ফেডারেশনের অনুদান নিয়ে প্রশ্ন, প্রতিমন্ত্রীকে চিঠি মামুনুর রশীদের

মামুনুর রশীদ—ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের নেতৃত্বের বৈধতা, সাংগঠনিক সংকট এবং সরকারি অনুদান বণ্টনে স্বচ্ছতার দাবি জানিয়েছেন নাট্যব্যক্তিত্ব ও ফেডারেশনের সাবেক চেয়ারম্যান মামুনুর রশীদ। এ বিষয়ে তিনি সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়মকে চিঠি দিয়েছেন। গত ২৫ জুন দেওয়া ওই চিঠির একটি কপি দেখেছে আগামীর সময়।
চিঠিতে মামুনুর রশীদ অভিযোগ করেন, ফেডারেশনের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া উপেক্ষা করে একটি পক্ষ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ফলে সংগঠনের বর্তমান নেতৃত্বের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে ফেডারেশনকে দেওয়া ১২ লাখ ৭৫ হাজার টাকার সরকারি অনুদানের গ্রহণ, ব্যবস্থাপনা ও ব্যয়ে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
একই সঙ্গে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের মধ্যে অনুদান বণ্টনে অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত এবং বরাদ্দ পুনর্মূল্যায়নের দাবিও জানান।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম চিঠির বিষয়টি নিশ্চিত করে আগামীর সময়কে বললেন, ‘আমরা তো সদ্য দায়িত্ব নিয়েছি। অনুদান প্রক্রিয়ার যে অসঙ্গতি নিয়ে কথা হচ্ছে, সেগুলো আমরা পর্যালোচনা করব।’
ফেডারেশনে অস্থিরতার শুরু যেভাবে
২০২২ সালের ২২ জানুয়ারি গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের প্রচার সম্পাদক মাসুদ আলম বাবুর স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ‘আর্থিক অনিয়ম, দুর্নীতি, অর্থ আত্মসাৎ ও সাংগঠনিক স্বেচ্ছাচারিতার দায়ে’ সাধারণ সম্পাদক কামাল বায়েজীদ ও অর্থ সম্পাদক রফিকুল্লাহ সেলিমকে অব্যাহতি দেওয়ার কথা জানানো হয়।
এরপর সংবাদ সম্মেলন করে কামাল বায়েজীদ তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বললেন, ‘সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে কাউকে অব্যাহতি দেওয়া ‘অগণতান্ত্রিক’। সেসময় তিনি দাবি করেন, ‘ফেডারেশনের সভাপতি লিয়াকত আলী লাকীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের প্রতিবাদ করায় আমাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।’
এই ঘটনার পর নাট্যকর্মীদের উদ্দেশে একটি খোলা চিঠি লেখেন ফেডারেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি রামেন্দু মজুমদার।
থিয়েটারবিষয়ক পত্রিকা ক্ষ্যাপা–র ফেসবুক পেজে প্রকাশিত ওই চিঠিতে তিনি বলেছেন, ‘বর্তমানে ফেডারেশনের কর্তাব্যক্তিদের এই বিরোধ জনসমক্ষে নাট্যকর্মীদের ভাবমূর্তিকে চরমভাবে কালিমালিপ্ত করেছে। এর দায় নাট্যকর্মীরা কেন নেবেন? তারা সুন্দর পরিবেশে নাটক করতে চান, নোংরা রাজনীতি চান না।’
তিনি অনির্দিষ্টকালের জন্য ফেডারেশনের কর্মকাণ্ড এবং ব্যাংক হিসাব স্থগিত করারও পরামর্শ দেন।
তবে তার এ আহ্বানকে গুরুত্ব না দিয়ে ফেডারেশনের তৎকালীন নেতৃত্বের অনুসারীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার সমালোচনা করেন। ফেডারেশনের পক্ষ থেকে তখন দাবি করা হয়, সংগঠনটি গঠনতন্ত্র অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে।
চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানের পর লিয়াকত আলী লাকীকে আর প্রকাশ্যে দেখা না যাওয়ায় ফেডারেশনের কার্যক্রমে অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়।
প্রতিমন্ত্রীকে যা লিখেছেন মামুনুর রশীদ
চিঠিতে মামুনুর রশীদ লিখেছেন, দীর্ঘদিন ধরে ফেডারেশনের অভ্যন্তরে বিভিন্ন সাংগঠনিক অনিয়ম, মতবিরোধ ও নেতৃত্ব-সংক্রান্ত সংকট ক্রমশ জটিল আকার ধারণ করে আসছিল। এই পরিস্থিতির সমাধান ও সংগঠনের স্বাভাবিক কার্যক্রম পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে ২০২৪ সালের ১ নভেম্বর তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত সভাপতি লাকি ইনাম একটি সভার আহ্বান করেন।
