সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়িয়ে কি খাদে পড়ছে সরকার
- চাকরিজীবীদের বেতন দিতে ৫ হাজার কোটি টাকা ঋণের উদ্যোগ
- সামনে আরও লাখ কোটি টাকার চাপ
- বেতন বৃদ্ধির জন্য অতিরিক্ত অর্থ পুরো শিক্ষা খাতের বরাদ্দের প্রায় ৭৭ শতাংশ
- এই বাড়তি অর্থ স্বাস্থ্য খাতের মোট বরাদ্দের প্রায় ১.৬৮ গুণ
- অতিরিক্ত ব্যয় শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের সম্মিলিত বরাদ্দের প্রায় ৫৩ শতাংশ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন দিতে গিয়ে ব্যাংক থেকে আরও ৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী অক্টোবরের বেতন এবং আগের তিন মাসের বর্ধিত বেতনের বকেয়া পরিশোধ করতে এই অর্থের প্রয়োজন হচ্ছে। এ জন্য সম্প্রতি ১৪ দিন মেয়াদি বিশেষ ট্রেজারি বিলের নিলাম ডেকেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
সরকারের এই উদ্যোগের সময়টা বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, ১ নভেম্বর থেকে নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন দেওয়া শুরু হয়েছে। অর্থাৎ একদিকে দীর্ঘ ১১ বছর পর বেতন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করছে সরকার, অন্যদিকে সেই বাড়তি বেতন দিতে গিয়ে স্বল্পমেয়াদি ঋণের আশ্রয় নিতে হচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে, সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত কি শেষ পর্যন্ত সরকারের জন্য নতুন আর্থিক সংকট তৈরি করছে?
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত চলতি মাসে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে ব্যাংক খাত থেকে ৫৫ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিল সরকার। নতুন ৫ হাজার কোটি টাকার নিলামসহ অক্টোবর মাসে এই ঋণ সংগ্রহের পরিমাণ ৬০ হাজার ৩০০ কোটি টাকায় পৌঁছানোর লক্ষ্য ছিল। তবে এই পুরো অর্থকে সরকারের নতুন বা নিট ঋণ বলা যাবে না। কারণ, সংগৃহীত অর্থের একটি বড় অংশ আগের ঋণের মেয়াদপূর্তিতে পরিশোধ করতে হচ্ছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের নিট ঋণ ছিল ২৪ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা।
তবে বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগের জায়গা অন্যখানে। নিয়মিত সরকারি ব্যয়ের পাশাপাশি নতুন বেতন কাঠামোর বাড়তি ব্যয় মেটাতেও সরকারকে যখন ব্যাংকের দিকে তাকাতে হচ্ছে, তখন সরকারের রাজস্ব আয় ও ব্যয়ের সামর্থ্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দের সঙ্গে তুলনা করলে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধির আর্থিক চাপের বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নতুন বেতন কাঠামো পুরোপুরি বাস্তবায়নে বছরে অতিরিক্ত ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। এই অর্থ দেশের জিডিপির প্রায় ১.৫৫ শতাংশ।
অন্যদিকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির প্রায় ২ শতাংশ। স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ৬২ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা, জিডিপির প্রায় ০.৯২ শতাংশ।
অর্থাৎ সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধির জন্য যে বাড়তি অর্থ প্রয়োজন, তা স্বাস্থ্য খাতের মোট বরাদ্দের চেয়েও প্রায় ৪২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা বেশি। শিক্ষা খাতের বরাদ্দের প্রায় ৭৭ শতাংশের সমান এই অর্থ।
এখানে প্রশ্নটি বেতন বাড়ানো উচিত ছিল কি না, শুধু তা নয়। বরং প্রশ্ন হচ্ছে, যে দেশে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের জন্য এত বিপুল অর্থের প্রয়োজন, সেখানে একটি স্থায়ী ব্যয় বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সরকার সেই অর্থের সংস্থান কতটা নিশ্চিত করেছে?
সরকারি কর্মচারীদের ন্যায্য বেতন নিশ্চিত করা অবশ্যই রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু সেই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা ও উন্নয়ন খাত যেন অর্থসংকটে না পড়ে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
১১ বছর পর বেতন বাড়ল, কিন্তু সেই টাকা আসবে কোথা থেকে?
সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধির দাবি একেবারে অযৌক্তিক নয়। সর্বশেষ ২০১৫ সালে অষ্টম জাতীয় বেতন কাঠামো কার্যকর হয়েছিল। এরপর দীর্ঘ ১১ বছরে নিত্যপণ্যের দাম, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও শিক্ষা ব্যয় বেড়েছে কয়েক গুণ। অথচ সেই তুলনায় সরকারি কর্মচারীদের মূল বেতন কাঠামোয় কোনো বড় পরিবর্তন আসেনি।
এই বাস্তবতায় নতুন বেতন কাঠামোর দাবি সামনে আসে। ২০২৫ সালে গঠিত জাতীয় বেতন কমিশন দীর্ঘ পর্যালোচনা শেষে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে সুপারিশ জমা দেয়। ২১ জানুয়ারি অর্ন্তবর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রতিবেদন জমা দেন কমিশনের চেয়ারম্যান ও সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খান।
কমিশন সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করেছে। কমিশনপ্রধানের হিসাবে, বেতন ও ভাতাসহ এই কাঠামো বাস্তবায়নে অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে।
পরবর্তী সময়ে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে কিছু পরিবর্তন এনে গত ৩১ আগস্ট জাতীয় বেতন কাঠামো অনুমোদন করে। সরকারের হিসাবে এর অতিরিক্ত বার্ষিক ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। অর্থাৎ বেতন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত শুধু একবারের কোনো ব্যয় নয়; এটি সরকারের জন্য প্রতি বছর বহন করতে হবে এমন একটি স্থায়ী আর্থিক দায়।
অবশেষে গত ১ নভেম্বর নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন দেওয়া শুরু হয়। অনেক সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী অক্টোবরের বেতন এবং জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরের বর্ধিত বেতনের বকেয়া একসঙ্গে পেয়েছেন।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যমটি জানায়, প্রায় ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী, ৮ লাখ পেনশনভোগী এবং ৬ লাখ এমপিওভুক্ত শিক্ষক এই সুবিধার আওতায় রয়েছেন।
তবে সবার ক্ষেত্রে অর্থপ্রদান একই সময়ে হয়নি। যাদের বেতন নির্ধারণ বা পে-ফিক্সেশনের কাজ শেষ হয়েছে, তাদের অনেকেই নতুন বেতন পেয়েছেন। কেউ অক্টোবরের বেতন পেলেও আগের তিন মাসের বকেয়া পাননি। কিছু দপ্তরে বকেয়া অর্থ ম্যানুয়ালি দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।
রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি, বাড়ছে সরকারের ব্যাংকনির্ভরতা
সরকারের সমস্যাটা শুধু নতুন বেতন কাঠামোর বাড়তি ব্যয় নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজস্ব আদায়ের দুর্বলতা। অর্থাৎ চাকরিজীবীদের জন্য স্বস্তির খবর এলেও সরকারের জন্য আসল আর্থিক পরীক্ষাটা এখন শুরু।
এনবিআরের তথ্য বলছে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি হয়েছে ২৫ হাজার ৪৯১ কোটি টাকা। অথচ পুরো অর্থবছরে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা।
এদিকে চলতি অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। আগের অর্থবছরে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের ঋণ ছিল ১ লাখ ৩৪ হাজার ৫৭১ কোটি টাকা।
অর্থাৎ একদিকে সরকারের নিয়মিত ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে প্রত্যাশা অনুযায়ী রাজস্ব আসছে না। ফলে ঘাটতি মেটাতে ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।
এই বাস্তবতা আরও স্পষ্ট করা যায় এভাবে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটের প্রায় ৪২ শতাংশ বরাদ্দ রয়েছে সরকারি বেতন-ভাতা ও পেনশন, ঋণের সুদ এবং ভর্তুকি ও প্রণোদনার মতো খাতে। এসব খাতে মোট বরাদ্দ প্রায় ৪ লাখ কোটি টাকা।
অর্থাৎ সরকারের বাজেটের বড় একটি অংশ আগেই নির্ধারিত ব্যয়ের পেছনে চলে যাচ্ছে। নতুন বেতন কাঠামোর বাড়তি ব্যয় যুক্ত হওয়ায় এই চাপ আরও বাড়ছে।
অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, বেতন বাড়লে দুর্নীতি কমবে
নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে সরকারের যুক্তিও হচ্ছে, দীর্ঘদিন বেতন না বাড়ায় সরকারি চাকরিজীবীদের জীবনযাত্রার মানের সঙ্গে আয়ের অসামঞ্জস্য তৈরি হয়েছে। এই অসামঞ্জস্য দূর হলে কর্মচারীদের কাজের আগ্রহ ও দক্ষতা বাড়তে পারে।
