দেশে শুরু হচ্ছে ডেঙ্গু টিকার ট্রায়াল
- ট্রায়ালে সফল হলে শিগগিরই দেশের বাজারে ডেঙ্গুর টিকা
- প্রোডেঙ্গার সঙ্গে ব্রাজিলের বুটানটার তুলনামূলক ট্রায়াল শুরু করছে আইসিডিডিআর,বি
- ঢাকার তিনটি স্থানে ৩ হাজার মানুষের ওপর চলবে পরীক্ষা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দেশে ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে ওঠা ডেঙ্গু রোগ নিয়ন্ত্রণে আশার আলো দেখাচ্ছে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি)। ‘প্রোডেঙ্গা’ নামে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ডেঙ্গুর টিকার পরীক্ষা শুরু করছে তারা। আইসিডিডিআর,বির বিজ্ঞানীরা বলছেন, এটি বাজারে আসতে কয়েক মাস থেকে এক বছরও লাগতে পারে।
একই উপাদানে ব্রাজিলে তৈরি টিকা গত বছর থেকে তাদের জাতীয় টিকা কর্মসূচিতে ব্যবহৃত হচ্ছে। সেখানে ডেঙ্গু প্রতিরোধে কার্যকারিতার প্রমাণও মিলেছে। পাঁচ দিন আগে গত ২১ জুলাই ভারতেও প্রথমবারের মতো অনুমোদন পেয়েছে ডেঙ্গু টিকা।
যুক্তরাষ্ট্রের চিকিৎসা গবেষণা সংস্থা ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথের (এনআইএইচ) উদ্ভাবিত টিকা তৈরির লাইসেন্স পেয়েছে দেশীয় ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস। এনআইএইচ এরই মধ্যে তাদের প্রযুক্তি হস্তান্তর করেছে। এতে সহায়তা করছে আইসিডিডিআর,বি। টিকাটির কার্যকারিতা দেশে প্রমাণিত হলে তা জরুরি ভিত্তিতে ব্যবহারের অনুমোদন দেওয়ার দাবি জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের।
ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল মুক্তাদির বললেন, ‘টিকা উৎপাদনের সব প্রস্তুতি আমরা শেষ করেছি। ট্রায়ালে সফলতা মিললে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর যদি জরুরি ভিত্তিতে অনুমোদন দেয়, তাহলে খুব দ্রুতই টিকাটি বাজারে আনতে পারব। এটি একটি প্রাণরক্ষাকারী টিকা। আমরা সুলভ মূল্যে এটি বাজারে আনতে চাই। যাতে সব শ্রেণির মানুষ ব্যবহার করতে পারেন।’
এই টিকা নিরাপদ প্রমাণ হলে সময়ক্ষেপণ না করে জরুরি ব্যবহারের অনুমোদন দেওয়া উচিত, মনে করেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মুশতাক হোসেন।
গতকাল রবিবার পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১৩ হাজার ৯৮ এবং মৃত্যু হয়েছে ৪৩ জনের। ২০২৩ সালে সর্বোচ্চ ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন আক্রান্ত হয়েছিলেন, মৃত্যু হয়েছিল ১ হাজার ৭০৫ জনের। গত বছরও হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ১ লাখ ২ হাজার ৬১ জন, মৃত্যু হয়েছিল ৪১৩ জনের। কয়েক বছর পরপর বাংলাদেশে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। প্রোডেঙ্গা মূলত এনআইএইচের তৈরি ‘টিভি ০০৩’ টিকা প্রযুক্তির বাংলাদেশি সংস্করণ। একই প্রযুক্তির ভিত্তিতে ব্রাজিলে তৈরি হয়েছে ‘বুটানটান-ডিভি’ টিকা। এই টিকা ব্রাজিলে কার্যকর প্রমাণ হওয়ার পর ২০২৫ সালের ১১ নভেম্বর সেদেশের জনগণের ব্যবহারের জন্য অনুমোদন দেয় তাদের স্বাস্থ্য বিভাগ। বর্তমানে চলমান ট্রায়ালে বুটানটান-ডিভির বিপরীতে প্রোডেঙ্গার একক ডোজের নন-ইনফিরিওরিটি (অর্থাৎ প্রতিষ্ঠিত টিকার তুলনায় কমপক্ষে সমান কার্যকারিতা প্রমাণের) পরীক্ষা চলছে।
