চিকিৎসা শুরু করতেই দেরি, ঝুঁকি বাড়ছে
- যত দ্রুত চিকিৎসা তত বিপদ কম
- গ্যাস বা বদহজম মনে করে অপেক্ষা
- টাকা ও যাতায়াত ব্যবস্থাপনায়ও বিলম্ব
- চিকিৎসা মূলত ঢাকাকেন্দ্রিক

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
আনোয়ার হোসেন (৫৪) গত রবিবার রাত ১০টার পর থেকেই বুকের ব্যথায় ভুগছিলেন। এ সময় বারবার বমিও হয় তার। পরিবারের লোকজন হাসপাতালে নিতে চাইলে গ্যাস্ট্রিকের ব্যথা ভেবে রাজি হননি তিনি। পরে ব্যথা অসহনীয় হলে রাত ৩টার দিকে নরসিংদী সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিকভাবে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দিয়ে পাঠানো হয় ঢাকায়। এরপর বাসে ঢাকায় এসে মিরপুরের হার্ট ফাউন্ডেশনে চিকিৎসা শুরু করতে দুপুর হয়ে যায়।
এ ঘটনা শুধু আনোয়ার হোসেনের নয়, হার্ট অ্যাটাকের পর বেশিরভাগ রোগীর ক্ষেত্রেই এমনটি ঘটে থাকে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, হার্ট অ্যাটাকের পর যত দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা যায়, হৃদপেশির ক্ষতি তত কমানোর সুযোগ থাকে। কিন্তু বাংলাদেশে অনেক রোগীর ক্ষেত্রে চিকিৎসা শুরু হওয়ার আগেই কয়েক ঘণ্টা চলে যায়। এমনকি অনেকে শেষ পর্যন্ত চিকিৎসার সুযোগই পায় না।
হার্ট অ্যাটাক করে মারা গেছেন— এমন কয়েকজনের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, হার্ট অ্যাটাকের উপসর্গকে গ্যাস বা বদহজম মনে করে অপেক্ষা করেছেন, কেউ স্থানীয় চিকিৎসকের কাছে গেছেন। আবার হাসপাতালের দূরত্ব ও রেফারেলের কারণেও সময় লেগে যায়।
‘উন্নয়নশীল দেশে হার্ট অ্যাটাকের রোগীদের হাসপাতালে পৌঁছাতে বিলম্ব ও এর কারণ’ শীর্ষক একটি গবেষণা পরিচালনা করে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল এবং ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট। ৩৩৩ জন হার্ট অ্যাটাকের রোগীর ওপর গবেষণা করা হয়। এতে দেখা গেছে, হার্ট অ্যাটাকের পর উপসর্গের শুরু থেকে হাসপাতালে পৌঁছাতে সময় লেগেছে ১১ দশমিক ৫ ঘণ্টা। প্রায় ৪৮ দশমিক ৯ শতাংশ রোগী ১২ ঘণ্টার বেশি সময় পর হাসপাতালে পৌঁছেছিলেন। উপসর্গ শুরু হওয়ার পর চিকিৎসা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতেই তিন ঘণ্টা সময় লেগেছে।
ইসকান্দার মির্জা (৫২) হার্ট অ্যাটাকের পর প্রথমে বাড়িতে ফার্মেসি থেকে লোক ডেকে এনে চিকিৎসা নেন। বরিশালের গৌরনদীর এই বাসিন্দার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ঢাকায় নিয়ে যেতে পরামর্শ দেওয়া হয়। তখন টাকা ও অ্যাম্বুলেন্স জোগাড় করে রওনা হয়ে মাদারীপুর পার হতেই রোগীর মৃত্যু ঘটে। অথচ ঢাকায় বসবাসরত তার ছেলে চিকিৎসার ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন।
এ বিষয়ে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল ও রিসার্চ সেন্টারের মহাসচিব ফজিলা-তুন-নেসা মালিক বলছেন, হার্টের চিকিৎসা যত দ্রুত শুরু করা যায়, রোগীর বিপদ তত কমে যায়। কিন্তু নানা কারণে হার্ট অ্যাটাকের পর বেশিরভাগ রোগী সময়মতো হাসপাতালে আসতে পারে না। হার্টের চিকিৎসা মূলত ঢাকাকেন্দ্রিক হওয়ায় এ সমস্যা আরও প্রকট হয়েছে, রোগীদের ঝুঁকি বাড়ছে।
