ভর্তিদের ৮-১২ শতাংশ লিভারের রোগী

ফাইল ছবি
হাসপাতালের মেডিসিন ওয়ার্ডে ভর্তি রোগীদের ৮ থেকে ১২ শতাংশ লিভারের বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত। তৃতীয় স্তরের (টারশিয়ারি) হাসপাতালগুলোয় মৃত্যুর তৃতীয় প্রধান কারণ লিভারের রোগ। প্রতি বছর হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’ সংক্রমণজনিত কারণে আনুমানিক ২১ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়।
বাংলাদেশের জাতীয় ভাইরাল হেপাটাইটিস নির্মূল কৌশলপত্রে (২০২০-৩০) এই তথ্য উঠে এসেছে। প্রতি বছর ২৮ জুলাই বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস পালিত হয়। এ বছর ‘হেপাটাইটিস: প্রতিবন্ধকতা দূর করি’ প্রতিপাদ্যে পালিত দিবসটির মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে— ভাইরাল হেপাটাইটিস প্রতিরোধ, রোগ শনাক্তকরণ, চিকিৎসা নিশ্চিত করা ও সেবাপ্রাপ্তির বাধা দূর করা।
সরকারের এই প্রতিবেদন আরও বলছে, বাংলাদেশে এক কোটির বেশি মানুষ ভাইরাল হেপাটাইটিস নিয়ে বসবাস করছে। হেপাটাইটিস বি-এর সংক্রমণের হার ৫ দশমিক ৪ শতাংশ এবং হেপাটাইটিস ‘সি’ ভাইরাসের সংক্রমণের হার প্রায় শূন্য দশমিক ৬৬ শতাংশ।
এ বিষয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজের (ঢামেক) হেপাটোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ফরহাদ হোসেন মো. শাহেদ বলছেন, হেপাটাইটিস বি এবং হেপাটাইটিস সি-তে আক্রান্ত রোগীদের অধিকাংশই জানেন না তারা এ রোগে আক্রান্ত। অন্য কোনো জটিল রোগে আক্রান্ত হলে তখন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে গিয়ে এই রোগ ধরা পড়ে; ততদিনে রোগীর লিভার সিরোসিস বা লিভার ক্যানসার হয়ে যায়।
দেশে দীর্ঘমেয়াদি লিভার রোগের প্রধান কারণ হেপাটাইটিস বি, দ্বিতীয় প্রধান কারণ হেপাটাইটিস ‘সি’। বাংলাদেশে লিভার ক্যানসার ফুসফুস ও পাকস্থলীর ক্যানসারের পর ক্যানসারজনিত মৃত্যুর তৃতীয় প্রধান কারণ।
ঢামেক হাসপাতালের হেপাটোলজি বিভাগের ওয়ার্ডে গতকাল সোমবার গিয়ে দেখা যায়, বর্তমানে ১৩ রোগী ভর্তি, যার মধ্যে ৯ জন পুরুষ এবং ৪ নারী। তারা শুধু লিভার সিরোসিস এবং লিভার ক্যানসারে আক্রান্ত। তাদের কেউ কিডনি রোগের চিকিৎসা করাতে গিয়ে, কেউ অস্ত্রোপচার করাতে গিয়ে জেনেছেন তারা ভাইরাল হেপাটাইটিসে আক্রান্ত।
ওয়ার্ডের দায়িত্বরত চিকিৎসক বলছেন, ভর্তি রোগীদের অবস্থা ভালো নয়। রোগীদের বেশিরভাগই নিম্নবিত্ত পরিবারের। খরচ চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন। অথচ টিকা নিলে তারা হেপাটাইটিস বি-তে অাক্রান্ত হতেন না, আর প্রাথমিক অবস্থায় শনাক্ত করা গেলে হেপাটাইটিস সি রোগীরা সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যেতেন।
জাতীয় কৌশলপত্র অনুযায়ী, বাংলাদেশ ২০৩০ সালের মধ্যে হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’-এর নতুন সংক্রমণ ৯০ শতাংশ এবং এ-সম্পর্কিত মৃত্যু ৬৫ শতাংশ কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এজন্য ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর স্ক্রিনিং বাড়ানো, নিরাপদ রক্ত নিশ্চিত করা, সংক্রমণ প্রতিরোধ এবং আক্রান্তদের দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
হেপাটাইটিস ‘বি’ আক্রান্তদের চাকরিতে অদৃশ্য বৈষম্য: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, চাকরির জন্য সব যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও শুধু হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার কারণে নিয়োগ না পাওয়া, পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হওয়া কিংবা চাকরি হারানোর ঘটনা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দেখা যায়। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। অনেক প্রতিষ্ঠান হেপাটাইটিস বি-তে আক্রান্তদের চাকরিতে অযোগ্য বলে বিবেচনা করে।
ঢামেক হাসপাতালে হেপটাইটিস বি-তে আক্রান্ত ২৮ বছরের এক যুবক কিডনি ডায়ালাইসিস করছিলেন। উচ্চ রক্তচাপ নিয়ে হাসপাতালে গেলে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় তার কিডনির সমস্যা ধরা পড়ে। একই সময় জানা যায়, তিনি হেপাটাইটিস বি-তে আক্রান্ত। এ কারণে তাকে চাকরি থেকে ‘স্বেচ্ছায়’ পদত্যাগ করতে হয়। তিনি একটি বহুজাতিক কোম্পানিতে চাকরি করতেন।
এই যুবকের ভাষ্য, ‘একদিকে চাকরি হারিয়ে বেকার হয়ে গেছি, অন্যদিকে চিকিৎসায় অনেক খরচ হচ্ছে। পুরো দিশাহারা অবস্থা। পরিবারের অন্যদের সহায়তায় চলছি।’
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন বলছেন, ‘অধিকাংশ ক্ষেত্রে এ ধরনের সিদ্ধান্ত বৈজ্ঞানিক তথ্যের চেয়ে ভয়, ভুল ধারণা থেকে নেওয়া হয়। স্বাস্থ্যসেবা ও সামরিক বাহিনীসহ কিছু পেশার বাইরে এর কোনো আইনগত ভিত্তি নেই।’
মুশতাক হোসেন আরও বলছিলেন, অফিসে একসঙ্গে কাজ করা, হাত মেলানো, একই টয়লেট ব্যবহার, একই কক্ষে বসা বা একসঙ্গে খাবার খাওয়ার মাধ্যমে হেপাটাইটিস ‘বি’ ছড়ায় না।
হেপাটাইটিস ‘সি’ আক্রান্তদের ৬০ শতাংশই কর্মক্ষম: বাংলাদেশে হেপাটাইটিস সি-তে আক্রান্তদের ৬০ শতাংশের বেশি মানুষের বয়স ৩০ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে। অর্থাৎ দেশের সবচেয়ে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ এই ভাইরাসে আক্রান্ত।




