হামের থাবা লাখ ছাড়াল

সরকার এক মাস আগে ঘোষণা দিয়েছিল, লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অতিরিক্ত ৪ লাখের বেশি শিশুকে হামের টিকা দেওয়া হয়েছে। অথচ গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে হামে আক্রান্ত হয়েছে হাজারের বেশি মানুষ। মারা গেছেন ৫ জন।
গত ১৫ মার্চ থেকে হামে আক্রান্তের সংখ্যা লাখ ছাড়িয়েছে, যা দুই দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। হামে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬৬৬ জনে।
টিকার লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়ায় এমন আক্রান্তের সংখ্যা বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন। ‘কোনো এলাকায় টিকার লক্ষ্যমাত্রা ৯৫ শতাংশ হলেই হার্ড ইমিউনিটি তৈরি হয়। তখন হামে আক্রান্তের সংখ্যা কমে যায়। টিকার লক্ষ্যমাত্রা অর্জন হলে দিনে হাজারের বেশি মানুষ হামে আক্রান্ত হতো না। এই পরিস্থিতি স্বাভাবিক নয়। এখনো হামে জরুরি পরিস্থিতি চলছে।’
‘হামে দিনে মৃত্যুর সংখ্যা আগের চেয়ে কমেছে। তবে প্রতিরোধযোগ্য রোগে প্রতিদিন একটি মৃত্যুও অস্বাভাবিক ঘটনা’—যোগ করলেন এই বিশেষজ্ঞ।
দেশে হামের প্রাদুর্ভাব হওয়ার পর গত ১৫ মার্চ থেকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর নতুন করে হামের হিসাব রাখা শুরু করেছে। তাদের নিয়মিত বুলেটিনের তথ্য অনুযায়ী, হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্তের সংখ্যা ১ লাখ ৬৭৭ জন। এর মধ্যে এ পর্যন্ত ১০ হাজার ৭৭৩ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। এ ছাড়া আরও ৮৯ হাজার ৯০৪ জনের শরীরে রোগটির উপসর্গ দেখা গেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, গত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্তের সংখ্যা ১ হাজার ১৪৮ জন। এর মধ্যে ১৩৯ জন নিশ্চিত রোগী।
চলতি বছরের শুরু থেকেই দেশে হামের রোগীর খবর আসতে শুরু করে। ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকে তা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং মার্চ থেকে হাম নিয়ে জরুরি পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে দেশ।
গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে হামের উপসর্গে পাঁচজন মারা গেছে। এর মধ্যে দুই রোগী সিলেটের। তবে নিশ্চিত মৃত্যু শূন্য। গত কয়েকদিন ধরে নিশ্চিত মৃত্যুর সংখ্যা শূন্য রয়েছে।
তিন দিন আগে এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, ‘গত এক সপ্তাহে হামে নিশ্চিত মৃত্যু শূন্যে নেমে এসেছে। সন্দেহজনক রোগীর (মৃত্যু) সংখ্যাও গত ৫ দিনে পাঁচের নিচে নেমেছে। টিকাদান কর্মসূচিতে সফল না হলে অনেক খারাপ অবস্থা হয়ে যেত। দেশে হামের টিকাদানে স্বাস্থ্য বিভাগ শতভাগ সার্থক ও সফল হয়েছে।’
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দাবির সঙ্গে একমত নন— রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মুশতাক হোসেন। তার মতে, নিশ্চিত মৃত্যুর সংখ্যা শূন্যর কৃতিত্বের কিছু নেই, এটি অবৈজ্ঞানিক কথা। হাম হলে হামের উপসর্গ দেখা যায়। যখন কোনো রোগ মহামারির রূপ নেয়, তখন প্রত্যেক রোগী ধরে ধরে পরীক্ষা করে নিশ্চিত করা জরুরি নয়। এর প্রয়োজনও নেই।
শতভাগ টিকার সফলতায় সন্তুষ্টি প্রকাশ না করে সরকার বরং কোথায় কোথায় টিকা দেওয়া সম্ভব হয়নি, সেটি খুঁজে বের করে মাইক্রোপ্ল্যানিংয়ের মাধ্যমে টিকা দেওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন মুশতাক হোসেন।
হামের প্রাদুর্ভাবের পর সরকার দেশের ১৮টি জেলার ঝুঁকিপূর্ণ উপজেলায় গত ৫ এপ্রিল টিকা দেওয়া শুরু করে। এরপর সারা দেশে টিকাদান ক্যাম্পেইন শুরু হয় ২০ এপ্রিল, যা শেষ হয় ২০ মে। সরকারের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার ৬৪ শিশুকে হামের টিকার আওতায় নিয়ে আসা।
গত রবিবার পর্যন্ত ১ কোটি ৮২ লাখ ২৩ হাজার ৪৪৫ শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি শিশু টিকা পেয়েছে।
স্বাভাবিক সময়ে টিকার প্রথম ডোজ ৯ মাসে দেওয়া হতো। হামের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে টিকা দেওয়ার নির্ধারিত নতুন বয়স করা হয় ছয় মাস থেকে ৫ বছর। তবে টিকা দেওয়া হয়েছে ছয় বছর পর্যন্ত শিশুদের।






