এলডিসি উত্তরণের সময়সীমা বাড়াতে নিউ ইয়র্কে যাচ্ছে প্রতিনিধিদল
- ইকোসকের বৈঠকেই হবে বাংলাদেশের ভাগ্য নির্ধারণ
- বৈঠকের আগে এই সফর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ : ইআরডি সচিব

সংগৃহীত ছবি
স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ ২০২৯ সাল পর্যন্ত পিছিয়ে দিতে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করছে সরকার। এ লক্ষ্যে নিউ ইয়র্ক যাচ্ছে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, আগামী ১৪ থেকে ১৯ জুলাই নিউ ইয়র্ক সফর করবে দলটি। এর নেতৃত্ব দেবেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। প্রতিনিধিদলের অন্যতম সদস্য থাকবেন অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকী।
সফরকালে ইকোসকসহ জাতিসংঘের বিভিন্ন কমিটির প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করবে দলটি। ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তাদের সঙ্গেও আলোচনা হবে।
বৈঠকগুলোতে এলডিসি উত্তরণ ২০২৯ সাল পর্যন্ত পিছিয়ে দেওয়ার পক্ষে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরা হবে। কেন অতিরিক্ত সময় প্রয়োজন, সেটিও ব্যাখ্যা করা হবে। সরকার মনে করছে, এসব বৈঠকের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের অবস্থান আরও জোরালোভাবে তুলে ধরা সম্ভব হবে। এলডিসি উত্তরণের সময়সীমা পরিবর্তনের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে জাতিসংঘের ইকোনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল কাউন্সিল (ইকোসক)।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানালেন, মন্ত্রীর সিডিউল এখনো চূড়ান্ত হয়নি। কোন কোন সংস্থার সঙ্গে বৈঠক হবে জানতে চাইলে তিনি বললেন, ‘মন্ত্রী সেখানে যাবেন কি না সেটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। আর কোন বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করা হবে, সেটি তো পরের বিষয়।’
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকী আগামীর সময়কে বললেন, ‘এলডিসি উত্তরণ পিছিয়ে দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতেই আমরা নিউ ইয়র্ক যাচ্ছি। সেখানে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক হবে। এ মুহূর্তে এর বেশি কিছু বলা যাচ্ছে না। তবে ইকোসকের বৈঠকের আগে এই সফরকে আমরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছি।’
ইআরডি সূত্র বলছে, এলডিসি উত্তরণের বিষয়ে ইকোসকের বৈঠকে সদস্য দেশগুলোর মতামত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তাই ৫৩টি সদস্য দেশের কাছে এরই মধ্যে চিঠি পাঠানো হয়েছে। তাদের সমর্থন আদায়ে কূটনৈতিক তৎপরতাও বাড়ানো হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে নিউ ইয়র্ক সফরের আয়োজন করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
ইআরডির এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা আগামীর সময়কে বললেন, ‘এলডিসি উত্তরণের সময় পিছিয়ে দেওয়ার বিষয়টি সহজ হবে বলে মনে করার সুযোগ নেই। এটি বর্তমান পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করছে। তবে সরকার এ লক্ষ্যে চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।’
তিনি বললেন, ‘জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট সংস্থা এরই মধ্যে প্রয়োজনীয় মূল্যায়ন (অ্যাসেসমেন্ট) সম্পন্ন করেছে। এখন কূটনৈতিক তৎপরতাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’ তার ভাষ্য, এই সফরে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্ব দেওয়ার কথা ছিল। তিনি যেতে না পারায় বাণিজ্যমন্ত্রীকে অনুরোধ করেছেন।
ইআরডি সূত্র বলছে, চলতি মাসের শেষদিকে ইকোসকের বৈঠক হবে। এর আগে জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি) একটি স্বাধীন প্রতিবেদন তৈরি করছিল। সে কাজটি তারা করছে। ইকোসকের সদস্য দেশগুলো হলো মধ্যে আফ্রিকার ১৪টি দেশ, এশিয়ার ১১টি, ইন্টার্ন ইউরোপের ছয়টি, লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের ১০টি এবং ওয়েস্টার্ন ইউরোপের রয়েছে ১৩টি দেশ।
বাংলাদেশ যেসব দেশে কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছে সেগুলো হলো আলজেরিয়া, আর্মেনিয়া, অস্ট্রেলিয়া, অস্ট্রিয়া, আজারবাইজান, বুরুন্ডি, কানাডা, শাদ, আইভরি কোস্ট, কেনিয়া, মৌরিতানিয়া, মোজাম্বিক, নাইজেরিয়া, সেনেগাল, সিয়েরালিওন, দক্ষিণ আফ্রিকা, তানজানিয়া ও জাম্বিয়া। এ ছাড়া চীন, ভারত, জাপান, লেবানন, নেপাল, পাকিস্তান, সৌদি আরব, শ্রীলঙ্কা, তুর্কমেনিস্তান ও উজবেকিস্তান। আরও আছে রাশিয়া, ইউক্রেন, রাশিয়ান ফেডারেশন, প্যারাগুয়ে, পেরু, উরুগুয়ে, ইতালি, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে, ইউকে ও ইউএসএ।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এলডিসি থেকে উত্তরণের সময়সীমা ২০২৬ সালের পরিবর্তে ২০২৯ সাল নির্ধারণের আবেদন করে। আবেদনে এলডিসি-পরবর্তী বাণিজ্য সুবিধা নিয়ে বাড়তে থাকা অনিশ্চয়তার বিষয়টি তুলে ধরা হয়।
