চা শ্রমিকদের ভরসা খাইরুন

চা শ্রমিকদের আন্দোলনের সময় তাদের সঙ্গে কথা বলছেন খাইরুন আক্তার
অসুস্থ শ্রমিকদের হাসপাতালে নিয়ে যান, চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন চা শ্রমিক খাইরুন আক্তার। তাদের প্রয়োজনে ছুটে যান। লড়েন তাদের অধিকার আদায়ে।
হবিগঞ্জের চান্দপুর বাগানের চা শ্রমিক মজিদ মিয়া ও মলি বেগমের মেয়ে খাইরুনের এই সংগ্রাম ১৩ বছরের। নিজে বাগানে কাজ করেও চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছেন দুই শতাধিক শ্রমিকের।
ওই বাগানের চা শ্রমিক মালতী ঝরা বললেন, ‘সম্প্রতি আমার মেয়ের প্রসবব্যথা উঠলে বাগানের হাসপাতালে নিয়ে যাই। ডাক্তার বললেন, উপজেলা হাসপাতালে নিতে হবে। কিন্তু গাড়িভাড়া ছিল না। খাইরুনই সব ব্যবস্থা করে প্রথমে উপজেলা, পরে জেলা হাসপাতালে নিয়ে যান। রাতে বাচ্চা হওয়ার পর সারারাত হাসপাতালে ছিলেন। পরদিন আমাদের সবাইকে নিয়ে বাগানে ফেরেন।’
খাইরুনের সেবা পেয়েছেন চা শ্রমিক কীরণ সাঁওতাল, বাসন্তী ঝরা, সন্ধ্যা ভূমিজ, পার্বতী নায়েক ও আশা গোয়ালা। আগামীর সময়কে তারা জানিয়েছেন, বাগানে কাজ না করলে হাজিরা কাটা যায়। কেউ অসুস্থ হলে খাইরুন নিজের মজুরি কাটা দিয়ে তাকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নিয়ে যান, নিজের রোজগারের কথা ভাবেন না।
খাইরুনের বড় দুই বোনের বিয়ে হয়েছে বাগানেই। ছোট ভাই ঢাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। বাবা মারা গেছেন। বর্তমানে মায়ের সঙ্গে থাকেন খাইরুন।
২০১৩ সালে ১৭ বছর বয়সে স্থানীয় উচ্চবিদ্যালয়ের দশম শ্রেণিতে পড়তেন তিনি। তখনই বাগানে শ্রমিকের কাজ নেন। শ্রমিকদের বঞ্চনা তাকে নাড়া দিত। সেই বোধই টেনে আনে অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে। তবে অভাবের কারণে নিজের পড়াশোনা আর এগিয়ে নিতে পারেননি।
খাইরুন আক্তার কিশোর বয়স থেকেই চা শ্রমিকদের বৈষম্য ও বঞ্চনার শিকার হতে দেখেছেন কাছ থেকে। ধীরে ধীরে শ্রমিকদের পাশে দাঁড়ানোর পরিধি বাড়তে থাকে তার। এখন জেলার ২৪টি চা বাগানের কোথাও শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দিলে ছুটে যান ঘটনাস্থলে। ন্যায়-অন্যায় যাচাই করে কথা বলেন মালিকপক্ষের সঙ্গে।
কিশোর বয়সের স্মৃতিচারণ করে খাইরুন আক্তার বলেছেন, ‘দেখতাম, চা শ্রমিকদের কালো চেহারা নিয়েও সমাজে বিদ্রুপ করা হতো। আমার মনে হতো, এতে তো শ্রমিকদের কোনো দোষ নেই। চেহারা তো ঈশ্বর দিয়েছেন।’ এসব দেখে নীরবে কাঁদতেন তিনি।
খাইরুন জানালেন, এ পর্যন্ত অসংখ্য মানুষকে হাসপাতালে নিয়ে গেছেন। নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী তাদের টাকা দিয়েছেন। গুরুতর অসুস্থ অন্তত ২০০ জনকে মুমূর্ষু অবস্থায় হাসপাতালে নিয়েছেন।
খাইরুন বলছিলেন, বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে অংশ নিতে গিয়ে সমাজের অনেক ভালো মানুষের সঙ্গে তার পরিচয় হয়েছে। তাদের মাধ্যমে শ্রমিকদের সহযোগিতা করার চেষ্টা করেন। করোনা মহামারীর সময় আশপাশের পরিবারগুলোর জন্য খাবারের ব্যবস্থাও করেছিলেন তিনি।
২০২৪ সালের জুনে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন খাইরুন। তবে অল্প সময়ের মধ্যেই সরকার পরিবর্তনের পর দেশের অন্য ভাইস চেয়ারম্যানদের সঙ্গে তাকেও অপসারণ করা হয়।
চান্দপুর চা বাগানের ব্যবস্থাপক মো. আবুল কালাম বললেন, ‘খাইরুন আক্তারের ভালো কাজের জন্য আমরা তাকে পছন্দ করি। সাধারণ শ্রমিক হয়েও তিনি শ্রমিকদের জন্য কাজ করেন। সুখে-দুঃখে পাশে থাকেন। বাগানের সবাই যদি এভাবে একে অন্যের প্রয়োজনে পাশে দাঁড়ান, তাহলে চা শ্রমিকরাও সমাজের অন্যদের মতো স্বাভাবিক জীবন গড়ে তুলতে পারবেন। বাগান ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ সবসময় খাইরুন আক্তারের মতো সেবকের পাশে থাকবে।’
হবিগঞ্জ জেলা ইউপি চেয়ারম্যান সমিতির সাবেক সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলী মমিনের ভাষ্য, ‘খাইরুন আক্তার সমাজের নিপীড়িত মানুষের ভরসা। খাইরুন যেমন চা শ্রমিকদের ভালোবাসেন, চা শ্রমিকরাও তাকে ভালোবাসেন।’



