৯০ দ্রাঘিমা
দিনলিপি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমি মহাসক্রিয়। সারাদিন ফেসবুকে পড়ে থাকি। রিলস দেখি। ইনস্টাগ্রামে নিয়মিত ছবি আপলোড করি। টুইটার বা হালের ‘এক্স’ বাঙালিরা খুব একটা ব্যবহার করে না। কিন্তু সেটাতেও আমি যথেষ্ট সক্রিয়।
কম্পিউটারে লিখি। মাঝে মাঝে টাইপ করতে আলস্য লাগলে ডিকটেশন দিই, কম্পিউটার লিখে নেয়।
এই আমি এখনো ডায়েরি লিখি। প্রায় নিয়মিত এবং হাতে। গোটা গোটা অক্ষরে, তারিখ দিয়ে, কখনো বাংলায়, কখনো ইংরেজি ভাষায় আমি দিনের ঘটনা লিখে রাখি।
এই পুরনো অভ্যাস আমি আজও ত্যাগ করিনি। ক্লাস সেভেন থেকে শুরু। চলছে।
জাতীয় জীবনের বড় বড় মোড় ফেরানো ঘটনা আমি লিখি না। লিখি ব্যক্তিগত জীবনযাত্রার তুচ্ছাতিতুচ্ছ বিষয়। বাজারদর। মহল্লার ফাঁকা প্লটগুলো কীভাবে অট্টালিকায় ভরে যাচ্ছে। নতুন ফেরিওয়ালার হাঁক। মেট্রো ট্রেনে সকাল আর বিকালের ভ্রমণের তফাত। প্রথম ইলেকট্রিক রেজরে শেভ করার অভিজ্ঞতা। এইসব। মাসে দু-তিনটি ভুক্তি থাকে।
আমি নিশ্চিত, এ যুগে বাঙালিদের মধ্যে দিনলিপি লেখার লোক মুষ্টিমেয়। বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তিতে সড়োগড়ো একটা লোকের এ কাজ করার কোনো কারণ নেই।
আমি কেন ডায়েরি লিখি? মৃত্যুর পর সেটা কোনো প্রামাণ্য হিসেবে ব্যবহৃত হবে বলে? যেভাবে তাজউদ্দীন বা বিভূতিভূষণ বা জীবনানন্দ দাশের ডায়েরি হয়েছে, সেভাবে ছাপা হবে বলে?
না। সেকরম কিছু নয়। আমি ডায়েরি লিখি দুটি কারণে। প্রথমত, আমার নিজের হাতের লেখাকে জীবিত রাখতে। নিজের হস্তলিপির দিকে তাকাতে ভালো লাগে আমার। চিত্রশিল্পী যেরকম নিজের চিত্রকর্মের দিকে তাকিয়ে থাকেন, সেরকম। আমার লেখা খুব সুন্দর বলা যাবে না। আবার অসুন্দরও নয়। সোজা এবং একটু ইটালিক ও কার্সিভ— দুই ভঙ্গিতেই লিখি আমি। লেখা আমার কাছে এমন এক শারীরিক অভিজ্ঞতা, যেটা কম্পোজ করার মধ্যে লাভ করা সম্ভব নয়।
ডায়েরি লেখার দ্বিতীয় কারণ, আমার স্মৃতিশক্তি কম বলে আমার বিশ্বাস। বিশেষ করে সময়ের ক্রম এলোমেলো হয়ে যায় আমার। কোন ঘটনা আগে, আর কোনটা পরে ঘটেছে, অনেক সময় গুলিয়ে ফেলি। দিনলিপি আমাকে ঘটনার ক্রম ঠিক রাখতে সাহায্য করে।
তৃতীয় একটা কারণ আছে। প্রফেসর শঙ্কুর তুমুল ভক্তদের একজন আমি। আমার ডায়েরি লেখার শুরু শঙ্কুর অনুকরণে।
ডায়েরি লেখার চল উঠে গেলেও একটা ব্যাপার লক্ষ্য করে আমি অবাক হই। এখনো প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ ডায়েরি বা নোটবুক ছাপা হয়। দিনলিপি লেখার উপযোগী করেই সেগুলোর পৃষ্ঠাবিন্যাস করা হয়। বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এখনো বছরের শুরুতে উপহার দেওয়ার জন্য ডায়েরি ছাপে। সেগুলোর রুল টানা পৃষ্ঠা দিনলিপিকারের জন্য অপেক্ষা করে। বৃথা।
