এক শিশুর মৃত্যুতে বিল মওকুফের ‘সান্ত্বনা’, আরেকজনকে স্থানান্তর

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
রাজধানীর পান্থপথের প্লাটিনাম হাসপাতালে দায়িত্বে অবহেলার কারণে তিন দিন বয়সী এক শিশুর মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। অন্যদিকে অবস্থার অবনতি ঘটায় ৫ মাস বয়সী আরেকজন হামের শিশুকে পাঠানো হয়েছে অন্য হাসপাতালে।
এ ঘটনায় হাসপাতালের দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক ও নার্সদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো। ঘটনা দুটি যথাক্রমে গত ২৯ ও ৩১ জুলাইয়ের। তবে স্বজনদের অভিযোগ, সংকটের মুহূর্তে ছিল না হাসপাতাল প্রশাসনের কেউই।
সংশ্লিষ্টরা জানান, এ ঘটনায় শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. এম এম ইউসুফসহ সাগরিকা এবং শম্পা নামের দুই নার্সকে মৌখিকভাবে বহিষ্কার করেন হাসপাতালের প্রধান নির্বাহী অফিসার (সিইও)। তবে এক দিন পরেই হাসপাতালে ফিরেছেন ডা. ইউসুফ।
মারা যাওয়া তিন দিন বয়সী শিশুটির পিতা অপু বিশ্বাস আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘সকালেও আমার সন্তানকে হাত-পা ছুড়তে দেখেছি। রক্ত নেওয়ার সময় নার্স অক্সিজেনের মাস্ক খুলে ফেলেন। আমি বলা সত্ত্বেও মাস্কটি লাগানো হয়নি। ভর্তির পর গত তিন দিন ডাক্তার বলছিলেন, আপনার সন্তান দ্রুত ইমপ্রুভ করছে। কিন্তু আজ সকালে যখন সন্তান মারা গেল, তখন বহু চেষ্টা করেও ডা. ইউসুফ বা হাসপাতালের সিইও কাউকেই পাওয়া যায়নি।’
তিনি অভিযোগ করেন, ‘মৃত্যুর ৭ ঘণ্টা পর হাসপাতালের সিইও এসে বিল মওকুফের কথা বলেন। কিন্তু আমি তো আমার সন্তানকে আর ফিরে পাব না।’ আক্ষেপ করে বলছিলেন, রোগীর অবস্থা বিবেচনা না করে দায়িত্বরত চিকিৎসক ও নার্সদের গাফিলতির কারণেই সন্তানহারা হলাম।
অপু বিশ্বাসের মতোই আরেক অভিভাবক পূর্ণিমা। তার সন্তান ফাহমিদের বয়স ৫ মাস। তাকে নিয়েও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ একই ধরনের কথা জানায়। তিনি বলছিলেন, ‘ডাক্তার কেবল সকালে আর রাতে কয়েক মিনিটের জন্য আসেন। আমাকে গত ৮ দিন ধরে ‘সন্তান খুব ভালো আছে’ বলে আশ্বাস দিচ্ছিলেন। ২৯ জুলাই দুপুরে জানতে পারলাম আমার ছেলেকে নাকি লাইফ সাপোর্টে নিতে হবে।’
তিনি অভিযোগ করেন, ‘ডা. ইউসুফ সকাল থেকে ফোনে নির্দেশনা দিয়ে চিকিৎসা চালাচ্ছিলেন। হাসপাতাল-সংশ্লিষ্টদের কাছে জানতে চাইলে বলা হয়, তিনি তখন শিশু হাসপাতালে ডিউটি করছিলেন। আসবেন সন্ধ্যায়।’
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
এ ঘটনার পর সন্ধ্যা ৬টার দিকে হাজির হন হাসপাতালের সিইও ডা. সুলতানা তাসনিম ও ম্যানেজার আরিফ মুন্সি ওয়াসিম। তারা জানান, মৃত শিশুটির বিল মওকুফ করা হবে। অন্য হাসপাতালে পাঠানো হবে ফাহমিদকে।
লাইফ সাপোর্টে থাকা শিশুকে অন্য হাসপাতালে স্থানান্তর কতটা বাস্তবসম্মত— এ প্রশ্নে ডা. সুলতানা তাসনিম স্বীকার করেন, ‘আমাদের এনআইসিইউ বিভাগের গাফিলতির কারণে সেটি বন্ধ ঘোষণা করেছি। তাই শিশুটিকে রেফার্ড করা হচ্ছে।’
দায়িত্বরত চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে কোনো আইনিব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না জানতে চাইলে তিনি বলছিলেন, ‘আমরা তো মৃত সন্তান ফিরিয়ে দিতে পারব না। চিকিৎসককে চাকরি থেকে অব্যাহতি দিয়েছি। কর্তৃপক্ষ কোনো আইনি প্রক্রিয়ায় যাবে না।’
এ বিষয়ে শিশু বিশেষজ্ঞ ড. এম এম ইউসুফের কাছে জানতে চাইলে তিনি দাবি করেন, ‘শিশুটি প্রসবের সময় মাথায় আঘাত পেয়েছিল। তার অবস্থা শুরু থেকেই আশঙ্কাজনক ছিল।’
নিহত শিশুর পিতা অপু বিশ্বাসের ভাষ্য, ‘প্রধান নির্বাহী বা ম্যানেজার কেউই হাসপাতালে নিয়মিত থাকেন না। অনেকবার ফোন করেও তাদের পাইনি। সন্তানের মৃত্যুর পর তারা মিটিং ডেকেছেন।’
অপরদিকে শিশু ফাহমিদকে ট্রান্সফারের বিষয়ে প্রশাসনিক কর্মকর্তা আরিফ মুন্সি ওয়াসিম বলছিলেন, ‘জন্ম-মৃত্যু সৃষ্টিকর্তার হাতে। আমরা ট্রান্সফার করার আগে বিল প্রায় ১ লাখ টাকা কম নিয়েছি।’
এদিকে ২৯ জুলাই প্রথম শিশুটির মৃত্যুর পর হাসপাতালের সিইও মৌখিকভাবে ডা. ইউসুফ এবং দুই নার্সকে বহিষ্কার করলেও লাইফ সাপোর্টে থাকা শিশু ফাহমিদের পরিবার জানায়, পরদিন বিকালে রোগী দেখতে হাসপাতালে এসেছিলেন এই শিশু বিশেষজ্ঞ।
এ বিষয়ে ম্যানেজার আরিফ মুন্সির কাছে জানতে চাইলে তিনি বলছিলেন, ‘ডা. ইউসুফের তত্ত্বাবধানে আরও প্রায় ৫ জন রোগী ছিল। তাদের দেখভাল করা তার দায়িত্ব। তাই হাসপাতালে এসেছিলেন।’
ফোনে নির্দেশনা দেওয়ার অভিযোগ নিয়ে তিনি জানান, ‘একজন কনসালট্যান্ট তো আর সবসময় হাসপাতালে থাকতে পারবেন না। তাই হয়তো জরুরি প্রয়োজনে ফোনের মাধ্যমে চিকিৎসা দিয়েছেন।’






