আগুন নেভানোর দায় কি একাই ফায়ার সার্ভিসের?

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
রাজধানীর বেশিরভাগ বহুতলে নেই অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা। মানা হচ্ছে না অগ্নিনিরাপত্তা আইন ও বিধিমালা। অধিকাংশ ভবনেই নেই ন্যূনতম অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র। সম্প্রতি রাজধানীর আল বারাকা টাওয়ারে ঘটে যাওয়া অগ্নিকাণ্ড দেশের আবাসন খাতের এই বিপজ্জনক বাস্তবতা আবারও সামনে এনে দিয়েছে।
গত ২৬ জুন রাতে আল বারাকা টাওয়ারের আগুন নেভাতে রাত ১টা ৫ মিনিটের দিকে ছুটে যায় ফায়ার সার্ভিসের ৬টি ইউনিট। কিন্তু ভবনে নিজস্ব অগ্নিনিরাপত্তা বা পানির ব্যবস্থা না থাকায় আগুন নেভাতে তাদের চরম বেগ পেতে হয়। প্রায় দুই ঘণ্টার ক্লান্তিকর চেষ্টা শেষে রাত ৩টা ৮ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক কাজী নাজমুজ্জামান বলছিলেন, ‘আল বারাকা ভবনে আমরা অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা পাইনি। অর্থাৎ ভবনটি আমাদের নীতিমালার বাইরে নির্মাণ করা হয়েছে। এ ছাড়া এই বহুতলে কোনো ‘ল’ চেম্বার থাকতে পারে না, যা এখানে ছিল।’
প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় ফায়ার সার্ভিসের (ঢাকা জোন-১) উপসহকারী পরিচালক এনামুল হকের। তিনিও সেদিন আগুন নেভাতে কাজ করে যাচ্ছিলেন। জানালেন, শুধু এই ভবনটিই নয়, ঢাকার সিংহভাগ ভবনের চিত্র একই।
বললেন, ‘ঢাকার অনেক ভবনেই অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা নেই। কোথাও থাকলেও সেগুলো অকার্যকর। তবে আমাদের সবচেয়ে বেশি সমস্যা হয় সরু রাস্তা এবং ভবনের সামনে গাদাগাদি করে মালামাল রাখা থাকলে। তখন ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি বাসার সামনে নেওয়া যায় না।’
বহুতলে নিজস্ব ওয়েট রাইজার বা ড্রাই রাইজার ব্যবস্থা না থাকলে ওপরের তলায় পানি উঠাতে দমকলকর্মীদের সমস্যা হয়।
বাস্তবচিত্র দেখতে ধানমন্ডি, পুরান ঢাকা, মিরপুরসহ ঢাকার বিভিন্ন এলাকা সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, বেশিরভাগ ভবনেই অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। কোনো কোনো ভবনে সিলিন্ডার বা সরঞ্জাম থাকলেও সেগুলো ব্যবহারের অনুপযোগী বা অচল।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী উজ্জ্বল হাসান চার বছর ধরে ঢাকায় থাকেন। অভিজ্ঞতা তুলে ধরলেন, ‘প্রথমে মিরপুর এবং পরে পুরান ঢাকার দুটি ভবনে থেকেছি। কিন্তু কখনো কোনো ভবনে অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা দেখিনি। উল্টো দুটি বাসায় সবসময় ছাদ তালা দেওয়া থাকত। আগুন লাগলে ভবনের ছাদে গিয়ে যে আশ্রয় নেব— সেই সুযোগটাও নেই।’
ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বললেন, ‘মালিকদের বহুতল ভবন করার মতো টাকা থাকে, কিন্তু ভবনে অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা রাখার টাকা থাকে না।’
ফায়ার সার্ভিসের সাবেক ডিজি আবু নাঈম মো. শাহিদউল্লাহ এ বছরই উত্তরায় ভবনে অগ্নিকাণ্ডে ছাদ বন্ধ থাকায় ৬ জনের মৃত্যু কথা জানালেন।
উল্লেখ করলেন, কোনো ফ্লোরে আগুন লাগলে ধোঁয়া ওপরের দিকে উঠে। তাই নিচের তলার বাসিন্দারা ভবন থেকে বের হয়ে যেতে পারে। কিন্তু উপরতলার মানুষের পক্ষে নামার সুযোগ থাকে না। বাঁচার জন্য একমাত্র ফাঁকা জায়গা হলো ছাদ।
