বোয়িংমুখী বিমানের জন্য এয়ারবাসের ‘অবিশ্বাস্য অফার’

ফাইল ছবি
বিমানের উড়োজাহাজ কেনার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িংয়ের পাশাপাশি ইউরোপের এয়ারবাসেরও ‘সমান সুযোগ’ চায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। বাংলাদেশ বিমানের বহর সম্প্রসারণে বোয়িংয়ের সঙ্গে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তির পরই এমন আহ্বান জানাল ইউরোপ। একই সঙ্গে সরকারি ক্রয়ে স্বচ্ছতা ও বাণিজ্যিক যোগ্যতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথাও জানিয়েছে তারা।
আজ রবিবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে ইইউভুক্ত ২৭ দেশের রাষ্ট্রদূত ও প্রতিনিধিদের সঙ্গে সরকারের বৈঠক শেষে এক যৌথ ব্রিফিংয়ে এ অবস্থান তুলে ধরেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ইইউ রাষ্ট্রদূত ও হেড অব ডেলিগেশন মাইকেল মিলার।
ইইউ রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘আমাদের দৃষ্টিতে, এয়ারবাসের একটি অবিশ্বাস্য প্রতিযোগিতামূলক অফার রয়েছে। ঢাকার এটিকে খুব গুরুত্বসহকারে নেওয়া উচিত।’ এয়ারবাস ও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের দ্রুত এ বিষয়ে আলোচনা হবে বলেও প্রত্যাশা রাষ্ট্রদূতের।
২০২৩ সালে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর ঢাকা সফরে ১০টি এয়ারবাস কেনার একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছিল। গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের পর এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ব্যবধান কমানোর কৌশলগত চাপে অন্তর্বর্তী সরকার বোয়িংয়ের পক্ষে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়।
গত ৩০ এপ্রিল বোয়িংয়ের ১৪টি নতুন উড়োজাহাজ কিনতে চুক্তি করেছে বিমান। আটটি বোয়িং ৭৮৭-১০ ড্রিমলাইনার, দুটি বোয়িং ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার এবং চারটি বোয়িং ৭৩৭-৮ ম্যাক্স জেট উড়োজাহাজ কেনা হবে। আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা। গড়ে প্রতিটির দাম ৩ হাজার ২১৪ কোটি টাকা। ধাপে ধাপে ২০৩১ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে এসব উড়োজাহাজ সরবরাহের কথা রয়েছে।
এর ফলে বোয়িং-এয়ারবাস প্রতিযোগিতা কেবল বিমানের বহর আধুনিকায়নের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকছে না; এর সঙ্গে বাংলাদেশের বৃহত্তর বাণিজ্য ও কূটনৈতিক সম্পর্কের বিষয়টিও যুক্ত হয়েছে। আগে বিমান বহর আধুনিকায়নে এয়ারবাস থেকে উড়োজাহাজ কেনার নীতিগত সিদ্ধান্ত ছিল। পরবর্তী সময়ে সরকার পরিবর্তন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কের নতুন সমীকরণের মধ্যে বোয়িংয়ের সঙ্গে চুক্তি হয়।
‘বাণিজ্যিক যোগ্যতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত’
ইইউ রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘আমরা সব ক্ষেত্রে একটি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির অনুরোধ করছি। আপনি যদি কোনো সরকারি ক্রয়ের সিদ্ধান্ত নেন, তা যেন বাণিজ্যিক যোগ্যতার ভিত্তিতে নেওয়া হয় এবং আমাদের কোম্পানিগুলো যেন যেকোনো দেশের কোম্পানির সঙ্গে তাদের সাধ্যমতো সর্বোত্তম প্রতিযোগিতা করতে পারে।’
এ বক্তব্যের মাধ্যমে মূলত সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ায় ইউরোপীয় কোম্পানিগুলো যেন কোনোভাবেই পিছিয়ে না পড়ে, সেটিই নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে ইইউ।
এর আগেও বাংলাদেশে এয়ারবাসকে বিমানের বহর নবায়ন পরিকল্পনায় রাখার আহ্বান জানিয়েছিলেন মিলার। তখন তিনি স্বচ্ছতা ও বৈষম্যহীন প্রতিযোগিতার ওপর জোর দিয়েছিলেন।
ইউরোপের এ অবস্থানকে শুধু উড়োজাহাজ বিক্রির বাণিজ্যিক স্বার্থ হিসেবে দেখছে না সংশ্লিষ্ট মহল। বাংলাদেশের অন্যতম বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার ইইউ। ফলে বিমান কেনার মতো বড় সরকারি ক্রয়ের সিদ্ধান্তের সঙ্গে ভবিষ্যৎ বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্কের বার্তাও জড়িত।
৪৮ অশুল্ক বাধা দূর, বাকি ১৩
এদিকে ইইউর সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদারে বড় অগ্রগতির কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ। ইইউর চিহ্নিত ৬১টি অশুল্ক বাধার মধ্যে ৪৮টির সমাধান করা হয়েছে। বাকি ১৩টি সমস্যা সমাধানের প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, গত মার্চে ইইউ রাষ্ট্রদূতের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্যে বিদ্যমান বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা তুলে ধরেছিল। এরপর জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, নৌপরিবহনসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সমন্বয়ে দ্রুত এসব সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
সমাধান হওয়া বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে শতভাগ বিদেশি মালিকানাধীন লজিস্টিক কোম্পানির লাইসেন্স নবায়নের জটিলতা দূর করা, বাণিজ্যিক স্যাম্পল আমদানির বার্ষিক সীমা ১০ হাজার থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার ডলারে উন্নীত করা এবং রপ্তানি পণ্যের ট্রেসিবিলিটি নিশ্চিত করতে ব্যবহৃত স্ক্যানিং স্মার্ট কার্ডের শুল্কায়ন জটিলতা দূর করা ও যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ।
