নিজস্ব টাকায় হতে পারে ভোলা সেতু

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
পদ্মা সেতু দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থায় তৈরি করেছে পরিবর্তনের নতুন দৃষ্টান্ত। তেমনই আরেকটি অবকাঠামো হতে পারে ভোলা সেতু। যেটি দেশের একমাত্র দ্বীপ জেলা ভোলাকে সরাসরি সড়কপথে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করবে। এতে শুধু ভোলার মানুষের যাতায়াত সহজ হবে না, পণ্য পরিবহন, শিল্পায়ন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ পরিবহনেও তৈরি হবে নতুন সুযোগ। সেতুটি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা ছিল। এখন নতুন পথ ও নকশার দিকে যাচ্ছে বরিশাল-ভোলা সেতু। নতুন করে সমীক্ষা চলছে বিকল্প রুট নিয়ে। এতে সেতুর দৈর্ঘ্য ও নির্মাণ ব্যয়- দুটিই উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমে আসতে পারে। ফলে ১৯ হাজার কোটি টাকার সম্ভাব্য প্রকল্পটি বিদেশি ঋণের পরিবর্তে সরকারের নিজস্ব অর্থায়নেই বাস্তবায়নের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
প্রথম সমীক্ষা শেষে ভোলার ভেদুরিয়া থেকে বরিশালের ইলিশা ঘাট পর্যন্ত সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়। সেতুটি আড়িয়াল খাঁ, কালাবদর, তেঁতুলিয়া ও ইলিশা নদীর ওপর দিয়ে ভোলার সঙ্গে মেশার কথা ছিল। তবে এখন নতুন যে রুট চিন্তা করা হচ্ছে, তাতে মূল সেতুর দৈর্ঘ্য প্রায় ১১ কিলোমিটার থেকে তিন কিলোমিটারের নিচে নেমে আসবে। সঙ্গে সংযোগ সড়ক ও উড়াল সেতুর অংশও কমে আসবে। আগে যেখানে সেতু ও সড়ক অংশ মিলিয়ে দৈর্ঘ্য হতো ১৬ কিলোমিটারের বেশি।
এখন সেটি ছয় কিলোমিটারের কম হবে। এতে প্রাথমিক নির্মাণ ব্যয় ধরা হচ্ছে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ আগের পরিকল্পনার তুলনায় ব্যয় কমে আসতে পারে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা।
সেতু বিভাগের সচিব মোহাম্মদ আব্দুর রউফ আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘আগের সমীক্ষার কাজ অনেক দূর এগিয়েছিল। এখন নতুন একটি পথে আবারও সমীক্ষা করা হচ্ছে। নতুন সমীক্ষার ফল ভালো হলে ওই পথেই প্রকল্প বাস্তবায়নের সম্ভাবনা বেশি। এতে ব্যয় কমে এলে বিদেশি ঋণ ছাড়াই সরকারি অর্থায়নে সেতুটি নির্মাণ করা হতে পারে।’
বরিশাল ও ভোলার মধ্যে সেতু নির্মাণের প্রথম সম্ভাব্যতা সমীক্ষা শুরু হয় ২০১৩ সালে। ২০১৯ সালের দিকে সমীক্ষাটি শেষ হয়। তখন বরিশালের লাহারহাট ফেরিঘাট থেকে ভোলার ভেদুরিয়া ফেরিঘাট বরাবর সেতু নির্মাণের সম্ভাব্য স্থান নির্ধারণ করা হয়েছিল। ওই পরিকল্পনায় সেতুর দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ১০ কিলোমিটার। এর মধ্যে প্রায় তিন কিলোমিটার শ্রীপুর চরের ওপর দিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। পরে প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয় ৯ হাজার ৯২২ কোটি থেকে বেড়ে প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়ায়। অর্থায়নের জন্য জাপানসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগের উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পর্যায়ে যেতে পারেনি।
এখন নতুন করে যে রুট নিয়ে সমীক্ষা চলছে, তার কেন্দ্র হচ্ছে মুলাদী করিডর। এই পথে ভোলার সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ তৈরির সম্ভাব্যতা যাচাই করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন পথটি কার্যকর প্রমাণিত হলে নদী পারাপারের জন্য প্রয়োজনীয় মূল সেতুর দৈর্ঘ্য অনেকটাই কমে আসবে। এর সঙ্গে কমবে সংযোগ সড়ক, ভূমি অধিগ্রহণ ও নির্মাণের ব্যয়ও।
প্রকল্পের প্রাথমিক ভাবনায় ১০ দশমিক ৮৭ কিলোমিটার সেতুর সঙ্গে আরও প্রায় ছয় কিলোমিটার সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। তাতে সেতুর প্রতিটি স্প্যান হতো ২০০ মিটারের। চার লেনের সেতুর প্রস্থ হতো ২০ দশমিক ২৫ মিটার। সেতুর দুই পাশে থাকত সাড়ে পাঁচ কিলোমিটারের সংযোগ সড়ক। চার লেনের মূল সড়কের দুই পাশে দুটি সার্ভিস লেন হতো। সব মিলিয়ে সড়কের প্রস্থ দাঁড়াত সাড়ে ৩৯ মিটার। প্রকল্প বাস্তবায়নে ৫০৭ দশমিক ৫০ একর জমি অধিগ্রহণ করার প্রয়োজন ছিল।