ওই সভায় ১৮৪ জন সক্রিয় সদস্যের উপস্থিতিতে সর্বসম্মতিক্রমে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট একটি আহ্বায়ক কমিটি গঠিত হয়। যার আহ্বায়কের দায়িত্ব আমাকে (মামুনুর রশীদ) দেওয়া হয়। কমিটির অন্য সদস্যরা ছিলেন নাট্যজন মলয় ভৌমিক, আহমেদ ইকবাল হায়দার, নাদের চৌধুরী এবং নাজনীন হাসান চুমকী।
এই কমিটির দায়িত্ব ছিল সক্রিয় সদস্যপদ যাচাই-বাছাই সম্পন্ন করে একটি স্বচ্ছ, অংশগ্রহণমূলক ও গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা। আমরা সেই লক্ষ্যে কাজও শুরু করেছিলাম।
চিঠিতে আরও বলা হয়, কিন্তু অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করি, ফেডারেশনের সাংগঠনিক প্রক্রিয়া ও গৃহীত সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে কামাল বায়েজীদ এবং তার সহযোগীরা পৃথকভাবে কার্যক্রম পরিচালনার উদ্যোগ নেন। বিষয়টি শুধু আহ্বায়ক কমিটির কার্যক্রমকেই বাধাগ্রস্ত করেনি, বরং সংগঠনের সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
ওই পরিস্থিতিতে আহ্বায়ক কমিটির সদস্যরা নিজেদের দায়িত্ব থেকে সাময়িক অব্যাহতি নিতে বাধ্য হন। এরপর থেকে ফেডারেশনের কার্যক্রম পরিচালনার বৈধতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
এমন বাস্তবতায় গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনকে সরকারি অনুদান দেওয়ার বিষয়েও প্রশ্ন তোলেন মামুনুর রশীদ।
তিনি লিখেছেন, ‘সম্প্রতি জেনেছি, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ‘সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানকে অনুদান’ কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনকে ১২ লাখ ৭৫ হাজার টাকা অনুদান দেওয়া হয়েছে।
আমরা মনে করি, এই অর্থ কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নয়। এটি দেশের গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত সব নাট্যদলের যৌথ সম্পদ এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বিকাশের জন্য রাষ্ট্রের সহায়তা।
এমতাবস্থায় ফেডারেশনের নেতৃত্ব ও কার্যক্রমের বৈধতা নিয়ে যখন প্রশ্ন বিদ্যমান, তখন এই অর্থের গ্রহণ, ব্যবস্থাপনা ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং সাংগঠনিক বৈধতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায় এই অনুদানের যথাযথ ব্যবহার নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে বিভ্রান্তি ও উদ্বেগ সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক।
ফেডারেশনের মাধ্যমে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের মধ্যে অনুদান বণ্টনের ক্ষেত্রেও নানা অসঙ্গতির অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
চিঠিতে বলা হয়, অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে নিষ্ক্রিয় থাকা কিছু সংগঠন অনুদান পেয়েছে। অন্যদিকে নিয়মিত ও সক্রিয় অনেক সংগঠন তুলনামূলকভাবে কম বরাদ্দ পেয়েছে।
বরাদ্দ প্রদানের ক্ষেত্রে কী মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়েছে এবং তা কতটা ন্যায়সংগত ও স্বচ্ছ ছিল, সে বিষয়েও প্রশ্ন উঠেছে। আমরা বিশ্বাস করি, রাষ্ট্রীয় অনুদান বণ্টনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা এবং কার্যকর সাংস্কৃতিক অবদানের মূল্যায়ন নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এ বিষয়ে কামাল বায়েজীদের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি আগামীর সময়কে বললেন, ‘চিঠির বিষয়টি পুরোপুরি না জেনে এখনই কোনো মন্তব্য করব না।’




