অপুষ্টিতে হারাচ্ছে শিশুর উচ্চতা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ক্ষুধা ও অপুষ্টি মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি অগ্রগতি হলেও দেশে শিশুদের পুষ্টি পরিস্থিতি এখনো বেশ উদ্বেগজনক। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে ২৪ শতাংশই খর্বাকায়। অর্থাৎ, দীর্ঘমেয়াদি অপুষ্টির শিকার হওয়ায় প্রতি চার শিশুর একজনের উচ্চতা বয়সের তুলনায় কম। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা শিশুদের এ পরিস্থিতিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন।
গত ১৪ অক্টোবর প্রকাশিত ২০২৬ সালের বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচক বা গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্সে (জিএইচআই) উঠে এসেছে এ চিত্র। বিশ্বের ১২২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৮৪তম। এবার বাংলাদেশের স্কোর ১৯ দশমিক ২, যা ক্ষুধার ‘মাঝারি’ মাত্রা নির্দেশ করে। এর আগে ২০১৮ সালে এ স্কোর ছিল ২০। গত আট বছরে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে, তবে তা যথেষ্ট নয়। ২০০০ সালে এ স্কোর ছিল ৩৪ দশমিক ৬।
বিশ্ব জুড়ে ক্ষুধা ও অপুষ্টির মাত্রা পরিমাপের এই আন্তর্জাতিক সূচক ২০০৬ সাল থেকে প্রকাশিত হচ্ছে। এতে অপুষ্টি, শিশুর খর্বাকায়ত্ব, কৃশকায়ত্ব এবং পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুমৃত্যুর হার বিবেচনায় নেওয়া হয়।
প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেছেন, ‘শিশুবিষয়ক অনেকগুলো সূচকে উন্নতি করলেও বাংলাদেশে খর্বাকায়ত্ব রোধে অগ্রগতি যথেষ্ট নয়। খর্বাকায়ত্ব মূলত মস্তিষ্কের বিকাশজনিত সমস্যার একটি প্রধান নির্দেশক। খর্বাকায় শিশুদের স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ ও শেখার ক্ষমতা অন্যদের তুলনায় কম থাকে। এমনকি খর্বাকায়ত্বের কারণে বাংলাদেশ প্রতি বছর সম্ভাব্য জিডিপির ৮ শতাংশ হারাচ্ছে।’
আন্তর্জাতিক সংস্থায় কর্মরত জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ইশতিয়াক মান্নান জানিয়েছেন, গর্ভধারণ থেকে শুরু করে শিশুর জীবনের প্রথম এক হাজার দিনের মধ্যে তার পুষ্টি পরিস্থিতি নির্ধারিত হয়ে যায়। কোনো শিশু একবার খর্বাকায় হয়ে গেলে তার শারীরিক ও মানসিক ঘাটতি পূরণ করা প্রায় অসম্ভব।
শৈশবের এই পুষ্টিহীনতার প্রভাব কৈশোর ও বয়ঃসন্ধিকালেও গড়ায়। আন্তর্জাতিক চিকিৎসাবিজ্ঞান সাময়িকী দ্য ল্যানসেটে প্রকাশিত এক বৈশ্বিক গবেষণায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশের ১৯ বছর বয়সী তরুণীদের গড় উচ্চতা প্রায় পাঁচ ফুটের কাছাকাছি, যা বিশ্বের সর্বনিম্ন গড় উচ্চতার দেশগুলোর অন্যতম। উদাহরণস্বরূপ, একই বয়সী নেদারল্যান্ডসের তরুণীদের গড় উচ্চতা বাংলাদেশের তরুণীদের তুলনায় অন্তত ৭ ইঞ্চি বেশি। ১৯৮৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত বিশ্বের ২০০টি দেশ ও অঞ্চলের শিশু-কিশোরদের শারীরিক বৃদ্ধি পর্যালোচনা করে পরিচালিত ওই গবেষণায় বাংলাদেশের কিশোর-কিশোরীদের বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকার চিত্র উঠে এসেছে।
খাদ্য মূল্যস্ফীতি কীভাবে শিশুর পাতে প্রভাব ফেলছে, তার বাস্তব চিত্র মেলে রাজধানীর শেওড়াপাড়ার সুমি আক্তারের পরিবারে। সাত বছরে পা দেওয়া সুমির উচ্চতা স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কম। তার মা মরিয়ম আক্তার বাসাবাড়িতে ছুটা বুয়ার কাজ করেন, আর বাবা বেকার।
মরিয়ম আক্তার এই প্রতিবেদককে আক্ষেপ করে বলেছেন, ‘আগে অন্তত ডিম কিনতাম। দামের চোটে এখন তাও পারি না। সবজির দামও আকাশছোঁয়া। আলু আর শুঁটকি দিয়েই বেশি দিন পার করি। মাঝেমধ্যে তেলাপিয়া মাছ কিনি।’
