৫০ হাজার টাকার চুক্তিতে খুন, মোবাইলে ধরা ৫ ‘খুনি’
- পরকীয়ার বিরোধে হত্যার পরিকল্পনা
- ক্ষতবিক্ষত লাশ ফেলা হয় ঘাসের ক্ষেতে
- টয়লেটে হাত-মুখ বেঁধে নির্যাতন, মুরগির খামারে হত্যা
- ছয় বছর ধরে ঢাকায় ছদ্মবেশে অটোরিকশা চালাত খুনি

প্রতীকী ছবি— এআই
সন্ধ্যার পর থেকেই নিখোঁজ ছিল ১৪ বছরের কিশোর ওমর আলী শেখ। পরিবারের লোকজন হয়তো তখনো ভাবছিলেন, রাত পোহালেই ফিরে আসবে সে। কিন্তু আর ফেরা হয়নি। পরদিন গ্রামের একটি ঘাসের ক্ষেতে পাওয়া যায় তার রক্তাক্ত নিথর দেহ। শরীর জুড়ে ধারালো অস্ত্রের আঘাত।
কিন্তু কে হত্যা করল ওমরকে? কেনইবা তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হলো? এক বছর, দুই বছর করে কেটে গেল প্রায় ছয় বছর। সময়ের সঙ্গে ধূসর হয়ে যাচ্ছিল সেই হত্যার স্মৃতি। তবে তদন্তকারীদের কাছে মামলাটি হারিয়ে যায়নি। তদন্তকারীদের হাতে ছিল না হত্যাকারীদের ধরার মতো শক্ত কোনো সূত্র। একের পর এক সম্ভাব্য জায়গায় অনুসন্ধান চালিয়েও মিলছিল না কাঙ্ক্ষিত তথ্য। ভুক্তভোগীর স্বজন ও পরিচিতদের জিজ্ঞাসাবাদেও খুলছিল না রহস্যের জট।
অনেক দিন পর হঠাৎ করেই বদলে যায় তদন্তের গতিপথ। কলেজপড়ুয়া এক মেয়ের মোবাইল নম্বর হাতে আসে তদন্ত কর্মকর্তার। নম্বরটির কল ডিটেইলস খতিয়ে দেখতেই চোখে পড়ে কয়েকটি অস্বাভাবিক যোগাযোগ। কার সঙ্গে কথা হচ্ছে, কতবার হচ্ছে এবং নম্বরগুলোর অবস্থান কোথায়— সবকিছুই শুরু হয় বিশ্লেষণ। একপর্যায়ে দুটি নম্বরকে বিশেষভাবে সন্দেহজনক মনে হয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) তদন্তকারীদের। অবশেষে প্রায় ছয় বছর পর বেরিয়ে এসেছে সেই হত্যার রহস্য।
পিবিআইর তদন্তে উঠে এসেছে, পরকীয়া সম্পর্ককে কেন্দ্র করে বিরোধ ও ক্ষোভ থেকেই ওমরকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে পথ থেকে তাকে ধরে নিয়ে প্রথমে একটি বাড়ির টয়লেটে আটকে হাত-মুখ বেঁধে করা হয় নির্যাতন। পরে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে করা হয় গুরুতর জখম। এরপর মুরগির খামারে নিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে লাশ ফেলে দেওয়া হয় ঘাসের ক্ষেতে।
এ ঘটনায় পিবিআই ফরিদপুর জেলার ‘বিশেষ তদন্ত’ দল প্রায় ৬ বছর পর গত ৫ অক্টোবর ঢাকার আশুলিয়া থেকে গ্রেপ্তার করে মো. নজরুল ইসলাম (৪৮) নামে একজনকে। সম্পর্কে তিনি নিহত ওমর আলীর নানা। পরদিন ৬ অক্টোবর আদালতে হাজির করা হলে তিনি ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে জানিয়েছে পিবিআই।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২১ সালের ১ জানুয়ারি রাতে নিখোঁজ হয় রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার ঢোলজানী গ্রামের কিশোর ওমর আলী। এর তিন দিন পর গ্রামের একটি ঘাসের ক্ষেত থেকে উদ্ধার করা হয় তার রক্তাক্ত মরদেহ। শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছিল ধারালো অস্ত্রের আঘাত। সন্তান হারিয়ে দিশাহারা বাবা পরদিন বালিয়াকান্দি থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন। হত্যারহস্য উদঘাটনে পরে মামলাটির তদন্তভার নেয় পিবিআই ফরিদপুর জেলা। ২০২১ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্ত শুরু করে সংস্থাটি। নিহত ওমর আলী শেখ ঢোলজানী গ্রামের সবজি বিক্রেতা আহাদ আলী শেখের ছেলে।
পিবিআইর তদন্তে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য। ওমর এবং হত্যাকাণ্ডে জড়িত কয়েকজনের মধ্যে বন্ধুত্বের সম্পর্ক ছিল। তারা নিয়মিত একসঙ্গে মাদক সেবন করত। এই বন্ধুত্বের মধ্যেই তৈরি হয়েছিল ভয়ংকর বিরোধ। তদন্তে জানা যায়, সহযোগী দুই আসামির একজনের স্ত্রীর সঙ্গে ওমরের পরকীয়া সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। আরেকজনের স্ত্রীর সঙ্গেও পরকীয়ার চেষ্টা করেছিল ওমর। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর ওই দুজনের সঙ্গে তার বিরোধ ও ক্ষোভ চরমে ওঠে। একপর্যায়ে ওমরকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় তারা।
