দেশের বিভিন্ন স্থানে কালেমাখচিত পতাকা মিছিল, নেপথ্যে কী?

কালেমাখচিত পতাকা মিছিল—ফাইল ছবি
মাদারীপুর শহরের মডেল মসজিদ মোড়ে গত শনিবার আসরের নামাজ শেষে জড়ো হন দেড় শতাধিক মুসল্লি। সেখানে অনেকের হাতে ছিল কালেমাখচিত পতাকা। কোনোটির রঙ কালো, কোনোটি সাদা। কিছুক্ষণ পর মডেল মসজিদের সামনে থেকে শুরু হয় মোটরসাইকেল র্যালি। প্রতিটি মোটরসাইকেলের কোনোটিতে দুইজন, কোনোটিতে ছিলেন তিনজন আরোহী। হ্যান্ডমাইকও দেখা যায় কয়েকজনের হাতে।
স্লোগান দিতে দিতে শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে মিছিলটি। এরপর আবারো ফিরে আসে মডেল মসজিদের সামনে। সেখানে একটি সমাপনী অনুষ্ঠানও করেন মিছিলে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা। মোটরসাইকেল র্যালি ঘণ্টাখানেক ধরে চললেও সমাপনী অনুষ্ঠান ছিল মিনিট দেড়েকের। অনেকটা তড়িঘড়ি করেই অনুষ্ঠান শেষ করে চলে যান মিছিলে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা।
সমাপনী বক্তব্যে ফখরুদ্দিন রাজী নামে একজন ঘোষণা করেন, তারা যে পতাকা নিয়ে মিছিল করেছেন, সেটা ‘মুসলিমদের পতাকা’। এ ছাড়া মিছিলে থাকা তরিকুল ইসলাম নামে একজন নিজেকে একটি স্থানীয় মসজিদের ইমাম পরিচয় দেন। শহরে হঠাৎ এমন পতাকা মিছিলের কারণ কী প্রশ্নে তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন, দেশের সবখানে ফুটবলের জন্য পতাকা টাঙানো ও মিছিল করা হচ্ছে, সেখানে তারা মুসলমানদের ‘ইসলামের নিশানা কোনটি’ সেটা বোঝানোর জন্য র্যালির আয়োজন করেছেন।
দেশে কালেমাখচিত পতাকা নিয়ে এমন মিছিল কিংবা পতাকা টানানোর ঘটনা যে শুধু মাদারীপুরেই হয়েছে তা নয়, বরং ঢাকাসহ বেশ কয়েকটি জায়গায় সাম্প্রতিক দিনগুলোয় এরকম মিছিল-সমাবেশ চোখে পড়েছে। অনেক জায়গায় মিছিলে অংশগ্রহণকারীরা বিষয়টিকে ‘ইসলাম ধর্মের প্রতি ভালোবাসার প্রকাশ’ বলে দাবি করলেও প্রশ্ন উঠেছে পতাকার ডিজাইন ও রঙ নিয়ে।
কারণ, বিশ্বব্যাপী পরিচিত জঙ্গিবাদ বা উগ্রবাদী সংগঠনগুলোর ব্যবহার করা পতাকার সঙ্গে এগুলোর মিল রয়েছে। দেশে এর আগেও এ ধরনের পতাকা নিয়ে মিছিল বা জমায়েত দেখা গেছে। এদিকে, এসব পতাকা টানানোর সাম্প্রতিক ঘটনা অনুসন্ধান করায় ঢাকার একটি গণমাধ্যমকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
কালেমা লেখা কালো পতাকা নিয়ে মিছিল করছে কারা?
কালেমাখচিত পতাকা নিয়ে আলোচনা ছড়াতে শুরু করে গত জুন মাসের মাঝামাঝি সময়ে, ঢাকার যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভারে কালেমার পতাকা টানানোর ঘটনায়। ১৬ জুন মধ্যরাতে ফ্লাইওভারের বিভিন্ন অংশে এসব পতাকা টানাতে দেখা যায় একদল যুবককে।
পরেরদিন কে বা কারা সেসব পতাকা সরিয়ে ফেলে। পতাকা সরিয়ে ফেলার ঘটনাকে আবার ‘ইসলামের পতাকার অবমাননা’ হিসেবে উল্লেখ করে নতুন করে পতাকা টানানো হয় ফ্লাইওভারটিতে। পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্থানে ‘ইসলামের পতাকার মর্যাদা রক্ষায়’ মিছিল করেন অনেকেই।
যাত্রাবাড়ীতে পতাকা টানানোর ঘটনায় নাম আসে মূলত স্থানীয় কিছু তরুণ ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের। এ ছাড়া বিভিন্ন ফেসবুক পেজ থেকে পতাকা টাঙানোর আহ্বান ও বিক্রির পোস্টও ছড়িয়ে পড়ে।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, ইসলামের পতাকা বলতে কিছু কি আছে? জানতে চাইলে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পরিচালক ও ইসলামী গবেষক মো. আনিসুজ্জামান সিকদার বলেছেন, ‘ইসলামে এভাবে নির্দিষ্ট কোনো পতাকার কথা উল্লেখ নেই। ইসলামের নামে কোনো পতাকা যদি হতো, তাহলে তো আমরা সবাই সেটা ব্যবহার করতাম। এখানে কোনো উলামায়ে কেরামের পক্ষ থেকে কখনই দাবি করা হয় নাই যে, এটা বা ওটা ইসলামের পতাকা। রাসুলের জামানায় তিনি পতাকা ব্যবহার করতেন, তবে সেটা যুদ্ধের সময়। সেই পতাকা আবার একেক যুদ্ধে ভিন্ন ভিন্ন রঙের ছিল। ইসলামের রেওয়াতে নির্ধারিত কোনো পতাকার উল্লেখ পাওয়া যায় না।’
হঠাৎ কালেমা খচিত পতাকা মিছিল কেন?
