আর শোনা যায় না ক্রিং ক্রিং
- ল্যান্ডফোন আছে মাত্র শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ পরিবারে
- প্রতি ১০০ পরিবারের ৯৯টিতে এখন মোবাইল ফোন

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
একসময় বাসার ড্রইংরুমে রাখা ল্যান্ডফোন ছিল যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম। দেশ কিংবা বিদেশ থেকে আসা কলে ক্রিং ক্রিং শব্দে ফোন বেজে উঠলেই ছুটে যেত পরিবারের সবাই। কিন্তু এখন সময় বদলেছে। সেই জায়গা দখল করেছে হাতে ধরা স্মার্টফোন। কল থেকে ব্যাংকিং, পড়াশোনা, চিকিৎসা, কেনাকাটা— সবই এখন মোবাইল ফোনে। ক্রিং ক্রিং যেন হারিয়ে যাচ্ছে।
বর্তমানে বিশ্বে প্রতি ১০০ মানুষের বিপরীতে ১১২টি মোবাইল সংযোগ বিদ্যমান। অন্যদিকে, ল্যান্ডফোনের ব্যবহার প্রতি ১০০ জনে নেমেছে মাত্র ৯ দশমিক ৯টি সংযোগে। টেলিযোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানে মোবাইল ফোনের প্রযুক্তি, বহনযোগ্যতা এবং সহজ ব্যবহার পুরোপুরি বদলে দিয়েছে মানুষের দৈনন্দিন যোগাযোগের ধরন। ফলে ল্যান্ডফোনের প্রতি মানুষের আগ্রহ কমেছে স্বাভাবিকভাবেই।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘আইসিটি প্রয়োগ ও ব্যবহার জরিপ ২০২৫-২৬’-এর তৃতীয় কোয়ার্টারের ফলাফলে দেখা গেছে, মোবাইল ফোন রয়েছে দেশের ৯৮ দশমিক ৯ শতাংশ পরিবারের কাছে। এর মধ্যে ৭৩ দশমিক ৪ শতাংশ পরিবারে আছে স্মার্টফোন। বিপরীতে ল্যান্ডফোন রয়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ পরিবারে। অর্থাৎ ঘরের ‘স্থায়ী টেলিফোন’ এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে। জরিপে দেখা যায়, ৯৮ দশমিক ২ শতাংশ পরিবার শুধু মোবাইল ফোনই ব্যবহার করে। একই সঙ্গে মোবাইল ও ল্যান্ডফোন— দুই ধরনের সংযোগ রয়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ পরিবারে।
বিটিআরসির সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুন শেষে দেশে মোবাইল ফোন সংযোগের সংখ্যা প্রায় ১৮ কোটি ৮৪ লাখ, আর ইন্টারনেট গ্রাহক প্রায় ১৩ কোটি ৩৬ লাখ। গত এক দশকে মোবাইল ফোন ও মোবাইল ইন্টারনেটের এই বিস্ফোরণমূলক সম্প্রসারণের বিপরীতে ল্যান্ডফোনের ব্যবহার কমেছে ধারাবাহিকভাবে। বর্তমানে ৫৭ দশমিক ৪ শতাংশ পরিবারে ইন্টারনেট সংযোগ রয়েছে, যা আগের বছরে ছিল ৫৫ দশমিক ১ শতাংশ। ব্যক্তিপর্যায়ে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর হার ৫৮ দশমিক ৬ শতাংশ, আর নিজস্ব মোবাইল ফোনের মালিকানা বেড়ে হয়েছে ৬৫ দশমিক ৪ শতাংশ।
অন্যদিকে কম্পিউটার রয়েছে মাত্র ৯ শতাংশ পরিবারের ঘরে। অর্থাৎ স্মার্টফোন দ্রুত মানুষের হাতে পৌঁছালেও কম্পিউটার এখনো তুলনামূলক কম বিস্তৃত। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, স্মার্টফোনের সহজলভ্যতা ও কম খরচে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগই এই পরিবর্তনের প্রধান কারণ।
তবে প্রযুক্তির এই অগ্রযাত্রার মধ্যেও দেশের ৪২ দশমিক ৬ শতাংশ পরিবারের এখনো ইন্টারনেট সংযোগ নেই এবং ২৬ দশমিক ৬ শতাংশ পরিবারের হাতে স্মার্টফোনও পৌঁছায়নি। ফলে ডিজিটাল বৈষম্য পুরোপুরি দূর হয়নি।
বিটিআরসি ও সংশ্লিষ্ট খাতের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০০৯ সালে দেশে প্রায় ১৩ লাখ ৭২ হাজার ল্যান্ডফোন সংযোগ ছিল। বর্তমানে বিটিআরসি আর নিয়মিতভাবে ল্যান্ডফোন সংযোগের সংখ্যা আলাদাভাবে প্রকাশ করে না, যা এই খাতের গুরুত্ব কমে যাওয়ারই ইঙ্গিত দেয়। অন্যদিকে ২০০৯ সালে দেশে মোবাইল ফোন সংযোগ ছিল প্রায় ৫ কোটি। সেই সংখ্যা বেড়ে ২০২৬-এর মে মাসে হয়েছে ১৮ কোটি ৮৭ লাখ। টেলিযোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ড. মো. জাহিদুল ইসলাম আগামীর সময়কে বললেন, ‘বর্তমানে মোবাইল ফোনের প্রযুক্তি, বহনযোগ্যতা এবং সহজ ব্যবহার মানুষের দৈনন্দিন যোগাযোগের ধরন পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। ফলে ল্যান্ডফোনের প্রতি মানুষের আগ্রহ স্বাভাবিকভাবেই কমেছে। ল্যান্ডফোন সংযোগ নিতে এখনো রয়েছে বিভিন্ন ধরনের সীমাবদ্ধতা। সব এলাকায় সংযোগ পাওয়া যায় না, নতুন লাইন নিতে ঝামেলাও তুলনামূলক বেশি। অন্যদিকে মোবাইল ফোন সহজেই পাওয়া যায় এবং যেকোনো স্থানে ব্যবহার করা যায়।’
তবে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে ল্যান্ডফোনের ব্যবহার পুরোপুরি শূন্যে নেমে যাবে— এমনটি মনে করেন না জাহিদুল ইসলাম। তার ভাষ্য, ‘সরকারি অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, করপোরেট প্রতিষ্ঠান এবং কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে ল্যান্ডফোনের প্রয়োজনীয়তা এখনো রয়েছে।’






