লিয়াজোঁর আড়ালে ছায়া প্রশাসন হৃদরোগে
- ৩৩৭ নম্বর কক্ষে নথিপত্রহীন ‘বাংলাদেশ কার্ডিয়াক সোসাইটি’র অস্থায়ী কার্যালয়
- চিকিৎসকদের পদায়ন-বদলিতে হস্তক্ষেপ, টেন্ডার, আবাসন কমিটি এবং ‘ইউনিট’ বণ্টনে অন্যায় চাপ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
কার্ডিয়াক সোসাইটির অস্থায়ী কার্যালয়ের ফলক— ঝুলছে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে। যদিও এর অস্তিত্ব নেই নথিতে। সবাই দেখছেন। কিন্তু প্রশ্ন তুলছেন না। প্রশ্নে যদি রোষে পড়েন, সেই ভয়ে। বরং তলে তলে সুবিধা নেওয়ার তালে তারা।
অথচ হৃদরোগের অলিন্দে কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে সোসাইটির অস্থায়ী কার্যালয়ের পাওয়ার হাউজ বনে যাওয়ার গল্প। সব হয় এখান থেকেই। কোন কার্ডিওলজিস্টকে ঢাকায় আনা হবে, কাকে শাস্তি দিয়ে গ্রামে পাঠাতে হবে। অভিযোগ শুধু কি তাই? কে কোন ইউনিট নেবেন— সেটার নকশাও হয় এই অস্থায়ী কার্যালয় থেকেই। অভিযোগের তালিকা থেকে বাদ নেই কেনাকাটার টেন্ডারও।
পেশাজীবীদের সংগঠন হতেই পারে। হচ্ছেও। কিন্তু সরকারি দপ্তরে! তাও স্থায়ী কার্যালয় থেকে অস্থায়ীর ঠিকানা ‘রাস্তা পার হওয়া দূরত্বে!’ অর্থাৎ রাস্তার এপার-ওপার। মিরপুর রোডের পূর্বপাড়ে হৃদরোগ হাসপাতাল— যেখানে অস্থায়ী কার্যালয়। আর পশ্চিমপাড়ে খিলজি রোডে স্থায়ী কার্যালয়।
কী এমন প্রয়োজন পড়ল এ কার্যালয়ের? প্রয়োজন নিয়ন্ত্রণের। এমন একটা সাইনবোর্ড থাকলে সুবিধা। কেউ প্রশ্ন তোলার সাহস করে না— মত ওই হাসপাতালের চিকিৎসক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের।
ডা. আবুল ফজল খবির উদ্দিন আহমেদ ২০২৪ সালে সহযোগী অধ্যাপক (কার্ডিওলজি) পদে যোগ দেন হৃদরোগে। পরে চলতি দায়িত্বে হয়েছেন অধ্যাপক। বসতেন হাসপাতালের মধ্য ব্লকের ৩৩৭ নম্বরে। অবসরে গেছেন বছর দেড়েক আগে। তার নামে বরাদ্দ কক্ষ কর্তৃপক্ষকে বুঝিয়ে না দিয়ে রাখেন ঝুলিয়ে। নিকটজনরা বলছিলেন— খবির উদ্দিন আরও বেশি খবরদারি নিয়ে আসছেন। তিনি চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেয়ে বসবেন পরিচালক পদে। কিন্তু তা আর হয়নি। কোনো কূল করতে না পেরে ৩৩৭ নম্বরে টানানো হয় বাংলাদেশ কার্ডিয়াক সোসাইটির সাইনবোর্ড। ২০২৪ সালের ৩ ডিসেম্বর বাংলাদেশ কার্ডিয়াক সোসাইটির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য সচিব হন ডা. আবুল ফজল খবির উদ্দিন আহমেদ। এখনো তিনি এ পদে। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে ফিরতে না পেরে নিজের ব্যবহৃত রুমটিকে বানান অ্যাসোসিয়েশনের কার্যালয়।
হাসপাতালে চিকিৎসকদের বসার রুম দরকারের তুলনায় কম। এক রুমে বসতে বাধ্য হন একাধিক চিকিৎসক। এ অবস্থায় সোসাইটির রুম নিয়ে চিকিৎসকদের মধ্যে রয়েছে অসন্তোষ।