ইসলাম ধর্মে যেখানে কোনো পতাকার আলাদা করে উল্লেখ নেই, তাহলে বিভিন্ন স্থানে হঠাৎ করে এগুলোকে ‘ইসলামের পতাকা’ দাবি করে মিছিল কেন এবং এর শুরু কীভাবে হলো সেই প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
এর উত্তরে দুটি বিষয় সামনে আসছে। প্রথমটি হচ্ছে, বিশ্বকাপ ফুটবল। যাকে ঘিরে সারা দেশে এবারও আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, জার্মানিসহ বিভিন্ন দেশের পতাকা লাগিয়েছেন ফুটবল ভক্তরা। বিশেষত, আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের পতাকা দেখা যাচ্ছে প্রায় সবখানে। আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে, ফুটবলের এই পতাকা টাঙানোর বিরুদ্ধে ইসলামপন্থী কারও কারও অবস্থান।
এক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে চট্টগ্রামভিত্তিক একটি কওমি মাদ্রাসা শিক্ষক ও হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসিচব মুফতি হারুন ইজহারের একটি বক্তব্য। যেখানে তাকে ফুটবল বিশ্বকাপ ঘিরে বিদেশি পতাকার বিপরীতে কালেমার পতাকা টাঙানোর কথা বলতে শোনা যায়।
যোগাযোগ করা হলে হারুন ইজহার ছড়িয়ে পড়া বক্তব্যটি তার বলে নিশ্চিত করেন। ভিডিওটি গত ১৩ জুন আল কোরআনের দারস নামে একটি ফেসবুক পেজে আপলোড করা হয়। ‘আপনারা সব জায়গায় কালেমার পতাকা লাগায় দিবেন। এখন যদি এটা জঙ্গিবাদ হয়ে থাকে তাহলে আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিল-এগুলোর সব পতাকা নামাতে হবে। এগুলো যেখানে থাকবে, আমাদের কালেমার পতাকাও থাকবে’, ভিডিওতে বলতে দেখা যায় মুফতি হারুন ইজহারকে।
ফেসবুকে তার এই বক্তব্য ছড়িয়ে পড়ে। এর পরের দিনগুলোতেই মূলত কালেমা খচিত সাদা ও কালো রঙের পতাকা ওড়ানো, মিছিল, শোভাযাত্রা এবং ফ্লাইওভার, ব্রিজ কালভার্টসহ বিভিন্ন স্থানে পতাকা লাগাতে শুরু করেন অনেকে।
এসব মিছিল কারা করছেন এবং পতাকা কারা লাগাচ্ছেন- তাৎক্ষণিকভাবে সেটা স্পষ্ট হয়নি। আবার পতাকার রঙ এবং লেখার ধরন নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
গুম কমিশনের সাবেক সদস্য ও মানবাধিকারকর্মী নুর খান লিটন দীর্ঘদিন নজর রেখেছেন দেশিটিতে জঙ্গিবাদ বিস্তৃতির উপর। তিনি বলেছেন, এখন যেসব পতাকা টানানো হচ্ছে, সেগুলোর সঙ্গে জঙ্গি সংগঠনগুলোর ব্যবহার করা পতাকার মিল রয়েছে। আল-কায়েদার প্রশিক্ষণ শিবিরগুলো এবং নাইজেরিয়ার বোকো হারাম-সেখানেও এই পতাকার ব্যবহার দেখবেন। আইসিসের যে কার্যক্রম সেখানেই এই পতাকার প্রদর্শন দেখবেন। আর আমাদের এখানে অতীতে হরকাতুল জিহাদ বা অন্যরা যারা ছিল তাদেরও কিন্তু এই পতাকার ব্যবহার ছিল। এখন এটা ব্যবহার করছে হিযবুত তাহরীর।
কিন্তু পতাকার এমন প্রদর্শনীর নেপথ্যে কী থাকতে পারে? উত্তরে নুর খান লিটন বলেছেন, ‘একটি গোষ্ঠী খুব কৌশলে এই পতাকাটাকে আসলে ব্যাপকমাত্রায় ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। আপনি পতাকাটা দেখবেন, সেখানে সাদা বা কালো কাপড়ের ভেতরে কালেমা লেখা। সুতরাং একজন মুসলিম এটাকে রেসপেক্ট করবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এই পতাকার যে একটা সিম্বলিক (প্রতীকী) অর্থ দাঁড়িয়ে গেছে বিশ্বব্যাপী, সেটা তো আমাদের সাধারণ মানুষদের বোধগম্য নয়।’
হারুন ইজহার কী বলছেন?