এটা ঠিক যে বাঙালিরা দিনলিপি লিখতে শুরু করেছে কলকাতাকেন্দ্রিক বাঙালির নবজাগরণের কালে, ঔপনিবেশিক শাসকদের অনুকরণে। কবি-সাহিত্যিকদের মধ্যে ডায়েরি লেখার প্রবণতা বরাবর বেশি। এদের মধ্যে বোধহয় সবচেয়ে বেশি দিনলিপি লিখেছেন জীবনানন্দ দাশ ও বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়। জীবনানন্দের মৃত্যুর পর শুধু তার দিনলিপি হিসেবেই ৫৬টি খাতা উদ্ধার হয়, যেগুলোয় ৪ হাজার ২৭২ পৃষ্ঠা জুড়ে ছড়িয়ে ছিল তার দিনপঞ্জি।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সে তুলনায় ডায়েরি লেখেননি বললেই চলে। তবে তিনি চিঠি যে পরিমাণে লিখেছেন, তা ডায়েরির চেয়ে অনেক বেশি। আর লিখেছেন অসংখ্য স্মৃতিকথা। ডায়েরি লেখার প্রতি তার যে অনীহা ছিল, সেই ছাপ পাওয়া যায় ‘পশ্চিম যাত্রীর ডায়ারি’ নামক বইয়ে, যেটা তিনি ডায়েরির মতো করেই লিখেছিলেন তারিখ দিয়ে দিয়ে। তার এক জায়গায় তিনি লিখেছেন: ‘ডায়ারি লেখাটা কৃপণের কাজ। প্রতিদিন থেকে ছোট বড় কিছুই নষ্ট না হোক, সমস্তই কুড়িয়ে কুড়িয়ে রাখি, এই ইচ্ছে ওতে প্রকাশ পায়। কৃপণ এগোতে চায় না। আগলাতে চায়।’ দুই বিশ্বযুদ্ধের সময় অনেক যোদ্ধা ট্রেঞ্চে বসে দিনলিপি লিখেছেন। আমাদের একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় অবরুদ্ধ ঢাকার চিত্র পেতে হলে সেই সময়কার লোকজনের ডায়েরি ছাড়া গত্যন্তর নেই। ভাগ্য ভালো যে তখনো লোকে ডায়েরি লিখত।
দিনলিপি লেখার চল আর ফিরে আসবে না। যেভাবে টেলিগ্রাম আর ফিরবে না। ডাকে চিঠি পাঠানোর দিনও ফিরে আসে না আর।
এগুলো কি কোনো বিসর্জন? দিনলিপির চর্চা উঠে যাওয়ায় আমরা কিছু কি হারিয়েছি? ফেসবুকের পোস্ট কি দিনলিপির বিকল্প হিসেবে কাজ করছে?
আমার মনে হয় না। ফেসবুক পোস্টের সঙ্গে ডায়েরির পাতার একটা বড় তফাত হলো ফেসবুকে আমরা পৃথিবীকে প্রতিদিন জানাই আমরা কী করছি বা কী ভাবছি। দিনলিপি লিখে আমরা শুধু নিজেকে জানাই আমরা কেমন আছি। কলমের কালি, কাটাকুটি, ভুল বানান, তাড়াহুড়োর হাতের লেখা, পাতার কোণে আঁকিবুঁকি— এ সবকিছু লেখকের মানসিক অবস্থার চিহ্ন বহন করে। একটি বাক্য লিখতে সময় লাগে। নিজের অনুভূতিকে ভাষায় প্রকাশ করার আগে তার সঙ্গে কিছুক্ষণ বসবাস করতে হয়। ডায়েরি লেখার সময় কেউ এসে লাইক দেয় না, সঙ্গে সঙ্গে উত্তর আসে না, লেখা ভাইরাল হয় না। এই আপাত অকার্যকারিতার মধ্যেই ডায়েরির পাতার সৌন্দর্য। বলা হয়ে থাকে, ডায়েরি হচ্ছে নিজের কাছে নিজের পাঠানো চিঠি।
হয়তো ডায়েরি লেখা বন্ধ করার মাধ্যমে আমরা নিজের সঙ্গে একান্তে কথা বলার অভ্যাস হারিয়ে ফেলেছি। ডায়েরি লেখা বন্ধ করে আমরা আসলে নিজের পাশ থেকে নিজে উঠে চলে গেছি।