সেখানে আপাতত আশ্রয় নিলে ফায়ার সার্ভিস তাদের উদ্ধার করতে পারে। তাই বাড়ির ছাদ সবসময় খোলা রাখার পরামর্শ দেন তিনি।
‘২০ তলা ভবনে যে খরচ তার এক ভাগেই প্রয়োজনীয় অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা রাখা যায়। কিন্তু মালিকরা অনৈতিকভাবে ভবন নির্মাণ করে। অথচ কর্তৃপক্ষের কাছে ধরা পড়লে ঠিকই এর চেয়ে বেশি অঙ্কের জরিমানা দিতে হয়। এই কাজ শুধু অনৈতিক নয়, অমানবিকও’, যোগ করেন আবু নাঈম মো. শাহিদউল্লাহ।
একই চিত্র রাজধানীর ধোলাইখালের ৯তলার একটি ভবনের। সেখানে ফায়ার রাইজার তো দূরের কথা, সাধারণ একটি অগ্নিনির্বাপক সিলিন্ডারও নেই। আগুনের সূত্রপাত হলে তা প্রাথমিক অবস্থায় নেভানোর কোনো উপায় রাখা হয়নি। এ বিষয়ে ভবন মালিক জামালউদ্দীনের সঙ্গে কথা হয়।
বললেন, ‘কখনো তো এ রকম দুর্ঘটনা ঘটে নাই। ভাড়াটিয়াদের সতর্ক থাকতে বলি সবসময়। তবে আগুন লাগার খবর শুনে দোকানে বলে রাখছি, যন্ত্র পাঠিয়ে দিবে দোকানি।’
অধিকাংশ ভবনগুলোয় ফায়ার অ্যালার্ম বা স্মোক অ্যালার্ম নেই। ফলে আগুন লাগলে ভবনের বাসিন্দারা প্রথমদিকে জানতেই পারেন না। ১৩তলা থেকে আগুন লাগা কাঁটাবনের আল বারাকা টাওয়ারেও ছিল না স্মোক অ্যালার্ম। সেই তলায়ই থাকতেন নবীর হোসেন। জানালেন, আগুন লাগার খবর তিনি জানতেই পারেননি প্রথমে। রাতে ঘুমিয়ে ছিলেন। পরে তার ভাগ্নে ফোনে আগুন লাগার খবর পেয়ে তাকে ডেকে তোলেন। তখন বের হয়ে ধোঁয়ায় কিছু দেখতে পারছিলেন না।
দেশের বিদ্যমান আইন অনুযায়ী, বহুতলে অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করা আইনি বাধ্যবাধকতা। ‘অগ্নিপ্রতিরোধ ও নির্বাপণ আইন, ২০০৩-এর ধারা ৪ অনুযায়ী, যেকোনো বাণিজ্যিক বা বহুতল ভবন ব্যবহারের জন্য ফায়ার সার্ভিসের ‘অগ্নি প্রতিরোধক ছাড়পত্র’ নেওয়া বাধ্যতামূলক। আইন অমান্য করলে অনূর্ধ্ব ৩ বছরের কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড ও ভবন সিলগালার বিধান।
একইভাবে ‘বাংলাদেশ জাতীয় বিল্ডিং কোড’ এবং ‘ইমারত নির্মাণ বিধিমালা, ২০০৮’ অনুযায়ী বহুতল ভবনে ফায়ার লিফট, আগুন প্রতিরোধী ফায়ার ডোরসহ জরুরি সিঁড়ি, স্বয়ংক্রিয় স্প্রিঙ্কলার সিস্টেম, অগ্নিনির্বাপণের জন্য সুনির্দিষ্ট পানির রিজার্ভার এবং ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি চলাচলের জন্য ভবনের চারপাশে নির্দিষ্ট পরিমাণ জায়গা (সেটব্যাক) ফাঁকা রাখা বাধ্যতামূলক।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবু নাঈম মো. শাহিদউল্লাহ জানালেন, এই সমস্যা সমাধানে শুধু একপক্ষের নয়, সবার এগিয়ে আসতে হবে। ‘বিএনবিসি’ আরও আধুনিক করে আইনের প্রয়োগ করতে হবে। পাশাপাশি ভবনের নিরাপত্তাকর্মীদের অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
জোর দিচ্ছিলেন, ‘আগুনের উৎস চিহ্নিত করতে হবে। অধিকাংশ অগ্নিকাণ্ড ঘটে বৈদ্যুতিক লাইন থেকে। তাই ভবনে ভালোমানের বৈদ্যুতিক তার, সুইচ ও সার্কিট ব্যবহার এবং প্রতিবছর লাইন পরীক্ষা করা উচিত। পাশাপাশি প্লাগে ভোল্টেজ ধারণক্ষমতার ভিত্তিতে ইলেকট্রিক ডিভাইস ব্যবহার করতে হবে।’
তিনি মনে করেন, ‘উন্নত দেশগুলোর মতো দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করলে এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি কমবে। সরকারের উচিত মানুষের মৃত্যুর ক্ষেত্রে কম্প্রোমাইজ না করা।’






