দেশে প্রথম ‘সফল’ রোবটিক সার্জারি, খরচ সাড়ে ৪ লাখ টাকা

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আয়োজিত সংবাদ সম্মেলন। ছবি : সংগৃহীত
দেশে প্রথমবারের মতো রোবটিক সার্জারির মাধ্যমে সফলভাবে দুটি অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়েছে। রাজধানীর ইউনাইটেড হেলথকেয়ার সার্ভিসেসে গতকাল সোমবার পরপর অস্ত্রোপচার দুটি করা হয়। আজ মঙ্গলবার কর্তৃপক্ষের আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয় এসব তথ্য।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অস্ত্রোপচারের পর দুইজন রোগীই সুস্থ আছেন। তারা স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলা ও খাওয়াদাওয়া করছেন।
চিকিৎসকদের মতে, দেশে রোবটিক সার্জারির যাত্রা শুরু হওয়া আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, প্রচলিত পদ্ধতিতে ওয়ার্ডে অস্ত্রোপচার করাতে খরচ পড়ে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। সিঙ্গেল কেবিনে এ ব্যয় প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা।
তবে রোবটিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে অস্ত্রোপচার করাতে খরচ হবে প্রায় চার থেকে সাড়ে চার লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রচলিত চিকিৎসার তুলনায় রোবটিক সার্জারিতে ব্যয় প্রায় আড়াই থেকে তিন গুণ পর্যন্ত বেশি।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, প্রথম অস্ত্রোপচারটি করা হয় পিত্তথলিতে পাথরে আক্রান্ত ৫০ বছর বয়সী এক পুরুষ রোগীর। অধ্যাপক ডা. রফিকুস সালেহীন তার রোবোটিক কোলেসিস্টেকটমি করেন।
দ্বিতীয় অস্ত্রোপচারটি করা হয় অতিরিক্ত জরায়ু রক্তক্ষরণে আক্রান্ত ৪৫ বছর বয়সী এক নারীর। অধ্যাপক ডা. সামছাদ জাহান (শেলী) তার রোবোটিক হিস্টেরেকটমি সম্পন্ন করেন।
মেডবট তুমাই এন্ডোস্কোপিক সার্জিক্যাল রোবটের সহায়তায় মাল্টিডিসিপ্লিনারি মেডিকেল টিমের সমন্বয়ে অস্ত্রোপচার দুটি করা হয়।
চিকিৎসকরা জানান, রোবটিক সার্জারিতে বড় ধরনের কাটাছেঁড়ার পরিবর্তে শরীরে ছোট ছিদ্র করে অস্ত্রোপচার করা যায়। রোবোটিক সিস্টেমের মাধ্যমে শরীরের ভেতরের অংশ ত্রিমাত্রিক বা থ্রিডি প্রযুক্তিতে বড় ও স্পষ্টভাবে দেখা সম্ভব। পাশাপাশি রোবোটিক আর্ম বিভিন্ন দিকে ঘোরানো যায়। ফলে শরীরের সংকীর্ণ ও জটিল অংশেও চিকিৎসকরা অধিক নিয়ন্ত্রণ ও নিখুঁতভাবে অস্ত্রোপচার করতে পারেন।
অধ্যাপক ডা. রফিকুস সালেহীন বলেছেন, রোবোটিক আর্ম ৩৬০ ডিগ্রি পর্যন্ত ঘুরতে পারে। যা মানুষের হাতের স্বাভাবিক নড়াচড়ার তুলনায় বেশি। এর ফলে জটিল স্থানে কাজ করা সহজ হয় এবং গুরুত্বপূর্ণ রক্তনালি ও আশপাশের অঙ্গ নিরাপদ রাখার সুযোগ বাড়ে। এতে রক্তক্ষরণ, টিস্যুর ক্ষতি ও অস্ত্রোপচারের পর ব্যথা কমানো এবং রোগীর দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হয়।
রোবোটিক সার্জারি দলের সদস্য অধ্যাপক ডা. মোফাজ্জল হোসেন বলেছেন, এ ধরনের অস্ত্রোপচারের জন্য চিকিৎসকদের দীর্ঘ সময় প্রশিক্ষণ নিতে হয়েছে। সিমুলেটরে নিয়মিত অনুশীলনের পাশাপাশি প্রাণীর টিস্যুতে প্রশিক্ষণ নিয়ে মানবদেহে অস্ত্রোপচারের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে দেশেই তরুণ চিকিৎসকদের রোবোটিক সার্জারিতে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
অধ্যাপক ডা. সামছাদ জাহান (শেলী) জানান, ভবিষ্যতে কার্ডিয়াক সার্জারি, নিউরোসার্জারি, ইউরোলজি, জেনারেল সার্জারি, গাইনোকোলজি ও থোরাসিক সার্জারিতেও রোবোটিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। ক্যান্সার, কোলন, রেকটাম, কিডনি, লিভার, অগ্ন্যাশয়, জরায়ু ও প্রোস্টেটের মতো জটিল অস্ত্রোপচারেও এ প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
চিকিৎসকদের মতে, বাংলাদেশে দক্ষ চিকিৎসক থাকলেও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে এতদিন ঘাটতি ছিল। রোবোটিক সার্জারি সেই ঘাটতি পূরণের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
তবে প্রযুক্তিটির সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ, রোগীদের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা তৈরি এবং চিকিৎসার ব্যয় কমানো জরুরি। ভবিষ্যতে চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনা ও রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এ সেবা সম্প্রসারণের লক্ষ্য রয়েছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, রোবোটিক সার্জারি থেকে অতিরিক্ত মুনাফা নয়, বরং দেশের চিকিৎসাসেবাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করাই তাদের মূল লক্ষ্য। এর মাধ্যমে উন্নত চিকিৎসার জন্য রোগীদের বিদেশমুখিতা কমানোর পাশাপাশি দেশে বিশ্বমানের চিকিৎসার নতুন সুযোগ তৈরি হবে।







