বিধানে সহজ, বাস্তবে জটিল

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
‘পিলখানা কোথায়, কোন গেটে যেতে হয়; আমি কিছুই জানি না। স্বামীর কর্মস্থলেও কোনোদিন যাইনি। এখন পেনশনের জন্য বিজিবি হেডকোয়ার্টার্সের কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর নিতে ঢাকায় যেতে হবে’— কথাগুলো বলতে বলতে চোখ ভিজে ওঠে নুরজাহান বেগমের। তার স্বামী সুবেদার মোজাম্মেল হোসেন ছিলেন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদস্য। স্বামীর মৃত্যুর পর সংসারের একমাত্র ভরসা পারিবারিক পেনশন। কিন্তু সেই পেনশন চালু করতে ছুটতে হচ্ছে এক অফিস থেকে আরেক অফিসে।
শুধু নুরজাহান বেগমই নন, একই রকম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন দেশের বিভিন্ন এলাকার মৃত সরকারি কর্মচারীদের পরিবারের সদস্যরা। সরকারি বিধানে আবার পেনশন মঞ্জুরির প্রয়োজন না থাকলেও পুরনো ফরমের জটিলতায় বিধবা স্ত্রী, বৃদ্ধ মা-বাবা কিংবা অসুস্থ স্বজনদের দিনের পর দিন ঘুরতে হচ্ছে বিভিন্ন দপ্তরে।
গত মার্চে মারা যান উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা নৃপেন্দ্রনাথ শীল। তার স্ত্রী ভারতী রানী শীল উপজেলা পর্যায়ের প্রয়োজনীয় দাপ্তরিক কাজ শেষ করলেও জেলা পর্যায়ে মঞ্জুরি কর্তৃপক্ষের স্বাক্ষরের জন্য ঘুরছেন বহুদিন। এখনো চালু হয়নি তার পারিবারিক পেনশন।
রেলওয়ের অবসরপ্রাপ্ত এক কর্মচারীর মৃত্যুর পর স্ত্রী শাহিদা বেগমকে স্বাক্ষরের জন্য বিভাগীয় কার্যালয়ে যেতে হয়েছে তিনবার। একবুক হতাশা নিয়ে শাহিদা বললেন, ‘স্বামী মারা যাওয়ার পর সংসার সামলানোই হয়ে গেছে কঠিন। এর মধ্যে বারবার অফিসে যেতে হচ্ছে। কোথায় গেলে কাজ হবে, তাও ঠিকমতো বলতে পারে না কেউ।’
একই রকম অভিজ্ঞতা রাজবাড়ীর একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রয়াত এক শিক্ষকের মৃত্যুর পর তার স্ত্রীর। স্থানীয় হিসাবরক্ষণ অফিসে কয়েকবার গিয়েও পাননি নির্দিষ্ট নির্দেশনা। কোন দপ্তরে যেতে হবে, কার স্বাক্ষর লাগবে— এসব নিয়ে বিভ্রান্তিতে পড়েছেন তিনি।
‘সরকারি কর্মচারীগণের পেনশন সহজীকরণ আদেশ-২০২০’ অনুযায়ী, কোনো পেনশনার মারা গেলে তার বিধবা স্ত্রী বা বিপত্নীক স্বামীর ক্ষেত্রে প্রয়োজন নেই ফের পেনশন মঞ্জুরির। কিন্তু বাস্তবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্ধারিত পারিবারিক পেনশন ফরম ২.২-এর ৭ নম্বর পাতায় এখনো বাধ্যতামূলক রাখা হয়েছে ‘মঞ্জুরী কর্তৃপক্ষের স্বাক্ষর’। আর এই পুরনো শর্তই কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বড় ভোগান্তির।
সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ছে বিজিবি, পুলিশ, রেলওয়ে ও সামরিক বাহিনীর সদস্যদের পরিবার। কারণ, এসব বাহিনীর সদর দপ্তর ঢাকাকেন্দ্রিক। ফলে বিভিন্ন এলাকা থেকে বৃদ্ধ কিংবা অসহায় স্বজনদের স্বাক্ষরের জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে রাজধানীতে এসে।
মানিকগঞ্জের জেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মো. আশফাকুল ইসলামের ভাষ্য, বিধিমালায় স্বামী বা স্ত্রীর ক্ষেত্রে পুনর্মঞ্জুরির কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। কিন্তু ফরমে স্বাক্ষর বাধ্যতামূলক থাকায় অপ্রয়োজনীয় জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে।
হিসাব মহানিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানালেন, পেনশন বিধিমালায় মা-বাবার পারিবারিক পেনশনের ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের বিষয় আছে। তবে সরাসরি স্বামী বা স্ত্রীর ক্ষেত্রে প্রয়োজন নেই পুনর্মঞ্জুরির। পুরনো ফরম পরিবর্তন না হওয়ায় সেবাপ্রার্থীরা ভোগান্তিতে পড়ছে বলে মনে করেন তিনি।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে পেনশনারের সংখ্যা প্রায় ৯ লাখ ৩ হাজার। অন্যদিকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় ১৪ লাখ ৫০ হাজার ৮৯১ জন। এর মধ্যে রেলওয়েতে প্রায় ২৫ হাজার এবং বর্ডার গার্ড বাংলাদেশে (বিজিবি) কর্মরত ৬০ হাজারের মতো সদস্য।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে দপ্তরপ্রধানের স্বাক্ষর পেতে সময় লেগে যায় সপ্তাহের পর সপ্তাহ। ঢাকায় কয়েকবার যাতায়াত করেও কাজ শেষ করতে পারেন না অনেকে। এতে দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকে পারিবারিক পেনশন, যা বড় সংকট সৃষ্টি করে বৃদ্ধ ও অসচ্ছল ব্যক্তিদের পরিবারের জন্য।
যখন বিধানে স্পষ্টভাবে পুনর্মঞ্জুরির প্রয়োজন নেই বলা হয়েছে, তখন ফরমে কেন এখনো অনুমোদন বাধ্যতামূলক রাখা হয়েছে? এমন প্রশ্নও তোলেন অনেকে।
যদিও মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি) নুরুল ইসলামের দাবি, পেনশনব্যবস্থা সহজ করতে অটোমেশনের মাধ্যমে নেওয়া হয়েছে নানা উদ্যোগ। আগামীর সময়কে তিনি বললেন, পারিবারিক পেনশনের ক্ষেত্রে পুরনো ফরম পরিবর্তন করে সময়োপযোগী করা হবে।
‘দীর্ঘ চাকরিজীবন শেষে অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রত্যাশা থাকে সহজে পেনশনের টাকা পাওয়ার। আমরা সেই সেবাকে আরও সহজ করার চেষ্টা করছি’— যোগ করেন সিএজি।
তবে বাস্তবে এখনো অনেক পরিবারকে পেনশনের টাকার জন্য ঘুরতে হচ্ছে অফিসের বারান্দায়। স্বজন হারানোর শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই কেউ ছুটছেন জেলা শহরে, কেউ ঢাকায়, আবার কেউ দিনের পর দিন অপেক্ষা করছেন একটি স্বাক্ষরের জন্য। অথচ সরকারি বিধান বলছে, পারিবারিক পেনশন পাওয়ার প্রক্রিয়া হওয়ার কথা ছিল সহজ ও ঝামেলামুক্ত।




