শ্রমিক মৃত্যুর প্রকৃত কারণ আড়াল হয় সৌদিতে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে একটি সোফা তৈরির কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে ১৬ মৃত্যুর পর বাংলাদেশি কর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে আবার হাহাকার উঠেছে দেশে। আগেও অনেকবার এরকম দুর্ঘটনার প্রাণ গেছে বাংলাদেশিদের। নিরাপদ অভিবাসনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি ও সংগঠনগুলো বলছে, সৌদি আরবে বারবার দুর্ঘটনায় পড়ার মূল কারণ অনিরাপদ কর্মস্থল, দুর্বল তদারকি, নিয়োগকর্তার অতিরিক্ত ক্ষমতা এবং দুর্ঘটনার পর জবাবদিহির ঘাটতি।
রিয়াদে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের ভাষ্য অনুযায়ী, মুসা সানাইয়া শিল্প এলাকার সোফা কারখানায় গত রবিবার দুপুরের দিকে আগুন লাগে এবং স্থানীয় ফায়ার সার্ভিস ১৬ বাংলাদেশির মরদেহ উদ্ধার করে। প্রাথমিক তথ্যে বলা হয়েছে, শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে। তবে সৌদি কর্তৃপক্ষ এখনো কোনো পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি।
বাংলাদেশ দূতাবাস বলছে, বাংলাদেশিদের পরিচালনাধীন ওই কারখানায় ১৭ বাংলাদেশি কর্মী কাজ করতেন।
স্থানীয় সিভিল ডিফেন্স সূত্রে জানা যায়, আটজন সরাসরি আগুনে পুড়ে ও আটজন কালো ধোঁয়ায় শ্বাসরোধে মারা যান। তাদের ১৩ জনের বাড়ি নওগাঁ, দুজনের নাটোর ও একজনের রাজশাহী। কারখানার একাংশে বসবাস করতেন তারা।
এ দুর্ঘটনার আগেও সৌদিতে ২০২৩ সালে আল-আহসা সোফা কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে ৯ বাংলাদেশি ও ২০২১ সালে মদিনা সোফা কারখানায় আগুনে পুড়ে ছয় বাংলাদেশির মৃত্যু হয়েছিল। বাংলাদেশ ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্য বলছে, ২০২২-২৬ সালের জুন পর্যন্ত সৌদি আরবে মৃত্যু হয়েছে ৭ হাজার ৮৯৫ বাংলাদেশি কর্মীর। এর মধ্যে ২০২৩ থেকে আগুনজনিত কারণে মারা গেছেন ৫৩ জন।
সৌদি আরবে বাংলাদেশি শ্রমিকদের মর্মান্তিক মৃত্যু শুধু শোকের বিষয় নয়, বরং এটি শ্রমিক নিরাপত্তা নিয়ে গভীর প্রশ্ন তোলার সময় বলে মনে করছেন অভিবাসন বিশেষজ্ঞ ও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. সেলিম রেজা। আগামীর সময়কে তিনি বলছিলেন, ‘আমাদের শ্রমিক শুধু বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের উৎস নন, তারা বাংলাদেশের নাগরিক। তাদের জীবন রক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। রেমিট্যান্স চাই, কিন্তু তার বিনিময়ে শ্রমিকের জীবন বিসর্জন দিতে হবে— এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’
বিদেশে বাংলাদেশি কর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে সরকার কী করছে— জানতে চাইলে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোখতার আহমেদ আগামীর সময়কে বললেন, সৌদি আরবে সম্প্রতি অাগুন দুর্ঘটনায় ১৬ কর্মীর মৃত্যুর পর বিদেশে বাংলাদেশি কর্মীদের নিরাপদ অভিবাসনের জন্য সংশ্লিষ্ট দূতাবাসগুলোকে বলা হয়েছে।
এত মৃত্যু কেন: সৌদি আরব বাংলাদেশের শ্রম অভিবাসনের প্রধান দেশ। অভিবাসন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সৌদিতে অভিবাসী শ্রমিকদের মধ্যে বাংলাদেশিরাই বেশি। প্রাপ্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সৌদি আরবের বিদেশি জনসংখ্যার ১৫ দশমিক ৮ শতাংশ বাংলাদেশি নাগরিক। শুধু ২০২৪ সালে ৬ লাখ ২৭ হাজারের বেশি বাংলাদেশি কর্মী কাজের উদ্দেশ্যে সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছেন। ২০২৫ সালে গেছেন ৭ লাখ ৫৫ হাজারের েবশি। আর চলতি বছর গতকাল পর্যন্ত গেছেন ২ লাখ ৫৭ হাজার ৪৭০ কর্মী।
ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, গত চার বছরে সৌদি আরবে স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে ৪ হাজার ৫৫১ কর্মীর। সড়ক দুুর্ঘটনায় মারা গেছেন ৭১২ জন। অন্য দুর্ঘটনায় ২১৪, আত্মহত্যা করেছেন ১৬৪ এবং কাজ করা অবস্থায় মৃত্যু ১০৯ জনের। এ ছাড়া হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ৪৩ ও মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত কারণে ৪০ এবং আগুনে পুড়ে ৩৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। আরও কিছু কারণ আছে, যেমন বিদ্যুতায়িত, হত্যা, ভবন থেকে পড়ে ও রোগে মারা গেছেন ১২২ জন। মৃত্যুর কারণ জানা যায়নি ৬২ জনের।
তবে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ দুই বছর আগে সৌদি আরবে থাকা বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, পাকিস্তান ও ফিলিপাইনের অভিবাসী শ্রমিকদের মৃত্যু নিয়ে একটি গবেষণা প্রতিবেদন দিয়েছিল। এতে বলা হয়, ২০০৮-২২ সাল পর্যন্ত সৌদি আরবে কমপক্ষে ১৩ হাজার ৬৮৫ বাংলাদেশি মারা গেছেন। শুধু ২০২২ সালেই মারা গেছেন ১ হাজার ৫০২ জন— দিনে গড়ে চারজনের বেশি। তাদের অধিকাংশ মৃত্যুর কারণ ‘স্বাভাবিক’ বা ‘কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট’ হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে, এসব মৃত্যুর পেছনে কর্মপরিবেশ, অতিরিক্ত গরম, বাসস্থানের মান ও অনিরাপদ কাজের সঙ্গে সম্পর্কিত থাকলেও সেগুলো তদন্তবিহীন ও ব্যাখ্যাতীত থেকে যায়। অনেক মৃত্যুর ক্ষেত্রে স্বাধীন তদন্ত হয়নি।
আকাশচুম্বী অভিবাসন ব্যয়ও কারণ: আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) জরিপ অনুযায়ী, সৌদি আরবে যাওয়ার জন্য একজন বাংলাদেশি শ্রমিককে গড়ে ৪ লাখ টাকার বেশি (৩ হাজার ৭১৫ মার্কিন ডলার) রিক্রুটমেন্ট ফি বা অভিবাসন ব্যয় পরিশোধ করতে হয়। অথচ সরকারি অভিবাসন ব্যয় ১ লাখ ৬৫ হাজার টাকা। সৌদি আরবে তাদের গড় মাসিক বেতন ১৮৮ মার্কিন ডলার (২২ হাজার ৫৬০ টাকার সমান)। অর্থাৎ তাদের বেতনের তুলনায় অভিবাসন ব্যয় প্রায় ২০ গুণ বেশি।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে, সৌদি শ্রম আইন অনুযায়ী নিয়োগকর্তার এসব খরচ বহনের কথা থাকলেও আইনের প্রয়োগ না থাকায় নিয়োগকারী সংস্থা ও দালালরা অবৈধভাবে এই টাকা শ্রমিকদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেয়। এই টাকা পরিশোধ করতে বাংলাদেশি শ্রমিকরা আত্মীয়স্বজন বা স্থানীয় মহাজনদের কাছ থেকে বার্ষিক ৪২ শতাংশ পর্যন্ত চড়া সুদে ঋণ নিতে অথবা নিজেদের শেষ সম্বল ঘরবাড়ি বন্ধক রাখতে বাধ্য হন। এর ফলে তারা সৌদিতে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই চরম ‘ঋণদাসত্বের’ ফাঁদে পড়ে যান। তখন তারা আর নিরাপত্তা ঝুঁকির বিষয়টি খেয়াল রাখতে পারেন না।
তিনটি বিষয়ে কঠোর হওয়া জরুরি: বাংলাদেশের এখন তিনটি বিষয়ে কঠোর অবস্থান নেওয়া জরুরি বলে মনে করলেন ড. সেলিম রেজা। প্রথমত, সৌদি আরবে কোনো বাংলাদেশি শ্রমিক মারা গেলে তার মৃত্যুর কারণ নির্ধারণে বাধ্যতামূলক ও স্বচ্ছ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। ‘ন্যাচারাল ডেথ লিখে দায় শেষ করার সুযোগ রাখা যাবে না। দ্বিতীয়ত, সৌদির সঙ্গে শ্রমবাজার চুক্তিতে কর্মস্থলের অগ্নিনিরাপত্তা, অতিরিক্ত গরম থেকে সুরক্ষা, নিরাপদ আবাসন, চিকিৎসা, জীবনবীমা এবং দুর্ঘটনার ক্ষতিপূরণকে বাধ্যতামূলক করতে হবে। তৃতীয়ত, বাংলাদেশ দূতাবাস ও শ্রম উইংকে শুধু কাগজপত্র ও মৃতদেহ দেশে ফেরানোর দায়িত্বে সীমাবদ্ধ না রেখে শ্রমিকের অধিকার রক্ষায় সক্রিয় নজরদারি ও আইনি সহায়তার ক্ষমতা দিতে হবে।