এমনকি বেতন বাড়ানোর সঙ্গে দুর্নীতি কমার সম্পর্কও দেখছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। গত ১২ জুন রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছিলেন, আর্থিক অভাব থাকলে দুর্নীতির প্রবণতা তৈরি হয়। বেতন বাড়লে সেই প্রবণতা কমার কথা।
তার বক্তব্য ছিল, ১১ বছর ধরে পে-স্কেল হয়নি, অথচ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েছে। তাই বেতন সমন্বয় করা প্রয়োজন।
অর্থমন্ত্রীর যুক্তির একটি বাস্তব ভিত্তি আছে। একজন সরকারি কর্মচারীকে সম্মানজনক জীবনযাপনের উপযোগী বেতন দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, বেতন বাড়ালেই কি দুর্নীতি কমবে? এর কোনো নিশ্চয়তা নেই। দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজন কার্যকর জবাবদিহি, স্বচ্ছতা, তদারকি এবং অপরাধের শাস্তি নিশ্চিত করা।
অর্থনীতিবিদদের সতর্কবার্তা: বাড়তি ব্যয়ের বোঝা শেষ পর্যন্ত কার কাঁধে?
সরকারের এই সিদ্ধান্তের আর্থিক প্রভাব নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যেও উদ্বেগ রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি কমিটি নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে আগেই সতর্ক করেছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৬ সালের মুদ্রানীতিসংক্রান্ত নথিতে বলা হয়েছে, উল্লেখযোগ্য হারে রাজস্ব আদায় না বাড়িয়ে জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী বেতন বাড়ানো হলে সরকারকে ঘাটতি অর্থায়নের ওপর নির্ভর করতে হবে। এতে অর্থবাজারে চাপ সৃষ্টি হতে পারে এবং আর্থিক ব্যবস্থায় সুদের হার বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
অন্যদিকে গত ১ সেপ্টেম্বর এক সাক্ষাৎকারে অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরি বলেছেন, দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন সরকারি ব্যয় ও বাজারের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে। মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সংকট ও উৎপাদন ব্যয়ের চাপের মধ্যে বেতন বৃদ্ধির প্রভাব পণ্যমূল্যেও পড়তে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
এ ছাড়া ৯ সেপ্টেম্বর গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক নিবন্ধে অর্থনীতিবিদ ও সানেমের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক সেলিম রায়হান লিখেছেন, সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর যৌক্তিকতা থাকলেও বছরে অতিরিক্ত ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকার স্থায়ী ব্যয় বহন করার মতো আর্থিক সক্ষমতা সরকারের আছে কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন।
তার মতে, রাজস্ব আদায় না বাড়িয়ে এই ব্যয় মেটাতে গেলে সরকারকে ঋণ নিতে হবে, অন্য খাতের ব্যয় কমাতে হবে অথবা বাজেট ঘাটতি বাড়াতে হবে। এর কোনোটিই বিনা মূল্যে করা সম্ভব নয়। বিশেষ করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা ও অবকাঠামো খাতের বরাদ্দ কমিয়ে বেতন বৃদ্ধির অর্থ জোগাড় করা হলে দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতিই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
কমিশনও বলেছিল, শুধু বেতন বাড়ালেই হবে না
বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে যখন দেখা যায়, জাতীয় বেতন কমিশন নিজেও বাড়তি ব্যয়ের অর্থ সংস্থানের জন্য সরকারকে ব্যয় কমানোর পরামর্শ দিয়েছিল। কমিশন ভর্তুকি কমানো, রপ্তানি খাতের নগদ প্রণোদনা পর্যায়ক্রমে বন্ধ করা, অপ্রয়োজনীয় সরকারি ব্যয় কমানো এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীন দপ্তর একীভূত বা ছোট করার সুপারিশ করেছিল। পাশাপাশি অকার্যকর উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দ কমানো এবং করব্যবস্থায় সংস্কার এনে রাজস্ব আয় বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছিল।
অর্থাৎ কমিশনও বুঝেছিল, বেতন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে হলে সরকারের আয় বাড়াতে হবে এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমাতে হবে। কিন্তু এসব সংস্কার কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
তাহলে কি বেতন বাড়িয়ে সরকার নিজেই বিপদে পড়েছে?
সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে এককথায় ভুল বলা যাবে না। কিন্তু প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া আর সেই সিদ্ধান্তের আর্থিক দায় বহন করার সক্ষমতা থাকা এক বিষয় নয়।
সরকার এখন এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি, যেখানে একদিকে সরকারি কর্মচারীদের বাড়তি বেতন দিতে হচ্ছে, অন্যদিকে রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি রয়েছে। ঋণের সুদ পরিশোধের চাপ রয়েছে, জ্বালানি ও ভর্তুকির ব্যয় রয়েছে, আবার উন্নয়ন ব্যয়ও চালিয়ে যেতে হচ্ছে।
এখন যদি সরকার বাড়তি বেতন দিতে গিয়ে ব্যাংকঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রাপ্তি, বিনিয়োগ এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হতে পারে। আবার বেতন বৃদ্ধির অর্থ জোগাতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা সামাজিক সুরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতের বরাদ্দ কমানোও কোনো ভালো সমাধান নয়।
সবচেয়ে বড় কথা, বেতন বাড়ানোর সুবিধা পাচ্ছেন সরকারি চাকরিজীবীরা। কিন্তু এর আর্থিক দায় বহন করতে হবে পুরো অর্থনীতিকে। করদাতা, বেসরকারি চাকরিজীবী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, কৃষক কিংবা নির্দিষ্ট আয়ের সাধারণ মানুষ—সবাই কোনো না কোনোভাবে এর প্রভাব অনুভব করতে পারেন।
১ নভেম্বর সরকারি চাকরিজীবীদের ব্যাংক হিসাবে নতুন বেতনের অর্থ জমা হয়েছে। তাদের জন্য এটি স্বস্তির খবর। কিন্তু এর ঠিক কয়েক দিন আগে, ২৮ অক্টোবর, নতুন বেতন ও বকেয়া পরিশোধের বাড়তি অর্থ জোগাতে ৫ হাজার কোটি টাকার বিশেষ ট্রেজারি বিলের নিলাম আয়োজনের খবর প্রকাশিত হয়েছে। এই দুই ঘটনা পাশাপাশি রাখলেই সরকারের সামনে থাকা চ্যালেঞ্জটি বোঝা যায়।
সরকার কর্মচারীদের বেতন বাড়িয়েছে, কিন্তু সেই বেতন দেওয়ার মতো আর্থিক সক্ষমতা কি যথেষ্ট শক্তিশালী করতে পেরেছে? যদি রাজস্ব আয় না বাড়ে, ব্যয় ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা না আসে এবং ঋণনির্ভরতা কমানো না যায়, তাহলে আজকের বেতন বৃদ্ধির আনন্দ আগামী দিনের অর্থনৈতিক চাপের কারণ হয়ে উঠতে পারে।
তাই প্রশ্নটি শুধু সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানো নিয়ে নয়। প্রশ্ন হচ্ছে, বেতন বাড়িয়ে সরকার কি নিজের জন্য নতুন আর্থিক ফাঁদ তৈরি করল? নাকি সময়মতো রাজস্ব ও ব্যয় ব্যবস্থাপনায় সংস্কার করে এই চাপ সামলে নেওয়া সম্ভব হবে?
সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা—বেতন বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি পূরণ করা, আবার সেই প্রতিশ্রুতির খরচ মেটাতে গিয়ে দেশের অর্থনীতিকে আরও ঋণের বোঝায় ডুবিয়ে না ফেলা।