এর আগে বিভিন্ন সময় নিষিদ্ধ সংগঠন হিযবুত তাহরীরের মিছিলেও কালেমা খচিত সাদা ও কালো দুই ধরনের পতাকারই প্রদর্শন দেখা গেছে। ফলে নির্দিষ্ট ডিজাইনের এই পতাকার ব্যবহার নিয়ে যে এক ধরনের সন্দেহ এবং উদ্বেগ সেটা নতুন নয়।
এর মধ্যেই আবারো সাদা ও কালো পতাকা ওড়ানো এবং মিছিলের আয়োজন নিয়ে জানতে চাইলে মুফতি হারুন ইজহার অবশ্য তার বক্তব্যের ভিন্ন ব্যাখ্যা দেন। তিনি বলেছেন, এসব আয়োজনের সঙ্গে তিনি সংশ্লিষ্ট নন। ‘চট্টগ্রামে লালখান বাজারে আপনি আসেন, এখানে তো আমাদের মাদ্রাসা, আমাদের লোক সব। কিন্তু এখানে কোনো পতাকা দেখবেন না। আমি যদি আয়োজন করে পতাকা টানাতে বলতাম, তাহলে আমার নিজের এলাকাতেও তো থাকতো’, যোগ করেন তিনি।
তাহলে তার ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে কালেমার পতাকা নিয়ে বক্তব্যের ব্যাখ্যা কী? হারুন ইজহার বলছেন, এটা ফুটবল খেলাকে ঘিরে বলা হয়েছিল। খেলাকে ঘিরে অমুসলিম দেশগুলোর পতাকা এভাবে উত্তোলন করা, বিদেশি একটা পতাকা বা সিম্বলকে দেশে এভাবে গণহারে ব্যবহার করা- এটা কোনোদিক থেকেই যায় না। আমি বলেছিলাম যে, আমাদের ভাইদের অনেকেই এটাকে সাংস্কৃতিকভাবে প্রতিরোধ করতে গিয়ে কালেমার পতাকা লাগাচ্ছেন। আপনারাও এটা করতে পারেন। কালেমার পতাকা লাগান আপনারা।’
তার ভাষ্য, ‘কালেমা লেখা পতাকা নিয়ে এমন বড় বড় শোডাউন হবে সেটা ভাবতে পারিনি। আমি শুধু সংহতি প্রকাশ করতে চেয়েছি যারা পতাকা টানিয়েছেন তাদের সঙ্গে। এটা স্পিরিচুয়াল এবং কালচারাল জায়গা থেকে ছিল। আমি চিন্তাও করি নাই যে এটা এত ব্যাপক আকারে হয়ে যাবে। এরকমটা করতেও তো বলা হয়নি।’
তিনি দাবি করেন, ‘সারা দেশে এসব পতাকা নিয়ে মোটরসাইকেল র্যালি বা হাট-বাজারে টাঙানোর কাজ কারা করছে, ব্যক্তিগতভাবে সেটা জানেন না তিনি। ‘যদি সন্দেহজনক কিছু থাকে, প্রশাসন সেটা অনুসন্ধান করুক। আমরা সহযোগিতা করব এবং করছি’, বলছিলেন মুফতি হারুন ইজহার।
পুলিশ কী বলছে?
পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেছেন, ‘কোনো পতাকা বা প্রতীক যদি নিষিদ্ধ বা উগ্রবাদি সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ বহন করে কিংবা জননিরাপত্তা বা আইনশৃঙ্খলার জন্য হুমকি সৃষ্টি করে তাহলে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
সরকারের দিক থেকেও এ বিষয়ে একটি অবস্থান দেখা গেছে। কালেমাখচিত পতাকা বা অন্যান্য ধর্মীয় প্রতীককে ঘিরে কোনো ধরনের বিভ্রান্তি, অবমাননা কিংবা রাজনৈতিক অপব্যবহার কাম্য নয় বলে বৃহস্পতিবার একটি অনুষ্ঠানে উল্লেখ করেছেন বাংলাদেশের ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন। এ ধরনের যেকোনো ‘অপচেষ্টা সমাজে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে এবং জাতীয় ঐক্য বিনষ্টের কারণ হতে পারে’ বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।
মন্ত্রী কালেমাখচিত পতাকার বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়াতে আলেম-ওলামা, শিক্ষাবিদ, ধর্মপ্রাণ মানুষসহ সবাইকে সক্রিয় ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান।