বিষয়টি নিয়ে আগামীর সময় কথা বলে হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক ডা. আব্দুল ওয়াদুদ চৌধুরীর সঙ্গে। গত মঙ্গলবার তিনি ফোনে কথা বলতে আপত্তি জানিয়েছেন। পরদিন বুধবার সকালে এই প্রতিবেদক হাসপাতালে পৌঁছে জানতে পারেন, জরুরি প্রয়োজনে তিনি রাজশাহী। বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১০টায় উপস্থিত থাকার কথা হয় পরিচালকের দপ্তরসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে। ঠিক সময়ে উপস্থিত হয়ে দেখা গেল, পরিচালক তার দপ্তরে না বসে বসেছেন সম্মেলন কেন্দ্রে। দর্শনার্থী ভিড় এড়াতে সেখানে সারছেন দাপ্তরিক কাজ ও মিটিং। সম্মেলন কেন্দ্রে উপস্থিত হলে পরিচালক আরও খানিকটা অপেক্ষার অনুরোধ জানালেন। দুপুর ১টার দিকে তিনি উপস্থিত হন দপ্তরে। সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে যায় দর্শনার্থী উপস্থিতি। জনবল নিয়োগ নিয়ে কথা বলতে কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর সঙ্গে ছিলেন বাইরের লোকজনও। পরিস্থিতি সামাল দিতে সেখানে অবস্থান নেন ১০ আনসার সদস্য।
বেলা ৩টায় বের হয়ে যাওয়ার সময়ও পরিচালক তাদের দিয়ে বেষ্টিত। এরকম পরিস্থিতিতেই জানতে চাওয়া হয় পরিচালকের আশপাশে এত লোকজন কেন? জবাবে স্মিত হাসেন পরিচালক। স্পষ্ট ইঙ্গিত এড়িয়ে যাওয়ার।
অন্য একদিন কথা বলতে চাইলেন পরিচালক। কিন্তু দুদিন ঘুরে এবং দীর্ঘ অপেক্ষার পর পাওয়া গেছে তাকে। আবার কবে পাওয়া যাবে, তার নেই ঠিক। জানতে চাওয়া হয়— হাসপাতালে কেন কার্ডিয়াক সোসাইটির কার্যালয়। জবাবে ডা. আব্দুল ওয়াদুদ চৌধুরী বললেন, ‘এটি আমাদেরই সংগঠন। লিয়াজোঁ অফিস হিসেবে কাজ করে।’
সংগঠনটিকে অফিসিয়ালি রুম বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে কি না— প্রশ্নে অকপট পরিচালক, ‘না, অনুমোদন নেই।’ লিয়াজোঁর নামে কার্ডিয়াক সোসাইটির অস্থায়ী কার্যালয় থেকে হাসপাতালের কাজে হস্তক্ষেপ বা ছায়া প্রশাসন চালানোর অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে পরিচালকের অবস্থান জানতে চাইলে তিনি পরামর্শ দিলেন অন্য আরেক দিন কথা বলার।
ঢাকায় চিকিৎসকদের নানা ধরনের সংগঠন রয়েছে। সোসাইটি অব মেডিসিন বাংলাদেশ, সোসাইটি অব সার্জনস, অপথ্যালমোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশ (বাংলাদেশ চক্ষুবিজ্ঞান সমিতি), অবস্টেট্রিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশ (বাংলাদেশ প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ সমিতি), অ্যাসোসিয়েশন অব ইউরোলজিক্যাল সার্জনস (ইউরোলজিক্যাল সার্জন সমিতি), অর্থোপেডিক সোসাইটি, সোসাইটি অব ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন। খাতসংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের সংগঠন হলেও কোনোটিরই কার্যালয় সরকারি হাসপাতালে না। সরেজমিন ঢাকার বিভিন্ন সরকারি হাসপাতাল ঘুরে হৃদরোগ হাসপাতালের মতো কক্ষ দখল করে চিকিৎসক পেশাজীবীদের সংগঠন খুঁজে পাওয়া যায়নি।
কীভাবে সংগঠনের কার্যালয় ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহার হয়— তার একটি নমুনা পাওয়া যায় ডা. জাফরিন জাহানের পদায়নে। খুব বেশিদিন আগে নয়, বর্তমান সরকারের আমলেই সহযোগী অধ্যাপক থেকে অধ্যাপক (কার্ডিওলজি) পদে পদোন্নতি পান এ চিকিৎসক। ডা. জাফরিনকে হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে পদায়ন করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। আদেশ জারির পর ব্যানার তৈরি করে বাধা দেওয়া হয় যোগদানে। সেই ব্যানারে জাফরিনকে তকমা দেওয়া হয় ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তার ছবি বিকৃত করে বানানো হয় ব্যানার— এমনটাই অভিযোগ। অথচ ‘শক্ত’ সুপারিশে