জাতীয় হৃদরোগ ও সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের ক্লিনার আছে, ক্লিন নেই!
- জাতীয় হৃদরোগ ও সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল
- লাখ টাকার সাবান স্যানিটাইজারের টেন্ডার অথচ হাসপাতালে মিলছে না হাত ধোয়ার ব্যবস্থা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
কাগজ-কলমে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর (ক্লিনার) তালিকা বেশ লম্বা। তাদের পেছনে প্রতি বছর বরাদ্দ হচ্ছে লাখ লাখ টাকার সরকারি বাজেট। কিন্তু বাস্তবে হাসপাতালের টয়লেটে পা রাখলেই মনে হয়— ক্লিনার আছে অথচ ‘ক্লিন’ নেই!
রাজধানীর জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল এবং শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সরেজমিন চিত্রে গত ১৫ অক্টোবর উঠে এসেছে সেবাগ্রহীতাদের এই চরম দুর্ভোগের কথা।
জরুরি প্রয়োজনে বাথরুমে ঢুকে বমি আসার উপক্রম হয়েছিল শাহীন হাসানের। জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে চিকিৎসার কাজে এসে তীব্র পেটের চাপে যখন টয়লেট খুঁজছিলেন, এক আনসার সদস্য তাকে নিয়ে যান টিকিট কাউন্টারের পাশের এক সরু গলিতে। কয়েক কদম হাঁটতেই নাকে এসে লাগে প্রকট দুর্গন্ধ। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ভেতরে তাকাতেই তার শরীর গুলিয়ে ওঠে।
শাহীন হাসান ক্ষোভ প্রকাশ করে বললেন, ‘হাসপাতালে এসে এমন অস্বাস্থ্যকর জায়গায় টয়লেট ব্যবহার করতে হবে, ভাবিনি। দুর্গন্ধে কয়েক মিনিট থাকা কঠিন।’
একই অভিজ্ঞতা জামালপুর থেকে আসা রশিদুল ইসলামের। পুরুষদের নির্ধারিত একটি টয়লেট এলাকায় গিয়ে তিনি দেখেন, তিনটি কক্ষের দুটিই তালাবদ্ধ। আর একমাত্র খোলা কক্ষটিতে উপচে পড়ছে নোংরা পানি। মেঝেতে জমে রয়েছে শেওলা, টিস্যু ও ময়লার স্তূপ। ড্রেন বন্ধ থাকায় পানি সরার পথ নেই।
নাক চেপে বেরিয়ে এসে রশিদুল বললেন, ‘হাসপাতালে আসছি সুস্থ হতে; কিন্তু এখানকার গন্ধে তো সুস্থ মানুষও অসুস্থ হয়ে যাবে! এখানে কি দেখার কেউ নেই?’
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে ৫০ জন ক্লিনারসহ মোট ১৩৭ জনবল নিয়োগের তথ্য রয়েছে। কিন্তু এত বিশাল লজিস্টিকস ও জনবল থাকার পরও বাথরুমগুলোর কেন এই করুণ দশা— সে প্রশ্ন তুলছেন ক্ষুব্ধ রোগী ও স্বজনরা।
বিপরীত চিত্র হাসপাতালের বাইরের আঙিনায়। সেখানে কর্মীদের দেখা গেছে পানি দিয়ে রাস্তা ধুয়ে ঝকঝকে রাখতে। অর্থাৎ বাইরেটা ঝকঝকে রেখে পরিচ্ছন্নতার একটা মহড়া থাকলেও, ভেতরে রোগী ও স্বজনদের ব্যবহৃত টয়লেট কিংবা ডাস্টবিনের জায়গায় সেই নজরদারির বিন্দুমাত্র প্রতিফলন নেই।
সোহরাওয়ার্দীতেও একই অবস্থা: ক্লিনারদের অলসতা নাকি তদারকির অভাব?
একই চিত্র পাশের শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালেও। সেখানে বহির্বিভাগের পুরুষদের চারটি টয়লেটের মধ্যে একটি দীর্ঘদিন ধরে অকেজো। বাকিগুলোর অবস্থাও ব্যবহারের সম্পূর্ণ অনুপযোগী। অথচ নথিপত্র বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এই হাসপাতালে সাবান, ব্লিচিং পাউডার, হ্যান্ডওয়াশসহ পরিচ্ছন্নতাসামগ্রী কেনাকাটায় ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকার টেন্ডার দেওয়া হয়েছে। সঙ্গে সংস্কারের দরপত্রও রয়েছে।
তাহলে কেন সাবান থাকে না? কেন সংস্কারের পরও টয়লেট ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়ে?
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক পরিচ্ছন্নতাকর্মী স্বীকার করেছেন, কর্তৃপক্ষের ঢিলেঢালা তদারকি ও উদ্যোগের অভাবই এর জন্য দায়ী। যদিও সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের ক্লিনার ইনচার্জ সুমন মিয়ার দাবি, তাদের প্রায় ৩০০টি টয়লেটের জন্য রোস্টার করে কাজ ভাগ করা থাকে। তবে তিনিও আশ্বাস ছাড়া নির্দিষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।
এই ‘নামকাওয়াস্তে’ পরিচ্ছন্নতার কারণে দেখা দিচ্ছে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ আবু জামিল ফয়সাল জানালেন, বাথরুমের এই অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ হাসপাতালে আসা মানুষদের জন্য ‘সেকেন্ডারি ইনফেকশন’ সৃষ্টি করছে। তিনি বললেন, ‘একটি ওয়ার্ডে ২০ জন রোগীর জন্য মাত্র একটি বাথরুম থাকা এমনিতেই অপ্রতুল। তার ওপর সেটি অপরিষ্কার থাকলে মাছি বা বাতাসের মাধ্যমে ডায়রিয়া, জন্ডিস, পেটব্যথা ও জ্বরের মতো পানিবাহিত রোগ ছড়ায়। ক্লিনার খাতায় না রেখে বাস্তবে কাজ সুনিশ্চিত করা এখন জরুরি।’



