিৎসক, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, ক্লিনিক্যাল সোশ্যাল ওয়ার্কারসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।
কর্মসূচিতে সভাপতিত্ব করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার অ্যান্ড রিসার্চের (আইএসডব্লিউআর) ক্লিনিক্যাল সোশ্যাল ওয়ার্কের প্রতিষ্ঠাতা, সিএসডব্লিউএবি-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক তাহ্মিনা আখতার। এতে সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক শাহিন খানসহ অন্যান্য সদস্য উপস্থিত ছিলেন।
অধ্যাপক তাহ্মিনা আখতার বলেছেন, আত্মহত্যা কোনো ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়; এটি একটি প্রতিরোধযোগ্য স্বাস্থ্য ও সামাজিক সংকট। জীবনের নানা প্রতিকূলতা, মানসিক চাপ ও সংকটে একজন মানুষ নিজেকে অসহায় বা বিচ্ছিন্ন মনে করলে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই ঝুঁকিতে থাকা মানুষের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, তাকে বিচার না করা এবং প্রয়োজনের সময় যথাযথ সহায়তা নিশ্চিত করা আত্মহত্যা প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি উল্লেখ করেছেন, বিশ্বব্যাপী প্রতিবছর সাত লাখের বেশি মানুষ আত্মহত্যার কারণে মারা যান। বিশেষ করে কিশোর ও তরুণদের ক্ষেত্রে এটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য সমস্যা। আত্মহত্যার একটি ঘটনা শুধু একজন ব্যক্তির জীবনেই প্রভাব ফেলে না, পরিবার, স্বজন ও সমাজের ওপরও দীর্ঘস্থায়ী মানসিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব তৈরি করে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে অধ্যাপক তাহ্মিনা আখতার বলেছেন, আত্মহত্যার পেছনে সাধারণত একক কোনো কারণ কাজ করে না। মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, পারিবারিক ও দাম্পত্য কলহ, সম্পর্কের টানাপোড়েন, শিক্ষাজীবনের চাপ, আর্থিক অনিশ্চয়তা, সহিংসতা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও প্রতিকূল জীবনপরিস্থিতিসহ বিভিন্ন বিষয় ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তবে হাসপাতাল, পুলিশ ও সংবাদমাধ্যমনির্ভর তথ্যের ওপর অধিক নির্ভরতার কারণে দেশে আত্মহত্যার প্রকৃত চিত্র নিরূপণে এখনো তথ্যগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
আত্মহত্যা প্রতিরোধে বিচ্ছিন্ন বা স্বল্পমেয়াদি উদ্যোগের পরিবর্তে সমন্বিত, প্রমাণভিত্তিক ও দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় কর্মপরিকল্পনার প্রয়োজন রয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন তিনি। এ লক্ষ্যে আত্মহত্যা ও আত্মহত্যার প্রচেষ্টার নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহে কার্যকর জাতীয় নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও কাউন্সেলিং জোরদার করা এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার পর্যায়েই ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের শনাক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
তিনি আরও বলেছেন, আত্মহত্যার চেষ্টা করা ব্যক্তিদের শুধু তাৎক্ষণিক চিকিৎসা দিলেই হবে না। তাদের জন্য ধারাবাহিক চিকিৎসা, মানসিক সহায়তা ও নিয়মিত অনুসরণের ব্যবস্থা প্রয়োজন। পাশাপাশি পরিবারে পারস্পরিক যোগাযোগ ও সহমর্মিতা বাড়ানো, সহিংসতা প্রতিরোধ এবং দায়িত্বশীল ও সংবেদনশীল গণমাধ্যম প্রতিবেদন নিশ্চিত করাও জরুরি।
অধ্যাপক তাহ্মিনা আখতার বলেন, সংকটে থাকা কাউকে উপদেশ দেওয়ার আগে তার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং তাকে একা না রেখে পাশে দাঁড়ানো প্রয়োজন। সময়মতো পেশাজীবীর সহায়তা পাওয়ার সুযোগ তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি আত্মহত্যাকে ব্যক্তিগত ব্যর্থতা, দুর্বলতা বা অপরাধ হিসেবে না দেখে প্রতিরোধযোগ্য স্বাস্থ্য ও সামাজিক সংকট হিসেবে বিবেচনার আহ্বান জানান। তাঁর মতে, ব্যক্তি, পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা, গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ ও রাষ্ট্রের সমন্বিত উদ্যোগেই আত্মহত্যা প্রতিরোধে কার্যকর পরিবর্তন আনা সম্ভব।
এ জন্য মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে সহজলভ্য, গ্রহণযোগ্য ও বৈষম্যহীন করার পাশাপাশি এমন সামাজিক পরিবেশ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন তিনি, যেখানে মানুষ সংকটের কথা বলতে এবং প্রয়োজনের সময় সহায়তা চাইতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবে।





