মানুষের আলোতেই হারাচ্ছে মহাবিশ্ব দেখার স্বপ্ন
- পৃথিবীর অন্যতম অন্ধকার স্থান চিলির আতাকামা মরুভূমিতেও বাড়ছে কৃত্রিম আলোর প্রভাব
- শহর, শিল্প প্রকল্প ও স্যাটেলাইটের আলোয় হুমকিতে গবেষণা
- আলো দূষণে ঝুঁকিতে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ টেলিস্কোপগুলো
- অন্ধকার আকাশ হারালে কমবে মহাবিশ্ব জানার সুযোগ

সংগৃহীত ছবি
রাত গভীর। ঘড়ির কাঁটা তখন প্রায় ২টা। চারদিকে এমন অন্ধকার যে চোখ খোলা নাকি বন্ধ তা বোঝাও কঠিন। নেই শহরের বাতির ঝলকানি, নেই গাড়ির আলো, নেই মানুষের কোলাহল। দরজা খুলে বাইরে পা রাখলেই শুরু হয় পাথর আর শুকনো বালুর এক নীরব জগৎ।
আর মাথার ওপরে? যেন পুরো মহাবিশ্ব খুলে গেছে চোখের সামনে। আকাশজুড়ে কোটি কোটি তারা। স্পষ্ট দেখা যায় মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির সাদা আলোর পথ। খালি চোখেই দেখা যায় ম্যাজেলানিক ক্লাউডস—দুটি ছোট ছায়াপথ। যাদের আলো পৃথিবীতে পৌঁছাতে সময় নিয়েছে প্রায় দুই লাখ বছর।
দক্ষিণ আমেরিকার চিলির আতাকামা মরুভূমিতে এমন দৃশ্য এখনো দেখা যায়। পৃথিবীর সবচেয়ে শুষ্ক ও অন্ধকার জায়গাগুলোর একটি এই মরুভূমি। বিজ্ঞানীদের কাছে এটি শুধু একটি মরুভূমি নয়, এটি মহাবিশ্ব দেখার এক বিরল জানালা।
কিন্তু সেই জানালাতেই এখন ধীরে ধীরে জমছে মানুষের তৈরি আলোর পর্দা। শহর, খনি, শিল্পকারখানা, জ্বালানি প্রকল্প এবং হাজার হাজার স্যাটেলাইটের আলো পৃথিবীর অন্যতম পরিষ্কার রাতের আকাশকে বদলে দিতে শুরু করেছে।
বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা—যদি এই প্রবণতা চলতে থাকে, তাহলে একদিন আতাকামার আকাশ থেকেও হারিয়ে যেতে পারে মহাবিশ্বের সবচেয়ে দুর্লভ দৃশ্যগুলো।
ইউরোপিয়ান সাউদার্ন অবজারভেটরির জ্যেষ্ঠ জ্যোতির্বিজ্ঞানী ইতজিয়ার দে গ্রেগোরিও-মনসালভো বলেছেন, ‘পৃথিবীতে এমন পরিবেশ খুব কম জায়গাতেই আছে। এই কারণেই বিশ্বের বড় বড় জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা ছুটে আসেন আতাকামায়।
চিলির পারানাল অবজারভেটরি বর্তমানে পৃথিবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্যোতির্বিজ্ঞান কেন্দ্র। এখানে রয়েছে ভেরি লার্জ টেলিস্কোপ। পাশাপাশি নির্মাণাধীন রয়েছে এক্সট্রিমলি লার্জ টেলিস্কোপ। যার আয়নার ব্যাস প্রায় ৩৯ মিটার।
এই ধরনের বিশাল স্থলভিত্তিক টেলিস্কোপ মহাকাশ গবেষণায় অপরিহার্য। এখান থেকেই বিজ্ঞানীরা সৌরজগতের বাইরের গ্রহ, দূরের ছায়াপথ এবং আমাদের মিল্কিওয়ের কেন্দ্রে থাকা অতিভারী ব্ল্যাক হোল সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছেন। কিন্তু এই সব গবেষণার মূল শর্ত একটাই—অন্ধকার।
আতাকামার উচ্চতা, শুষ্ক আবহাওয়া এবং মানুষের বসতি থেকে দূরত্ব একে বিশেষ করে তুলেছে। এখানে বাতাসে জলীয় বাষ্প খুব কম, মেঘ প্রায় নেই বললেই চলে। ফলে মহাকাশের ক্ষীণতম আলোও ধরা পড়ে শক্তিশালী টেলিস্কোপে।
তবে যে অন্ধকার এতদিন প্রকৃতি রক্ষা করেছে, সেটিই এখন মানুষের কারণে ঝুঁকিতে পড়ছে।
বিশ্বজুড়ে আলো দূষণ দ্রুত বাড়ছে। গবেষণা বলছে, পৃথিবীর প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ এখন এমন আকাশের নিচে বাস করে, যেখানে কৃত্রিম আলোর কারণে প্রকৃত রাতের আকাশ দেখা যায় না।
