তিস্তা মহাপরিকল্পনা
চীনের অর্থায়নে শঙ্কা
- প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে আলোচনা নাও হতে পারে
- বাংলাদেশের চাওয়া ৬,৭১০ কোটি টাকার ঋণে সাড়া নেই
- আগে অর্থায়নে আগ্রহ দেখালেও অজ্ঞাত কারণে চুপ দেশটি

সংগৃহীত ছবি
ধাক্কা খাচ্ছে উত্তরাঞ্চলের পাঁচ জেলার মানুষের স্বপ্ন। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে চীনের কাছে চাওয়া ঋণের বিষয়ে এখনো কোনো সাড়া মেলেনি। অন্তর্বর্তী সরকারের পর বিএনপির নেতৃত্বে নির্বাচিত সরকার এসেছে। কিন্তু এখনো চীনের অর্থায়ন নিয়ে বিরাজ করছে শঙ্কা। এতদিন ভারত না চীন— এ নিয়েই ছিল দোটানা। পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রথম পছন্দ ছিল ভারত।
সব জল্পনার অবসান ঘটিয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে অন্তর্বর্তী সরকার চীনের কাছে ৫৫ কোটি ডলার বা প্রায় ৬ হাজার ৭১০ কোটি টাকা ঋণ চায়। কিন্তু যেকোনো প্রকল্পের মতো এ ঋণ চুক্তির ক্ষেত্রেও ধীরে চলো নীতিতে এগোচ্ছে দেশটি।
এদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের সময় তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে আলোচনার সম্ভাবনা তৈরি হলেও শেষ পর্যন্ত আলোচনা নাও হতে পারে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
সংস্থাটির দায়িত্বশীল একটি সূত্র গতকাল রবিবার আগামীর সময়কে জানায়, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাংলাদেশের জন্য কাঙ্ক্ষিত প্রকল্প। আগে এটিতে অর্থায়ন করতে ব্যাপক আগ্রহ থাকলেও অজ্ঞাত কারণে এ নিয়ে কোনো কথাই বলছে না চীন। এমনকি প্রধানমন্ত্রীর এই সফরেও বিষয়টি রাখা নেই বললেই চলে। ফলে শেষ পর্যন্ত ঋণটির ভাগ্যে কী আছে সেটি বলা সম্ভব হচ্ছে না। এ ছাড়া বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এ নিয়ে ইআরডিকেও কোনো নির্দেশনা দেয়নি। ফলে চীনের সঙ্গে ঋণ পাওয়ার বিষয়ে কোনো যোগাযোগও এগোয়নি।
সূত্র জানায়, ‘কম্প্রিহেনসিভ ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রেস্টোরেশন অব তিস্তা রিভার প্রজেক্ট’-এ অর্থায়নের জন্য পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় ২০২৫ সালের ২৬ মে একটি চিঠি পাঠায় পরিকল্পনা কমিশনে। চিঠিতে তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়নে চীনের ঋণের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। পরে ওই বছরের জুলাই মাসে চীনা দূতাবাসে ঋণ চেয়ে চিঠি পাঠায় ইআরডি। এ চিঠিতে বলা হয়, তিস্তা প্রকল্পের প্রথম পর্যায় বাস্তবায়নে ব্যয় হবে ৭৫ কোটি ডলার বা প্রায় ৯ হাজার ১৫০ কোটি টাকা। এর মধ্যে চীনের কাছ থেকে ঋণ চাওয়া হয়েছে ৫৫ কোটি ডলার বা প্রায় ৬ হাজার ৭১০ কোটি টাকা। বাকি টাকা সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে ব্যয় করা হবে। ২০২৬ থেকে ২০২৯ সালের জুনের মধ্যে এটি বাস্তবায়ন করার কথা ছিল পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের।
সূত্র জানায়, প্রায় ২৪০ বছরের পুরনো নদী তিস্তা। এর সঙ্গে রয়েছে উত্তরের ২৫টি নদীর প্রবাহ। শুষ্ক মৌসুমে নদীটি একেবারেই শুকিয়ে যায়। নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট, উলিপুর, চিলমারী, রংপুরের গঙ্গাচড়া, কাউনিয়া ও পীরগাছা, গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ওপর দিয়ে বয়ে গেছে নদীটি। তবে শুষ্ক মৌসুমে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলা। এ উপজেলার ৯টি ইউনিয়নের মধ্যে সাতটিই তিস্তা নদীবেষ্টিত। নদীশাসন না হওয়ায় গত পাঁচ বছরে গতিপথ পরিবর্তন হয়েছে।
তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে তিস্তা পাড় হয়ে উঠবে পূর্ব চীনের জিয়াংসু প্রদেশের সুকিয়ান সিটির মতো সুন্দর নগরী। চীনের হোয়াংহো নদীকে একসময় বলা হতো চীনের দুঃখ। প্রতি বছর ওই নদীর পানি ভাসিয়ে দিত শত শত মাইল জনপদ। ভেঙে নিয়ে যেত বহু গ্রাম-পথ-ঘাট জনপদ। নদীশাসন করায় চীনের মানুষের দুঃখ ঘুচেছে। হোয়াংহো এখন হয়ে গেছে চীনের কৃষকদের জন্য আশীর্বাদ। হোয়াংহোর মতোই এখন বাংলাদেশের রংপুর অঞ্চলের ‘পাগলা নদী’খ্যাত তিস্তা ড্রেজিং করে কোটি মানুষের দুঃখ ঘোচানোর দাবি দীর্ঘদিন ধরেই করে আসছেন এ অঞ্চলের মানুষ।
ইআরডি সূত্র জানায়, বাংলাদেশ থেকে ঋণের প্রস্তাব পাওয়ার পর চীন সরকার চুক্তির একটি খসড়া তৈরির কাজ শুরু করেছিল। সেটি এখনো ইআরডিতে পাঠায়নি চীন। এরই মধ্যে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরির কাজ করলেও সেটি চূড়ান্ত করতে পারেনি। তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে এর আগে একটি প্রস্তাব দিয়েছিল চীন। সেটি বাস্তবায়ন হলে বদলে যাবে উত্তরাঞ্চলের পাঁচ জেলার মানুষের ভাগ্য।
১০৮ কিলোমিটার নদী খনন, নদীর দুই পাড়ে ১৭৩ কিলোমিটার তীর রক্ষা, চর খনন, নদীর দুই ধারে স্যাটেলাইট শহর নির্মাণ, বালু সরিয়ে কৃষিজমি উদ্ধার ও ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকার সম্পদ রক্ষা এবং প্রতি বছর ২০ হাজার কোটি টাকার ফসল উৎপাদন। নৌবন্দর এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় দুই পাড়ে থানা, কোস্ট গার্ড ও সেনাবাহিনীর জন্য ক্যাম্পের ব্যবস্থা থাকার কথা বলা হয়েছিল।