বাংলাদেশে বিভিন্ন চাকরির ক্ষেত্রেও উচ্চতা নির্ধারণ করা থাকে। সব ধরনের যোগ্যতা থাকার পরও শুধু উচ্চতার কারণে অনেকের স্বপ্ন থেমে যায়। ছোটবেলা থেকে মির্জা আবিদার স্বপ্ন ছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে কাজ করার। কিন্তু উচ্চতার কারণে তিনি আবেদনই করতে পারেননি। কয়েক বছর ধরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়োগে উচ্চতার মাপ আগের তুলনায় কিছুটা কমানো হয়েছে। কম উচ্চতার কারণে খেলাধুলার জগতেও নানা প্রতিবন্ধকতার মধ্যে পড়তে হয়। কিছু খেলায় বাছাই থেকেই বাদ পড়ে যেতে হয়। মডেলিং পেশায়ও উচ্চতাকে যোগ্যতা হিসেবে ধরা হয়।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের খর্বাকায়ত্বের পেছনে প্রধানত চারটি কারণ দায়ী— গর্ভকালে মায়ের অপুষ্টি ও রক্তশূন্যতা; ছয় মাস পর্যন্ত শুধু মায়ের বুকের দুধ না খাওয়ানো এবং পরে উপযুক্ত পরিপূরক খাবারের অভাব; বারবার ডায়রিয়াসহ খাদ্যনালির সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হওয়া; এবং বাজারে খাদ্যের উচ্চমূল্যের কারণে দরিদ্র পরিবারে পর্যাপ্ত ও সুষম খাবারের ঘাটতি।
জিএইচআই ২০২৬-এর তথ্যানুযায়ী, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে খর্বাকায়ত্বের পাশাপাশি নতুন করে বেড়েছে ‘কৃশতা’ বা ‘কৃশকায়ত্ব’ (উচ্চতার তুলনায় অতিরিক্ত কম ওজন)। ২০০০ সালে দেশে কৃশতার হার ছিল ১২ দশমিক ৫ শতাংশ, যা ২০১৮ সালে কমে ৮ দশমিক ৪ শতাংশে নেমেছিল। তবে সম্প্রতি তা আবার বেড়ে ১২ দশমিক ৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে দেশের মোট জনসংখ্যার ৮ দশমিক ২ শতাংশ সার্বিক অপুষ্টিতে ভুগছে।
আন্তর্জাতিক শিশু অধিকার সংস্থা ‘সেভ দ্য চিলড্রেন’-এর শিশু সুরক্ষা ও শিশু অধিকারবিষয়ক সেক্টর প্রধান আবদুল্লাহ আল মামুন বলেছেন, ‘পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে এভাবে কৃশতার হার বেড়ে যাওয়া ২০০০ সালের পর বিরল। খাদ্যমূল্যস্ফীতি ও পরিপূরক পুষ্টির সংকটই এর প্রধান কারণ। মাঠপর্যায়ে এ শিশুদের চিহ্নিত করে সরকারের পক্ষ থেকে জরুরি ভিত্তিতে পরিপূরক খাবার সরবরাহ করা প্রয়োজন।’
জিএইচআই আরও দেখাচ্ছে, বাংলাদেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুমৃত্যুর হার ৩ শতাংশ— অর্থাৎ প্রতি হাজারে প্রায় ৩০ জন শিশু পাঁচ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই মারা যাচ্ছে।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক মির্জা মোহাম্মদ জিয়াউল ইসলাম জানিয়েছেন, হাসপাতালে আসা শিশু রোগীদের একটি বড় অংশই এখন অপুষ্টির শিকার। সম্প্রতি পরিচালিত এক গবেষণার তথ্য উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, ‘হামে মৃত্যুর সঙ্গে অপুষ্টির সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন হাম আক্রান্ত শিশুদের ৬৫ শতাংশই অপুষ্টিতে ভুগছিল। তাদের মধ্যে ১২ শতাংশ তীব্র এবং ৫৩ শতাংশ মাঝারি অপুষ্টির শিকার।’
চলতি বছরে দেশে ২ লাখ ৪৬ হাজার ৩০ জন হামে আক্রান্ত হয়েছে এবং মারা গেছে ১ হাজার ২৩৩ জন। মৃতদের অধিকাংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু।
অপুষ্টির এই দুষ্টচক্র থেকে বের হতে চীনে গৃহীত সফল মডেল অনুসরণের পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। ১৯৯০ সালে চীনে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের খর্বাকায়ত্বের হার ছিল ২৮ দশমিক ১ শতাংশ। সমন্বিত উদ্যোগে তা ২০২৬ সালে ৪ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়ন, অন্তঃসত্ত্বা মা ও শিশুর জন্য পরিপূরক পুষ্টি নিশ্চিত করা, দরিদ্র এলাকার স্কুলগুলোতে পুষ্টিকর খাবার সরবরাহ এবং নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার ব্যাপক পরিবর্তন এ সাফল্য এনে দিয়েছে।
ড. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার জানিয়েছেন, শিশুদের খর্বাকায়ত্ব কমাতে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো প্রয়োজন। সমন্বিত দীর্ঘমেয়াদি কৌশল গ্রহণের মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে সরকার কাজ করে যাচ্ছে।