ডা. জাফরিনকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় পদায়ন করেছে হৃদরোগ হাসপাতালে। ব্যানার তৈরি, টানানো— সবকিছুরই পরিকল্পনা ওই পাওয়ার হাউজ থেকে— এমনটাই অভিযোগ। শুধু জাফরিন নন, আরও অনেকের পদায়ন-বদলি ঠেকিয়ে দেওয়া হয় এভাবে। কাজে যোগ দিতে না পারলেও ডা. জাফরিন জাহান আছেন হৃদরোগেই। কাজ করছেন না, কিছু লোকের বিরোধিতায়। অথচ সাধারণ মানুষের করের টাকায় তিনি এরিয়ার হিসেবে তুলে নেবেন বেতন-ভাতা।
জাফরিন জাহানের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হয়েছিল। কিন্তু তিনি কোনো কথা বলতে রাজি হননি সরকারি চাকরির আচরণবিধির দোহাই দিয়ে।
জাফরিন জাহানকে কেন অন্য কোথাও বদলি করা হয়নি— এ প্রশ্নে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানালেন, তাকে করা হতে পারে হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে। যদিও তার সামনে আরও বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক বাধা হিসেবে রয়েছেন বলে জানিয়েছেন ওই কর্মকর্তা।
হৃদরোগ হাসপাতালের উল্টো পাশে খিলজি রোডে বাংলাদেশ কার্ডিয়াক সোসাইটির স্থায়ী অফিস। সেখানে না বসে অবসরপ্রাপ্ত কিছু চিকিৎসক কেন হাসপাতালের সোসাইটির রুমে বসেন— এমন প্রশ্নের জবাবে একাধিক চিকিৎসক এবং কর্মকর্তার অভিযোগ, মূলত হাসপাতালে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ বা আধিপত্য বিস্তার করতেই এ কক্ষটি ব্যবহার করা হয়। একটা গ্রুপ হাসপাতালে চালু করেছে সমান্তরাল প্রশাসন। তাদের ভাবাদর্শের (একই তরিকা) না হলে তারা চিকিৎসকদের যোগ দেওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ান। হাসপাতালে বিভিন্ন চিকিৎসকের নেতৃত্বে ইউনিট দেওয়া হয়। কে কোন ইউনিটের দায়িত্ব পাবেন, তাতেও হস্তক্ষেপের অভিযোগ সোসাইটির কার্যালয়ের দিকে। গত ১৬ জুলাই এমনই একটি ঘটনা ঘটে হৃদরোগ হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. আব্দুল ওয়াদুদ চৌধুরীর কক্ষে। সোসাইটির নেতারা ওয়াদুদ চৌধুরীকে তাদের কার্ডিওলজি বিভাগে ইউনিট দিতে চাপ দেন। ইউনিট হচ্ছে চিকিৎসকদের মধ্যে দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া। ইউনিটপ্রধানের তদারকিতে ভর্তি হয় রোগী, চলে চিকিৎসা। এসব ইউনিটের দায়িত্ব পেতে মুখিয়ে থাকেন চিকিৎসকরা। গত ২৬ জুলাইও চিকিৎসকদের একটি সভা হয় সোসাইটি কার্যালয়ে। সেখানে ইউনিট পাওয়ার দাবি তুলতে পরিচালকের ওপর চাপ প্রয়োগের প্রস্তাব আসে সদস্য সচিবের উপস্থিতিতে।
শুধু ইউনিট নয়, প্রভাব খাটানোর অভিযোগ নানা দিকে। টেন্ডার কমিটিতে মনমতো লোক ঢোকানো, অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলে নিজের অনুসারী দেওয়া, বাসা বরাদ্দ কমিটি বা সার্ভে কমিটি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার মতো বিষয়ও রয়েছে।
বিস্তর এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাওয়া হয় অধ্যাপক ডা. আবুল ফজল খবির উদ্দিন আহমেদের কাছে। যদিও সব অভিযোগই করলেন অস্বীকার। তিনি বললেন, ‘হাসপাতালে সোসাইটির অফিস আগেও ছিল, তবে অন্য রুমে। আমি সেখানে যাই সোসাইটির সদস্য সচিব হিসেবে। ছায়া প্রশাসন চালানোর অভিযোগ ঠিক না।’
সোসাইটির আরও কিছু সদস্য হাসপাতাল প্রশাসনে প্রভাব ফেলেন বলে অভিযোগ।