৮ জুলাই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে ‘মশা নিয়ন্ত্রণবিষয়ক প্রযুক্তি শোকেজিং’বিষয়ক আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা হয়। সেখানে আইসিডিডিআর,বির জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী ড. মোহাম্মদ শফিউল আলম জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এনআইএইচ উদ্ভাবিত ডেঙ্গু টিকার নন-ইনফিরিওরিটি ট্রায়ালের ওপর গবেষণা কার্যক্রম চলছে। ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস এই টিকা উৎপাদনের লাইসেন্স পেয়েছে। ব্রাজিলের বুটানটান-ডিভি ডেঙ্গু টিকার সঙ্গে এনআইএইচ উৎপাদিত ডেঙ্গু টিকার তুলনামূলক গবেষণার কাজ শুরু হয়েছে। আইসিডিডিআর,বি ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালসকে সহায়তা করছে। চলতি বছরের ১৫ থেকে ১৭ জুন সিঙ্গাপুরের অর্চার্ড হোটেলে অনুষ্ঠিত নবম এশিয়া ডেঙ্গু সামিট অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে আইসিডিডিআর,বির সংক্রমণ রোগ বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী ড. মোহাম্মদ শফিউল আলম, ফাহিমা চৌধুরী, মোহাম্মদ তৌফিকুর রহমান ভূঁইয়া, সাজিয়া আফরিন, ড. রাশিদুল হক ও বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ড. ফেরদৌসী কাদরী গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেন। যার প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ঢাকায় ৩ হাজার ২২২ জন স্বেচ্ছাসেবী নিয়ে এই ডাবল-ব্লাইন্ড (টিকাগ্রহীতা ও টিকা প্রয়োগ করা ব্যক্তি জানবেন না কোন টিকাটি প্রয়োগ করা হয়েছে), র্যান্ডমাইজড ট্রায়াল চালানো হবে। যেখানে প্রাপ্তবয়স্ক (১৮-৫৯ বছর), কিশোর-কিশোরী (৭-১৭ বছর) ও শিশুদের (২-৬ বছর) আলাদা দলে ভাগ করে ২৮তম দিনে ডেঙ্গুর দুই (ডেন ভি-২) ও তিন নম্বর (ডেন ভি-৩) ধরনের বিরুদ্ধে টিকার কার্যকারিতা এবং নিরাপত্তা যাচাই করা হবে। কারণ বর্তমানে ডেনভি-৩ সবচেয়ে বেশি সক্রিয় বাংলাদেশে।
সামিটে গবেষকরা জানিয়েছেন, ব্রাজিলের বুটানটান ইনস্টিটিউটের টিকাটি যুক্তরাষ্ট্রের এনআইএইচ উদ্ভাবিত টিভি-০০৩ প্রযুক্তির ভিত্তিতে তৈরি এবং একই প্রযুক্তির লাইসেন্স নিয়ে বাংলাদেশে টিভি-০০৩ তৈরি করেছে ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস, যা প্রোডেঙ্গা নামে বাজারজাত করা হবে। বাংলাদেশে টিকাটির লাইসেন্স ও নীতিগত গ্রহণযোগ্যতার জন্য দেশভিত্তিক এই প্রমাণ অপরিহার্য বলে মনে করছেন তারা।
এই প্রসঙ্গে আইসিডিডিআর,বির জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী ড. মোহাম্মদ শফিউল আলম বললেন, ‘এই ট্রায়ালটি সরাসরি ডেঙ্গু রোগ প্রতিরোধের ক্লিনিক্যাল কার্যকারিতা প্রমাণের জন্য করা হচ্ছে না। বরং এর মূল উদ্দেশ্য হলো— ব্রাজিলের বুটানটান-ডিভির তুলনায় প্রোডেঙ্গা শরীরে সমান বা কাছাকাছি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা অ্যান্টিবডি তৈরি করতে পারে কি না— তা পরীক্ষা করা। এর সুরক্ষার দিকটিও যাচাই করা হবে একই সঙ্গে। এতে অংশগ্রহণকারীদের বয়স অনুযায়ী বিভিন্ন দলে ভাগ করে টিকা দেওয়া হবে। প্রতিটি বয়সভিত্তিক দলের ফল স্বাধীন ডেটা সেফটি মনিটরিং বোর্ড দিয়ে পরীক্ষা করানোর পরই শুধু তার চেয়ে কম বয়সীদের এই ট্রায়ালে যুক্ত করা হবে।’
