মশা নিয়ন্ত্রণ একটি চক্রের হাতে বন্দি : জাবি অধ্যাপক কবিরুল বাশার
- ডেঙ্গুতে ২৪ ঘণ্টায় ৭ মৃত্যু, আক্রান্ত ৫৫ হাজার ছাড়াল

ছবি: আগামীর সময়
দেশের মশা নিয়ন্ত্রণ একটি চক্রের হাতে বন্দি বলে মন্তব্য করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাশার। তার ভাষ্য, সিটি করপোরেশনের বিভাজন কিংবা রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদল হলেও মশা নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে যুক্ত সেই চক্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আসেনি।
তিনি বলেছেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে মৌসুমি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। একটানা অন্তত পাঁচ বছর কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে কমিউনিটিভিত্তিক উদ্যোগ জোরদার এবং প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবকদের কাজে যুক্ত করতে হবে।
মঙ্গলবার বিকালে রাজধানীর ব্র্যাক টাওয়ারে ‘ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত উদ্যোগ’ শীর্ষক জনস্বাস্থ্য সংলাপে এসব কথা বলেন অধ্যাপক কবিরুল বাশার। বাংলাদেশ হেলথ ওয়াচ ও ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডের (ইউপিএল) যৌথ আয়োজনে এ সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়।
অধ্যাপক কবিরুল বাশার ২৭ বছর ধরে মশা নিয়ে গবেষণা করছেন। ২০০০ সালে দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপের পর তিনি এ বিষয়ে কাজ শুরু করেন। এখনো তার গবেষণা অব্যাহত রয়েছে।
তিনি উল্লেখ করেন, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা কমানো যাচ্ছে না। বাংলাদেশ ছাড়া অন্য কোনো দেশে ডেঙ্গুতে এত মানুষের মৃত্যুর খবর নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
মশা নিয়ন্ত্রণে প্রমাণভিত্তিক লক্ষ্য নির্ধারণ এবং স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সমাধানের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
সংলাপে অধ্যাপক কবিরুল বাশারের লেখা ‘ডেঙ্গু প্রতিরোধ নির্দেশিকা’ বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠিত হয়। বইটি সাধারণ মানুষের জন্য লেখা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, দেশের প্রতিটি ঘরে বইটির একটি করে কপি থাকা উচিত। বইটি পড়ে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হলে ডেঙ্গুর প্রকোপ কমানো সম্ভব।
সংলাপে বিশেষজ্ঞরা জানান, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণকে নির্দিষ্ট একটি মৌসুমের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে অন্তত পাঁচ বছর ধারাবাহিকভাবে কার্যক্রম চালাতে হবে। ডেঙ্গুর প্রজনন ও বিস্তার রোধে প্রান্তিক পর্যায়ে কমিউনিটিভিত্তিক এবং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কাজ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাসেবকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে স্বাস্থ্যকর্মী ও সিটি করপোরেশনের কর্মীদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজে যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেন তারা।
এ প্রসঙ্গে কলকাতার উদাহরণ তুলে ধরে বক্তারা বলেন, এ ধরনের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে কলকাতা ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সাফল্য পেয়েছে।
বাংলাদেশের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন বলেন, প্রান্তিক পর্যায়ের একজন মানুষ অনেক সময় গ্রাম থেকে শহরে চিকিৎসা নিতে যেতে পারেন না। প্রাথমিক পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা না পাওয়ায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত অনেকেই দ্রুত চিকিৎসা নিতে পারেন না।
তার মতে, কমিউনিটিভিত্তিক জ্বরের রোগীদের শনাক্ত করে সরকারের পক্ষ থেকে ডেঙ্গুর চিকিৎসা সেবা আরও বিস্তৃত করতে হবে।
ফ্যামিলি মেডিসিন ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ লেলিন চৌধুরী মন্তব্য করেন, সরকারের পক্ষ থেকে অনেক সময় বেশি প্রদর্শনবাদী কার্যক্রম নেওয়া হয়। ডেঙ্গুতে মৃত্যুর যে হিসাব প্রকাশ করা হয়, প্রকৃত সংখ্যা তার চেয়ে বেশি হতে পারে। সরকারি প্রতিবেদনে আক্রান্ত ও মৃত্যুর একটি অংশই উঠে আসে। বেসরকারি হাসপাতালের অনেক তথ্যও এতে অন্তর্ভুক্ত হয় না বলে দাবি করেন তিনি।
প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি শিশির মোড়ল উল্লেখ করেন, বইটিতে সরকার ও নাগরিকদের করণীয় তুলে ধরা হলেও জনস্বাস্থ্যবিদদের করণীয় আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়নি। তিনি বলেন, ২০১৭ সালে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া নিয়ন্ত্রণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দেওয়া নির্দেশনাগুলো বাংলায় অনুবাদ করে সেগুলো অনুসরণ করলেও এ সমস্যা মোকাবিলায় কার্যকর অগ্রগতি সম্ভব ছিল।
গুলশান সোসাইটির সভাপতি ব্যারিস্টার ওমর সাদাত মন্তব্য করেন, আগের সব সরকার মশার কাছে পরাজিত হয়েছে। বর্তমান সরকারও পরাজয়ের দিকে যাচ্ছে। সরকারের আন্তরিক উদ্যোগ থাকলে মশা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। তার মতে, বাংলাদেশে মশা শুধু নিয়ন্ত্রণের সমস্যা নয়, এটি সুশাসনেরও সমস্যা।
ইউপিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহ্রুখ মহিউদ্দীন শুভেচ্ছা বক্তব্যে বলেন, ইউপিএল সাধারণত শিক্ষা ও গবেষণামূলক বই প্রকাশ করে। সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির অংশ হিসেবে ‘ডেঙ্গু প্রতিরোধ নির্দেশিকা’ প্রকাশ করা হয়েছে।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বাংলাদেশ হেলথ ওয়াচের উপদেষ্টা ইয়াসমিন আহমেদ। সংলাপের সভাপতির বক্তব্যে বাংলাদেশ হেলথ ওয়াচের আহ্বায়ক আহমেদ মোশতাক রাজা চৌধুরী উল্লেখ করেন, একসময় ডেঙ্গুকে শুধু শহরের সমস্যা মনে করা হতো। এখন এটি জাতীয় সমস্যায় পরিণত হয়েছে। এ পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার কথা ছিল না। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সমস্যা চিহ্নিত করে সারা বছর কাজ করতে হবে।
এদিকে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে আরও সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছরে দেশে ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬৪ জনে। মৃতদের মধ্যে ৮৬ জন নারী।
একই সময়ে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৫৯৩ জন। এ নিয়ে চলতি বছরে মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৫ হাজার ১৬৩ জনে। আক্রান্তের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি ঢাকা বিভাগে। খুলনা, চট্টগ্রাম ও ময়মনসিংহ বিভাগেও ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। আক্রান্তদের মধ্যে তরুণ ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বেশি।