চিকিৎসকরা বলছেন, হার্ট অ্যাটাকের চিকিৎসায় শুধু হাসপাতালে পৌঁছানো নয়, হাসপাতালে পৌঁছানোর পর দ্রুত ইসিজি, রোগ শনাক্তকরণ এবং প্রয়োজন হলে ক্যাথল্যাবে নিয়ে প্রাথমিক পিসিআই করাও গুরুত্বপূর্ণ। পিসিআইয়ের মাধ্যমে বন্ধ হয়ে যাওয়া করোনারি ধমনিতে রক্তপ্রবাহ ফিরিয়ে আনা হয়। ফলে রোগীর বাড়ি থেকে হাসপাতালে পৌঁছানো, রোগ শনাক্ত করা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা শুরু— প্রতিটি ধাপে সময় কমানো জরুরি।
দিন দিন হৃদরোগীর সংখ্যা বাড়ছে। বাড়ছে উচ্চ রক্তচাপ, সঙ্গে বাড়ছে অকালমৃত্যুর ঝুঁকি। বাংলাদেশে মোট মৃত্যুর প্রায় ৩৪ শতাংশই এখন হৃদরোগের কারণে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, দেশে দেড় কোটির বেশি মানুষ হৃদরোগে আক্রান্ত। বছরে যত মানুষ মারা যান, তাদের তিনজনের একজনের মৃত্যুর কারণ হৃদরোগ।
তবে দেশে হৃদরোগে আক্রান্ত মানুষের মোট সংখ্যা নিয়ে নিয়মিত হালনাগাদ কোনো জাতীয় হিসাব নেই। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ হেলথ অ্যান্ড মরবিডিটি স্ট্যাটাস সার্ভে ২০২৫ অনুযায়ী, দেশে প্রতি ১ হাজার মানুষের মধ্যে ৩১ দশমিক ৩২ জন হৃদরোগে আক্রান্ত। অর্থাৎ প্রতি ১০০ জনে প্রায় ৩ দশমিক ১ জন।
বিবিএসের এই জাতীয় জরিপে দেশের ৪৭ হাজার ৪০টি পরিবার থেকে ১ লাখ ৮৯ হাজার ৯৮৬ জনের তথ্য নেওয়া হয়েছে। জরিপের আগের ৯০ দিনের অসুস্থতার তথ্যের ভিত্তিতে রোগের এই হার নির্ধারণ করা হয়েছে।
ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল ও রিসার্চ সেন্টারের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, হাসপাতালটিতে ২০০৩ সালে বাইপাস সার্জারি করা হয়েছিল ৬৪৮টি। ২০২৫-এ এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৭৭৭ জনে। আর ২০০৩ সালে মোট হৃদরোগের সার্জারি হয়েছিল ৯৯৪টি। সেটা ২০২৫-এ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৯৩৯টিতে। চলতি বছর এখন পর্যন্ত বাইপাস সার্জািরর সংখ্যা ১ হাজার ৮টি। আর মোট হৃদরোগের সার্জারি হয়েছে ১ হাজার ৭১২টি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানুষ হৃদরোগের অসুখ সম্পর্কে জানে। কিন্তু জীবনযাপনে সে অনুযায়ী চলে না। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে হৃদরোগের হার বাড়ার অন্যতম কারণ স্ট্রেস, কম ঘুম, খাবারের মাধ্যমে বেশি লবণ গ্রহণ, এনার্জি ড্রিংকস গ্রহণ, শারীরিক পরিশ্রম না করা ইত্যাদি।
হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ফজিলা-তুন-নেসা মালিক বলছেন, যথাযথ চিকিৎসা ও নিয়মকানুন মেনে চললে হৃদরোগ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রতিরোধযোগ্য। তাই হৃদরোগ নিয়ে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। বিশেষ করে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি। পাশাপাশি হৃদরোগের চিকিৎসা সুবিধা সারা দেশে সহজলভ্য করা দরকার।