একই পরিবারের টিকা (টিভি-০০৫, যা টিভি-০০৩-এর সামান্য পরিবর্তিত সংস্করণ) নিয়ে ঢাকায় একটি সম্পূর্ণ ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল আগেই পরিচালিত হয়েছে। যার ফল ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে আন্তর্জাতিক মেডিকেল সাময়িকী ল্যানসেট ইনফেকশাস ডিজিজেসে প্রকাশিতও হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভার্মন্ট বিশ্ববিদ্যালয়, জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়, আইসিডিডিআর,বি ও টিকার মূল উদ্ভাবক প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব অ্যালার্জি অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজেসের (এনআইএআইডি) গবেষকরা এটি পরিচালনা করেন। গবেষক দলের অন্যতম সদস্য ছিলেন টিকার প্রধান উদ্ভাবক সংস্থাটির বিজ্ঞানী ড. স্টিফেন এস হোয়াইটহেড।
২০১৬ ও ২০১৭ সালে মিরপুরে ১৯২ জন স্বেচ্ছাসেবীর ওপর তিন বছর ফলোআপ করে পরিচালিত এই গবেষণায় দেখা গেছে, এক ডোজ টিকাতেই ১ থেকে ৪৯ বছর বয়সী স্বেচ্ছাসেবীদের শরীরে ডেঙ্গুর চারটি সেরোটাইপের (ডেঙ্গুর সক্রিয় ধরন) বিরুদ্ধেই উল্লেখযোগ্য প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়েছে। টিকাটি সার্বিকভাবে নিরাপদ প্রমাণিত হয়েছে। ট্রায়ালে দেখা গেছে, টিকা দেওয়ার ১৮০ দিন পর চারটি ডেঙ্গু সেরোটাইপের বিপরীতে অত্যন্ত শক্তিশালী অ্যান্টিবডি সাড়া মিলেছে। ডেনভি-১-এ ৮৩ শতাংশ, ডেনভি-২-এ ৯৯, ডেনভি-৩-এ ৯৬ ও ডেনভি-৪-এ ৮৭ শতাংশ অ্যান্টিবডি সাড়া মিলেছে। এ ছাড়া ৯৬ শতাংশ টিকা নেওয়া ব্যক্তিদের দেহে অন্তত তিন ধরনের বিরুদ্ধে সুরক্ষা তৈরি হয়েছে। ৭১ শতাংশের চারটি ধরনের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে। এদিকে এনআইএইচ যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি জনস্বাস্থ্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান। তারা গবেষণা করে টিকা উদ্ভাবন করলেও নিজেরা তা উৎপাদন করে না। এজন্য বিশ্বের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে ডেঙ্গুর টিকা উৎপাদনের লাইসেন্স বিক্রি করে। আইসিডিডিআর,বির মধ্যস্থতায় বাংলাদেশে এই লাইসেন্স পেয়েছে ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস। যাদের এনআইএইচ সরাসরি প্রযুক্তি হস্তান্তর করেছে। মূল উপাদান (সিড) থেকে সম্পূর্ণ দেশীয়ভাবে টিকাটি উৎপাদন করছে ইনসেপ্টা। ট্রায়ালের জন্য প্রয়োজনীয় টিকা তৈরিও হয়ে গেছে। তুলনামূলক পরীক্ষায় টিকাটি কার্যকর ও নিরাপদ প্রমাণিত হলে অনুমোদনের জন্য ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরে আবেদন করবে প্রতিষ্ঠানটি।
ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) মোহাম্মদ নাঈম গোলদার আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘আইসিডিডিআর,বি ডেঙ্গুর টিকা ট্রায়ালের একটা প্রটোকল জমা দিয়েছে, ট্রায়াল করার অনুমতি দিয়েছে অধিদপ্তর। ট্রায়ালের ফলের ভিত্তিতে টিকার অনুমোদন পাবে কি পাবে না, অধিদপ্তর সে সিদ্ধান্ত নেবে।’