পিবিআইর তথ্য অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ড বাস্তবায়নে এক সহযোগীর সঙ্গে ৫০ হাজার টাকায় চুক্তিও করা হয়েছিল। পরে সেই পরিকল্পনার কথা নজরুল ইসলামকে জানানো হলে তিনিও হত্যাকাণ্ডে যুক্ত হতে রাজি হন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পরিকল্পনা অনুযায়ী ঘটনার রাতে ওমরকে পথ থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর নেওয়া হয় অন্য এক আসামির বাড়ির টয়লেটে। সেখানেই শুরু হয় নির্যাতন। নজরুল ওমরের জামা খুলে তার মুখ ও হাত বেঁধে দেয়। এরপর অন্যরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করতে থাকে। গুরুতর আহত ওমর তখন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছিল। কিন্তু হামলা থামেনি। পরে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় একটি মুরগির খামারে। সেখানে আবারও ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে তার মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়।
হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয় পাঁচজন। হত্যার পর লাশ নিয়ে কী করা হবে, সেটিও আগে থেকেই ঠিক করা ছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে। মরদেহ গোপন করতে সবাই মিলে ওমরের লাশ নিয়ে যায় কমল মণ্ডল ওরফে বিপুলের গ্যামা ঘাসের ক্ষেতে। সেখানেই ফেলে রেখে রাতের অন্ধকারে ঘটনাস্থল থেকে সরে যায় তারা। হত্যার পরও অবশ্য শেষ হয়নি গল্প। পুলিশের নজরে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় নজরুল ইসলাম এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যান। তাকে পালিয়ে যাওয়ার জন্য ৫ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছিল বলেও তদন্তে উঠে এসেছে।
তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, তদন্তের একপর্যায়ে নজরুলের কলেজপড়ুয়া মেয়ের একটি মোবাইল নম্বর হাতে আসে তদন্ত কর্মকর্তার। নম্বরটির কল ডিটেইলস খতিয়ে দেখতেই চোখে পড়ে কয়েকটি অস্বাভাবিক যোগাযোগ। কার সঙ্গে কথা হচ্ছে, কতবার হচ্ছে এবং নম্বরগুলোর অবস্থান কোথায়— সবকিছুই শুরু হয় বিশ্লেষণ।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশ পরিদর্শক মো. তাজুল ইসলাম জানিয়েছেন, একপর্যায়ে দুটি নম্বরকে বিশেষভাবে সন্দেহজনক মনে হয় তদন্তকারীদের। সেগুলোর যোগাযোগ ও লোকেশন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, কিছু নম্বরের অবস্থান মধুখালী আবার কয়েকটির আশুলিয়া এলাকায়। আশুলিয়ার একটি নম্বর নিয়ে আরও গভীরভাবে অনুসন্ধান শুরু হয়। সেখানেই পাওয়া যায় ‘ফরহাদ’ নামে সংরক্ষিত একটি নম্বর। সেই নম্বরের সূত্র ধরেই ৫ অক্টোবর রাতে আশুলিয়ার কাঠগড়া এলাকার লালমিয়া টাওয়ারের একটি ভাড়া বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় নজরুলকে।
তিনি বলেছেন, এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিল পাঁচজন। তদন্তের স্বার্থে অন্যদের নাম বলা যাচ্ছে না। তিনি জানিয়েছেন, অভিযুক্ত নজরুল ঢাকায় পালিয়ে এসে আশুলিয়া এলাকায় ছদ্মবেশে অটোরিকশা চালাতেন।
পিবিআই ফরিদপুর জেলার পুলিশ সুপার মো. রবিউল ইসলাম জানিয়েছেন, অপরাধীরা ঘটনার পর তথ্য ও আলামত গোপন করার চেষ্টা করতে পারে। তবে পেশাদার, তথ্যনির্ভর ও প্রযুক্তিনির্ভর তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত রহস্য উদঘাটন করে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব। মামলাটির তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আরও কারা জড়িত, তা খতিয়ে দেখছে পিবিআই।



