জিইডির প্রতিবেদনে তথ্য
কৃষিতে কমছে আয়, বাড়ছে অকৃষিতে
- নগরায়ণে বদলে গেছে গ্রামীণ অর্থনীতির চিত্র
- কৃষিতে ১০ বছরে কর্মসংস্থান কমতে পারে ২৩%
- গ্রামীণ ঋণেও কৃষির অংশ কমেছে ৯%

বদলে যাচ্ছে দেশের গ্রামীণ অর্থনীতির চিত্র। দিন যতই যাচ্ছে ঘটছে রূপান্তর, কমছে কৃষিভিত্তিক আয়নির্ভরতা। বাড়ছে অকৃষি কর্মকাণ্ড। এই পরিবর্তনের ক্ষেত্রে রেমিট্যান্স, উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা, করপোরেট সম্পৃক্ততা, নতুন উৎপাদন সম্পর্ক, সামাজিক পরিবর্তন, নারীর ভূমিকা, ক্ষমতার গতিপ্রকৃতি, স্থানীয় রাজনীতির প্রভাব দেখছে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি)। এই দপ্তরের ‘ফাইভ ইয়ার স্ট্র্যাটেজিক ফ্রেমওয়ার্ক’ বলছে, অকৃষি কার্যক্রমের দিকে কাঠামোগত রূপান্তর ঘটায় ২০২০ সালের মধ্যে কৃষি খাতে কর্মসংস্থান ৪৩ শতাংশ থেকে ২০৩০ সাল নাগাদ নামতে পারে ২০ শতাংশে।
জিইডির প্রতিবেদন বলছে, গত দশকগুলোয় দ্রুত পরিবর্তন এসেছে দেশের গ্রামীণ এলাকায়। ভোক্তার চাহিদা, শিক্ষার আকাঙ্ক্ষা এবং শহুরে প্রভাব দিচ্ছে নতুন রূপ। কৃষকরা এখন আর শুধু কৃষির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বাড়ছে অকৃষি কার্যক্রম। দেশের গ্রামীণ অর্থনীতি একটি গভীর কাঠামোগত রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যা ‘কৃষি পরিবার’ সম্পর্কিত প্রচলিত ধারণাকে করছে চ্যালেঞ্জ। গ্রামীণ জীবনযাত্রায় আসছে বৈচিত্র্য, যেখানে অনেক কৃষি পরিবারের আয়ের ৬০ শতাংশের বেশি এখন অকৃষি খাত থেকে আসে।
‘প্রায় ১৩ শতাংশ মানুষ কৃষিকাজের ওপর নির্ভরশীল। একই সময়ে যান্ত্রিকীকরণের প্রসার, কৃষি মজুরি বৃদ্ধি এবং গ্রামীণ শ্রমিকদের অকৃষি কর্মকাণ্ডের দিকে ঝুঁকে পড়ার কারণে কৃষিভিত্তিক কর্মসংস্থান দ্রুত কমছে। এই পরিবর্তন পারিবারিক ভূমিকাও বদলে দিচ্ছে। পুরুষরা শহুরে ও অকৃষি কাজে চলে যাওয়ায় ফসল উৎপাদন, গবাদি পশু ও হাঁস-মুরগি পালনের দায়িত্ব নিচ্ছেন নারীরা। যদিও কৃষিকাজের সম্প্রসারণ, ঋণ এবং বাজারব্যবস্থা নারী কৃষকদের জন্য এখনো শক্ত অবস্থান তৈরি করেনি। অন্যদিকে ধান চাষ ছেড়ে ভুট্টা, শাকসবজি ও আলুর মতো উচ্চমূল্যের ফসল চাষে বৈচিত্র্য আনার স্পষ্ট আগ্রহ দেখাচ্ছেন কৃষকরা। যেখানে বাজার, ঋণ এবং কারিগরি সহায়তা পাওয়া যায়। তবুও এই রূপান্তর অসম এবং ভঙ্গুর’— উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনে।
