নীল জলের নিচে লুকিয়ে আছে ভয়ংকর ‘ডেড জোন’
- বাল্টিক সাগরের তলদেশে দ্রুত বাড়ছে অক্সিজেনশূন্য ‘ডেড জোন’
- সমুদ্র স্বাভাবিক হতে লাগতে পারে ৪০০ বছরের বেশি সময়, আশঙ্কা বিজ্ঞানীদের
- বাল্টিক সাগরের প্রায় ৯৭ শতাংশ অঞ্চল দূষণে ক্ষতিগ্রস্ত
- পরিবেশ রক্ষায় কাজ করছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় সংগঠন

সংগৃহীত ছবি
দূর থেকে দেখলে মনে হবে শান্ত, স্বচ্ছ আর অপার সৌন্দর্যে ভরা এক সমুদ্র। ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে পাথুরে তীরে, নীল জলের ওপর ভাসছে ছোট ছোট ইয়ট। আকাশ আর সমুদ্র যেন মিশে গেছে এক রঙে। কিন্তু সেই মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্যের নিচেই ধীরে ধীরে জন্ম নিচ্ছে এক ভয়ংকর মৃত্যুপুরী।
ইউরোপের বাল্টিক সাগরের তলদেশে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে বিশাল বিশাল ‘ডেড জোন’। যেখানে অক্সিজেন এতটাই কম যে কোনো সামুদ্রিক প্রাণ টিকে থাকতে পারে না। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই সংকট এখন আর শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি ধীরে ধীরে মানবজীবন, অর্থনীতি ও ভবিষ্যতের জন্য বড় হুমকিতে পরিণত হচ্ছে।
ডেনমার্কের ছোট দ্বীপ বর্নহোম একসময় ছিল মাছ ধরার ব্যস্ত কেন্দ্র। দ্বীপটির বন্দর জুড়ে থাকত শত শত মাছ ধরার নৌকা। বন্দরের পাশে থাকা মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানাগুলো দিনরাত চলত। পুরো এলাকার জীবন-জীবিকা নির্ভর করত সমুদ্রের ওপর। আজ সেই বন্দর প্রায় নিস্তব্ধ।
একসময় এখানে ৫৫টি মাছ ধরার নৌকা ছিল। এখন আছে মাত্র একটি। আপনি এক নৌকা থেকে আরেক নৌকায় হেঁটে যেতে পারতেন। পুরো বন্দর মানুষ আর জাহাজে ভরা থাকত। মাছ হারিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরো শিল্পটাই ধসে পড়েছে
বন্দরের হারবার মাস্টার টম নিলসেন প্রায় তিন দশক ধরে এখানে কাজ করছেন। পুরনো দিনের কথা বলতে গিয়ে তার কণ্ঠে হতাশা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
তিনি বলেছেন, ‘একসময় এখানে ৫৫টি মাছ ধরার নৌকা ছিল। এখন আছে মাত্র একটি। আপনি এক নৌকা থেকে আরেক নৌকায় হেঁটে যেতে পারতেন। পুরো বন্দর মানুষ আর জাহাজে ভরা থাকত। মাছ হারিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরো শিল্পটাই ধসে পড়েছে।’
২০১৯ সালে স্থানীয় কড মাছের মজুদ ভয়াবহভাবে কমে যাওয়ায় বাণিজ্যিক মাছ ধরা নিষিদ্ধ করা হয়। এরপর ২০২৪ সালে বন্ধ হয়ে যায় দ্বীপটির ১৪১ বছরের পুরনো জেলেদের সংগঠনও। যেসব পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম সমুদ্রের ওপর নির্ভর করে বেঁচে ছিল, তাদের অনেকেই এখন পেশা বদলাতে বাধ্য হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমুদ্রের এই ক্ষতি পূরণ হতে ৪০০ বছরেরও বেশি সময় লাগতে পারে। কেউ কেউ মনে করেন, হয়তো আর কখনো আগের অবস্থায় ফিরবে না বাল্টিক সাগর। এই বিপর্যয়ের বড় কারণ মানুষের তৈরি দূষণ।
খামারে ব্যবহৃত রাসায়নিক সার, শিল্পকারখানার বর্জ্য এবং পয়ঃনিষ্কাশনের দূষিত পানি নদী হয়ে গিয়ে মিশছে বাল্টিক সাগরে। এতে সমুদ্রে অতিরিক্ত নাইট্রোজেন ও ফসফরাস জমা হচ্ছে। এই উপাদানগুলো দ্রুত শৈবাল বৃদ্ধিতে সাহায্য করে।
আগে এই মৃত অঞ্চলগুলো গভীর সমুদ্রে দেখা যেত। এখন তা উপকূলের কাছেও চলে আসছে। কিছু জায়গায় সমুদ্রের তলায় সাদা এক ধরনের স্তর দেখা যায়, যাকে আমরা ‘কর্পস শিট’ বলি। এটি আসলে মৃত্যুর চাদর