এতে বলা হয়, তৈরি পোশাক খাতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের জিএসপি প্লাস সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ জটিলতায় পড়তে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক আরোপ, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তির পরিবর্তন এবং প্রতিযোগী দেশগুলোর নতুন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিকেও ঝুঁকি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
আবেদনে আরও বলা হয়, শুল্ক ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, জ্বালানি খাতের সংস্কার, রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণ এবং শিল্প-কারখানার কমপ্লায়েন্স অবকাঠামো উন্নয়নে অগ্রগতি হয়েছে। তবে একের পর এক দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সংকটের কারণে এসব কার্যক্রম নির্ধারিত সময়ের তুলনায় পিছিয়ে পড়েছে। সরকারের ভাষ্য, এলডিসি উত্তরণের জন্য নির্ধারিত পাঁচ বছরের প্রস্তুতিকালও ধারাবাহিক দেশীয় ও বৈশ্বিক সংকটে ‘গুরুতরভাবে ব্যাহত’ হয়েছে।
আবেদনে কয়েকটি দেশীয় ও বৈশ্বিক সংকটের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। দেশীয় সংকটের মধ্যে রয়েছে আর্থিক খাতে অনিয়ম, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া এখনো চূড়ান্ত না হওয়া।
বৈশ্বিক সংকটের মধ্যে রয়েছে কোভিড-১৯ মহামারীর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব। এ ছাড়া বৈশ্বিক অর্থনীতির ধীর পুনরুদ্ধার। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। জ্বালানি ও খাদ্যবাজারে অস্থিরতার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে।
আবেদনে আরও বলা হয়েছে, বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার কড়াকড়ি। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পুনরুদ্ধারে বিলম্ব। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা ও বিশ্ববাণিজ্য ব্যবস্থায় বাড়তে থাকা অনিশ্চয়তাও বাংলাদেশের প্রস্তুতিকে প্রভাবিত করেছে।
২০২৬ সালের নভেম্বরে এলডিসি থেকে উত্তরণের কথা ছিল বাংলাদেশের। তবে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, ডলার সংকট, মূল্যস্ফীতি এবং সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্য সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি ইউএনসিডিপির কাছে এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রস্তুতিকাল তিন বছর বাড়িয়ে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত করার অনুরোধ করেছিল সরকার। পরে গত ৬ এপ্রিল জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে এ বিষয়ে সহযোগিতা কামনা করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
ইউএনসিডিপির মূল্যায়নে বলা হয়েছে, এলডিসি উত্তরণের তিনটি সূচকেই নির্ধারিত সীমা উল্লেখযোগ্য ব্যবধানে অতিক্রম করেছে বাংলাদেশ। নিকট ও মধ্যমেয়াদে এ অবস্থান থেকে পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিও খুব কম। তবে সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্য সংকট, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, সরবরাহ ব্যবস্থার অনিশ্চয়তা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিবেশের পরিবর্তন এবং অন্যান্য বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ প্রভাব ফেলতে পারে উত্তরণ প্রস্তুতির ওপর।
বাংলাদেশের প্রণীত স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজি (এসটিএস) বাস্তবায়নে সরকারের প্রতিশ্রুতিকে স্বাগত জানিয়েছে ইউএনসিডিপি। সংস্থাটি বলেছে, প্রস্তুতিকাল সম্প্রসারিত হলে বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রভাব আরও ভালোভাবে মূল্যায়ন, প্রয়োজনীয় অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং উত্তরণ-পরবর্তী বাজার সুবিধা ও আন্তর্জাতিক সহায়তা ব্যবস্থার জন্য কার্যকর প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
এক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ সংস্কারের গুরুত্ব তুলে ধরে আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, কর আহরণ বৃদ্ধি, অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহ জোরদার করা, উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো, অর্থনীতির বহুমুখীকরণ এবং বেসরকারি খাতকে উত্তরণের জন্য প্রস্তুত করার ওপর জোর দিয়েছে জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (ইউএনসিডিপি)।