২০১১ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে রাতের আকাশের উজ্জ্বলতা প্রতিবছর গড়ে প্রায় ১০ শতাংশ করে বেড়েছে বলে গবেষকদের এক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। অর্থাৎ যেখানে আগে কেউ ২৫০টি তারা দেখতে পেত, কয়েক বছরের ব্যবধানে সেখানে হয়তো দেখা যাচ্ছে মাত্র ১০০টি। আলো দূষণের প্রভাব শুধু জ্যোতির্বিজ্ঞানে সীমাবদ্ধ নয়।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, রাতের কৃত্রিম আলো প্রাণী ও উদ্ভিদের স্বাভাবিক জীবনচক্র বদলে দিতে পারে। অনেক প্রাণী দিন-রাতের সংকেত ব্যবহার করে খাবার খোঁজা, চলাচল ও প্রজননের সময় নির্ধারণ করে। অতিরিক্ত আলো সেই প্রাকৃতিক ছন্দ নষ্ট করে।
মানুষের ক্ষেত্রেও রাতের আকাশ হারিয়ে যাওয়া প্রকৃতির সঙ্গে হাজার বছরের সম্পর্ক দুর্বল করে দিতে পারে বলে মনে করেন গবেষকরা।
আতাকামার পারানাল অবজারভেটরিতে তাই অন্ধকার রক্ষায় নেওয়া হয়েছে কঠোর ব্যবস্থা। রাতে জানালা ঢেকে রাখা হয়। বাইরে আলো ব্যবহার সীমিত। এমনকি সন্ধ্যার পর গাড়ির উজ্জ্বল হেডলাইট ব্যবহারেও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, বিপদ আসছে দূর থেকে।
নিকটবর্তী শহর আন্তোফাগাস্তার আলো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে। পাশাপাশি খনি ও শিল্প প্রকল্পগুলো এগিয়ে আসছে মরুভূমির গভীরে।
সম্প্রতি একটি বড় শিল্প প্রকল্প নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছিলেন, এমন প্রকল্প পারানালের ওপর আলো দূষণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিতে পারে। যদিও পরে প্রকল্পটি এগোয়নি, তবু গবেষকদের ভয়—ভবিষ্যতে একই ধরনের নতুন প্রকল্প আবার আসতে পারে। শুধু পৃথিবীর আলো নয়, মহাকাশ থেকেও বাড়ছে সমস্যা।
নিম্ন কক্ষপথে হাজার হাজার যোগাযোগ স্যাটেলাইট পাঠানো হচ্ছে। এসব স্যাটেলাইট রাতের আকাশে আলোর রেখা তৈরি করে, যা জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের পর্যবেক্ষণে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, মহাকাশে টেলিস্কোপ পাঠানো সম্ভব হলেও পৃথিবীর বড় স্থলভিত্তিক টেলিস্কোপের বিকল্প নেই। কারণ অনেক পর্যবেক্ষণের জন্য বিশাল আয়না ও জটিল যন্ত্রপাতি দরকার, যা মহাকাশে পাঠানো প্রায় অসম্ভব।
তাই আতাকামার অন্ধকার হারানো মানে শুধু একটি সুন্দর রাতের আকাশ হারানো নয়; এর অর্থ হতে পারে মহাবিশ্ব সম্পর্কে জানার একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ বন্ধ হয়ে যাওয়া।
একসময় পৃথিবীর প্রায় সব জায়গাতেই মানুষ রাতের আকাশে অসংখ্য তারা দেখতে পেত। আজ সত্যিকারের অন্ধকার নিজেই বিরল হয়ে উঠেছে।
চিলির জ্যোতির্বিজ্ঞানী এদুয়ার্দো উন্দা-সানজানা বলেছেন, ‘৫০ বছর আগে পৃথিবীতে অন্ধকার আকাশের অভাব ছিল না। কিন্তু যা একসময় প্রচুর ছিল, সেটিই এখন বিপন্ন হয়ে যাচ্ছে।’
মানুষ হাজার বছর ধরে তারার দিকে তাকিয়ে নিজের অস্তিত্ব, সময় ও মহাবিশ্বকে বোঝার চেষ্টা করেছে। কিন্তু এখন প্রশ্ন উঠছে—আমাদের তৈরি আলোই কি একদিন আমাদের মহাবিশ্ব দেখার ক্ষমতা কেড়ে নেবে?
তথ্যসূত্র: বিবিসি, ইউরোপিয়ান সাউদার্ন অবজারভেটরি, ইন্টারন্যাশনাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিয়ন।