প্রথমে বিষয়টি চোখে সুন্দর লাগতে পারে। পানির ওপর ভেসে ওঠে সবুজ বা নীলচে শৈবালের স্তর। কিন্তু এই সৌন্দর্যের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে বিপদ। যখন শৈবালগুলো মারা যায়, তখন সেগুলো সমুদ্রের তলায় গিয়ে জমা হয় এবং পচতে শুরু করে। এই পচন প্রক্রিয়ায় পানির অক্সিজেন দ্রুত শেষ হয়ে যায়। ফলে মাছ, ঝিনুক, কাঁকড়া ও অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণ শ্বাস নিতে না পেরে মারা পড়ে। ধীরে ধীরে পুরো অঞ্চল পরিণত হয় প্রাণহীন ‘ডেড জোনে’।
সমুদ্র গবেষক মেরি হেলেন মিলার বার্ক বলেছেন, ‘আগে এই মৃত অঞ্চলগুলো গভীর সমুদ্রে দেখা যেত। এখন তা উপকূলের কাছেও চলে আসছে। কিছু জায়গায় সমুদ্রের তলায় সাদা এক ধরনের স্তর দেখা যায়, যাকে আমরা ‘কর্পস শিট’ বলি। এটি আসলে মৃত্যুর চাদর।’
তিনি আরও বলেছেন, ‘বাইরে থেকে সমুদ্রকে এখনও সুন্দরই লাগে। কিন্তু পানির নিচের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন।’
বিশেষজ্ঞদের তথ্য অনুযায়ী, বাল্টিক সাগরের প্রায় ৯৭ শতাংশ অঞ্চল কোনো না কোনোভাবে দূষণ ও অতিরিক্ত পুষ্টি উপাদানের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। ডেড জোনের বিস্তার কখনো কখনো পুরো ডেনমার্কের সমান এলাকা ছাড়িয়ে যায়।
জলবায়ু পরিবর্তন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। সমুদ্রের পানির তাপমাত্রা বাড়ছে, অক্সিজেনের পরিমাণ কমছে, জীববৈচিত্র্য হারিয়ে যাচ্ছে
বাল্টিক সাগরের ভৌগোলিক অবস্থানও এই সংকটকে আরও ভয়াবহ করেছে। এটি প্রায় বন্ধ ধরনের একটি সমুদ্র, যার সঙ্গে উত্তর সাগরের সংযোগ খুব সীমিত। ফলে দূষিত পানি সহজে বের হতে পারে না। অনেক সময় একটি পানির স্তর ৩০ বছর পর্যন্ত এই সাগরে আটকে থাকে।
তার ওপর এই অঞ্চলে প্রায় ৯ কোটি মানুষের বসবাস। অসংখ্য নদী এসে মিশছে এই সাগরে। প্রতিদিন হাজার হাজার জাহাজ চলাচল করছে এখানে। ফলে দূষণের চাপ ক্রমাগত বাড়ছে।
পরিবেশবিদরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। সমুদ্রের পানির তাপমাত্রা বাড়ছে, অক্সিজেনের পরিমাণ কমছে, জীববৈচিত্র্য হারিয়ে যাচ্ছে।
এ ছাড়া সমুদ্রের তলায় এখনো পড়ে আছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের হাজার হাজার টন গোলাবারুদ ও রাসায়নিক অস্ত্র। প্লাস্টিক বর্জ্য, ওষুধের রাসায়নিক এবং শিল্পদূষণও বাড়িয়ে তুলছে ঝুঁকি।
এর মধ্যেই নতুন আতঙ্ক হয়ে উঠেছে রাশিয়ার তথাকথিত ‘ঘোস্ট ফ্লিট’। ইউক্রেন যুদ্ধের পর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এড়াতে পুরনো ও ঝুঁকিপূর্ণ জাহাজে তেল পরিবহন বাড়িয়েছে রাশিয়া। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এসব জাহাজ থেকে বড় ধরনের তেল দূষণ ঘটলে বাল্টিক সাগরের ভঙ্গুর পরিবেশ আরও ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। তবু লড়াই থেমে নেই।
বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠন কৃষকদের সঙ্গে কাজ করছে যাতে কম রাসায়নিক সার ব্যবহার করা হয়। নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে সমুদ্রের তলদেশে অক্সিজেন ফিরিয়ে আনার চেষ্টাও চলছে। মানুষকে সচেতন করতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
কিছু সাফল্যও এসেছে। গত কয়েক দশকে তেল দূষণের ঘটনা কমেছে উল্লেখযোগ্যভাবে। বিভিন্ন দেশের সমন্বিত উদ্যোগে দূষণের কিছু উৎস নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছে।
তবু বড় প্রশ্ন রয়ে গেছে— সময় কি এখনো হাতে আছে?
তথ্যসূত্র: বিবিসি, রয়টার্স