ইইউ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার হিসেবে মনে করেন বাণিজ্যমন্ত্রী। বললেন, এ বাজার ধরে রাখতে এবং বাণিজ্য আরও বাড়াতে অশুল্ক বাধা দূর করার পাশাপাশি পণ্যের বহুমুখীকরণেও গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।
এফটিএ নিয়ে দ্রুত আলোচনা
বৈঠকে বাংলাদেশ-ইইউ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতির কথা জানানো হয়। বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে এফটিএ ও বিনিয়োগ সুরক্ষা চুক্তির বিষয়ে প্রস্তাব দেওয়ার পর ইউরোপীয় কমিশন ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে বলে জানান মাইকেল মিলার। সদস্য দেশগুলোর প্রয়োজনীয় অনুমোদন শেষ হলে চলতি সপ্তাহেই এ নিয়ে যৌথ কারিগরি আলোচনা শুরু হতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এলডিসি থেকে উত্তরণের পর ইউরোপের বাজারে বর্তমান বাণিজ্য সুবিধা ধরে রাখা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। এ পরিস্থিতিতে এফটিএ কিংবা সমজাতীয় কোনো বাণিজ্য কাঠামো বাংলাদেশের রপ্তানির জন্য গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা তৈরি করতে পারে।
এর আগে বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও দ্রুত এফটিএ আলোচনা শুরুর তাগিদ দেওয়া হয়েছে। ইউরোপীয় বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা ধরে রাখা এবং ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ বাড়াতে এ চুক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছে ঢাকা।
এলডিসি উত্তরণ পেছাতে ইইউর সমর্থন চায় ঢাকা
এলডিসি থেকে উত্তরণের সময়সীমা আরও তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার আবেদন করেছে বাংলাদেশ। বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতি কমিটি (সিডিপি) ও অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ (ইকোসক)-এর প্রক্রিয়ার দুটি ধাপ এরই মধ্যে অতিক্রম করেছে বাংলাদেশ। আগামী জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বিষয়টি উঠলে ইইউর সমর্থন প্রত্যাশা করছে ঢাকা।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা তিন বছর পেছানোর জন্য আবেদন করেছি। জাতিসংঘের দুটি ধাপ আমরা অতিক্রম করেছি। সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বিষয়টি উত্থাপিত হলে আমরা আশা করছি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সম্মতি পাব।’
বাংলাদেশের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এলডিসি উত্তরণের পর ইউরোপের বাজারে রপ্তানির শুল্ক সুবিধা, বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। এ কারণে একদিকে এফটিএ আলোচনা এগিয়ে নেওয়া, অন্যদিকে উত্তরণের সময় বাড়ানোর চেষ্টা করছে সরকার।
‘জাতীয় স্বার্থেই আমদানি সিদ্ধান্ত’
এয়ারবাস কেনার বিষয়ে ইইউর বক্তব্যের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র থেকে পণ্য আমদানি ও সরকারি ক্রয় নিয়ে প্রশ্নের জবাবও দিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী। বললেন, কোনো নির্দিষ্ট দেশের প্রভাবের কারণে নয়, জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা ও জনগণের প্রয়োজন বিবেচনা করেই আমদানির সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ।
জ্বালানি, এলএনজি ও খাদ্যশস্য আমদানির ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক মূল্য, পণ্যের মান এবং অপচয়ের হার বিবেচনা করে সরকারি ক্রয় কমিটি সিদ্ধান্ত নেয়— উল্লেখ করেন বাণিজ্যমন্ত্রী।
বিমান প্রসঙ্গে সরকারের অবস্থানও মূলত একই—উড়োজাহাজ কেনার ক্ষেত্রে দেশের প্রয়োজন, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, মূল্য, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় এবং দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক সুবিধা বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে ইইউর বার্তায় স্পষ্ট, তারা চায় এয়ারবাস যেন বোয়িংয়ের সঙ্গে সমান প্রতিযোগিতার সুযোগ পায়।
বাণিজ্য ও বিনিয়োগে নতুন সমীকরণ
রবিবারের বৈঠকে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক বাড়ানো, অশুল্ক বাধা দূর করা, ইউরোপীয় কোম্পানির জন্য ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করা এবং এলডিসি-পরবর্তী সময়ে বাজার সুবিধা নিয়ে আলোচনা হয়। সেখানে অংশ নিয়ে ছিলেন— অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, এনবিআরের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আহসান হাবিবসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
সব মিলিয়ে একই দিনে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা মিলেছে—বোয়িংয়ের সঙ্গে বড় চুক্তির পর এয়ারবাসকে প্রতিযোগিতার সুযোগ দেওয়ার দাবি জানিয়েছে ইইউ; ৬১টি অশুল্ক বাধার মধ্যে ৪৮টি সমাধান করে বাংলাদেশ এফটিএর পথে এগিয়েছে; আর এলডিসি উত্তরণ পেছানোর উদ্যোগে ইউরোপের সমর্থন চেয়েছে ঢাকা।
ফলে বিমান কেনার প্রতিযোগিতা এখন কেবল দুটি উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক লড়াই নয়। এর সঙ্গে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ বাণিজ্যনীতি, ইউরোপের বাজারে প্রবেশাধিকার, বিনিয়োগ এবং কূটনৈতিক ভারসাম্যের প্রশ্নও ক্রমেই জড়িয়ে পড়ছে।