এখন রুট পরিবর্তনের আলোচনা শুরু হওয়ার পর তৈরি হয়েছে বিতর্কও। নতুন পথের সমর্থকদের যুক্তি, এতে কম দূরত্বে এবং কম ব্যয়ে ভোলাকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব হতে পারে। বিপরীতে ভোলাবাসীর একটি অংশের দাবি, শুধু নির্মাণ ব্যয় কমানোর হিসাব করলেই হবে না; ভোলার সঙ্গে বরিশাল শহরসহ গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্যগুলোর যাতায়াতের সময় ও দূরত্বও বিবেচনায় নিতে হবে। গত ২৫ আগস্ট এক সংবাদ সম্মেলন করে ‘আমরা ভোলাবাসী’ সংগঠনও রুট পরিবর্তনের বিষয়ে কারিগরি ও অর্থনৈতিক যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছে। সংগঠনটির বক্তব্য, বর্তমানে রহমতপুর-হিজলা-মেহেন্দীগঞ্জ হয়ে ভোলার সঙ্গে সড়ক যোগাযোগের যে পরিকল্পনা করা হচ্ছে, সেটি সময় ও দূরত্ব কমানোর পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদে ভোগান্তি বাড়াতে পারে।
সংগঠনটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওই রুটে নতুন করে ২১ কিলোমিটার মহাসড়ক নির্মাণ, ৩৬ কিলোমিটার সড়ক পুনর্নির্মাণ বা প্রশস্তকরণ এবং মেঘনার মোহনায় তিনটি বড় সেতু নির্মাণের প্রয়োজন হতে পারে। ফলে সরাসরি বরিশাল-ভোলা সেতুর তুলনায় পুরো করিডরের নির্মাণ ব্যয়, বাস্তবায়নের সময় ও দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় কতটা যৌক্তিক হবে, তা যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন তারা।
প্রায় ২৩ লাখ মানুষের জেলা ভোলা। ৩ হাজার ৪০৩ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই দ্বীপ জেলার চারপাশে নদী থাকায় সড়কপথে সরাসরি মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যোগাযোগ নেই। ভোলার ইলিশা নদীঘাট থেকে বরিশালের মহাসড়কের দূরত্ব প্রায় ৪৮ কিলোমিটার। নদীপথে এই পথ পাড়ি দিতে স্বাভাবিক গতিতে লঞ্চে সময় লাগে প্রায় আড়াই ঘণ্টা। ফলে চিকিৎসা, শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে জরুরি প্রয়োজনে ভোলাবাসীকে নৌপথের ওপর নির্ভর করতে হয়। সম্ভাব্য সেতুটি নির্মিত হলে এই নির্ভরতা অনেকটাই কমতে পারে। ভোলা সরাসরি জাতীয় সড়ক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবে। পণ্য পরিবহন সহজ হলে জেলার কৃষি, মৎস্য ও শিল্প খাতেও এর প্রভাব পড়তে পারে। ভোলার গ্যাস দেশের অন্য অঞ্চলে পরিবহনের সুযোগও তৈরি হবে।
আগের পরিকল্পনায় বড় প্রশ্ন ছিল অর্থায়ন। জাপানকে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) ভিত্তিতে প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রস্তাব দেওয়ার পাশাপাশি অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের মাধ্যমেও বিদেশি অর্থায়নের সন্ধান করা হচ্ছিল। চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ার আগ্রহের কথাও সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসেছিল। নতুন সমীক্ষায় যদি সেতুর দৈর্ঘ্য তিন কিলোমিটারের নিচে এবং পুরো প্রকল্পের ব্যয় সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকার আশপাশে রাখা সম্ভব হয়, তাহলে অর্থায়নের হিসাবও পাল্টে যাবে। প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকার বিদেশি ঋণনির্ভর বড় প্রকল্পের বদলে তুলনামূলক কম ব্যয়ের প্রকল্প হিসেবে এটি সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি করতে পারে। এখন সেই সম্ভাবনার কেন্দ্রে রয়েছে নতুন রুটের সমীক্ষা। কারণ পথ কতটা ছোট হবে, কার যাতায়াত কতটা সহজ হবে এবং প্রকৃত ব্যয় কত দাঁড়াবে— এই তিন হিসাবের ওপরই নির্ভর করছে ভোলা সেতুর ভবিষ্যৎ।
কথা হলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান বলছিলেন, ‘একটি সেতু ১০০-১৫০ বছরের উপযোগিতা চিন্তা করে নির্মাণ করা হয়। রুট নির্ধারণের আগে দীর্ঘমেয়াদি ভাবনা ভাবতে হবে। কীভাবে বিশাল জনগোষ্ঠীকে সেবা দেওয়া যাবে, যোগাযোগের মাত্রা, জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়ানো যাবে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। প্রান্তিক মানুষ যদি সেবায় যুক্ত হতে না পারে, তাহলে ব্যয় কমাতে সেতুর দৈর্ঘ্য কমিয়ে কোনো লাভ হবে না।’