এদিকে ২০০০ সাল থেকে ‘দেশের গ্রামীণ ঋণ বাজারের কাঠামোগত রূপান্তর’ শীর্ষক গবেষণা করেছেন বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণা পরিচালক ড. কাজী ইকবাল। গত ১২ অক্টোবর এ প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, ‘মোট গ্রামীণ ঋণে কমছে কৃষির অংশ। গ্রামীণ ঋণের মধ্যে প্রকৃত অর্থে কৃষির জন্য নেওয়ার অংশ ২৫ থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ১৬ শতাংশে। এটি অর্থনীতির সামগ্রিক কাঠামোগত রূপান্তরের প্রতিফলন বলা যায়। তা ছাড়া, কৃষি ঋণ যা নেওয়া হচ্ছে, তা মূলত সার, বীজ, গবাদি পশু ক্রয় ও নগদ ভূমি ইজারায় ব্যয় হয়ে থাকে। কিন্তু কৃষিযন্ত্র কেনার ক্ষেত্রে খরচ হয় না বললেই চলে।’
জিইডির ফ্রেমওয়ার্কে বলা হয়েছে, দেশের কৃষি প্রধানত ক্ষুদ্র খামারের মাধ্যমে পরিচালিত হয়, যেখানে খামারের গড় আয়তন ১৯৬০-এর দশকে ১ দশমিক ৫ হেক্টর থেকে কমে ২০২১ সালে শূন্য দশমিক ৬ হেক্টরে নেমেছে। আবার আবাদি জমির প্রায় ৭৫ শতাংশ জুড়ে ধান চাষ হয় এবং এটি মোট ক্যালোরি গ্রহণের প্রায় ৭০ শতাংশ পূরণ করে। ধানের গড় ফলন ১৯৭১ সালে হেক্টরপ্রতি ১ দশমিক ৭ টন থেকে ২০২৩ সালে ৪ দশমিক ৮ টনে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিআরআরআই ধান ১০৭ এবং বিআরআরআই ধান ১০৮-এর মতো উচ্চ ফলনশীল জাতগুলো অনুকূল পরিস্থিতিতে হেক্টরপ্রতি ৬-৭ টন ফলন দিলেও বর্তমান গড় খামার ফলনের তুলনায় ২৫-৪০ শতাংশের একটি ব্যবধান তৈরি হয়। এই ব্যবধান পূরণ করা গুরুত্বপূর্ণ।
জিইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৯৬-২০১৯ সাল পর্যন্ত কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি বার্ষিক ৪ শতাংশের বেশি থাকলেও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা কমে ৩ দশমিক ২১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এই মন্দা ঠিক এমন একসময়ে ঘটছে, যখন খাদ্য মূল্যস্ফীতি এবং গম আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করাকে সবচেয়ে বেশি জরুরি করে তুলেছে।
জিইডির সদস্য (সচিব) ড. মনজুর হোসেনের ভাষ্য, দেশের গ্রামীণ দারিদ্র্যের হার ২০০০ সালের ৫৩ শতাংশ থেকে কমে ২০২২ সালে দাঁড়িয়েছে ২৬ শতাংশে। এটি দক্ষিণ এশিয়ার উন্নয়ন ইতিহাসে অন্যতম টেকসই দৃষ্টান্ত। এই অর্জন বাস্তব এবং একে অবমূল্যায়ন করা উচিত নয়। এর পেছনে প্রধান চালিকাশক্তি রেমিট্যান্স প্রবাহ। এতে উচ্চ অভিবাসনপ্রবণ জেলাগুলোয় গ্রামীণ পরিবারের আয়ের ৩০ শতাংশ বা তার বেশি জোগান দেয় প্রবাসী আয়। এ ছাড়া রয়েছে নারীর পোশাক খাতে অন্তর্ভুক্তি, এনজিওর আর্থিক পরিষেবা এবং কৃষির বাণিজ্যিকীকরণ।



