মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন
লোকগানের অমর সাধক, ফোকলোরের পথিকৃৎ

মুহম্মদ মনসুরউদ্দিন (৩১ জানুয়ারি ১৯০৪ – ১৯ সেপ্টেম্বর ১৯৮৭)
বাংলা লোকসংস্কৃতির আকাশে যে কজন নক্ষত্র চিরভাস্বর হয়ে আছেন, মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন তাদের অন্যতম। তিনি নিজের সমগ্র জীবন উৎসর্গ করেছিলেন গ্রামবাংলার অজ্ঞাত, অবহেলিত ও লাঞ্ছিত মানুষের সাংস্কৃতিক সম্পদ উদ্ধারের দুঃসাধ্য ব্রতে। তিনি এগিয়ে না এলে হয়তো হারিয়ে যেত বাংলাদেশের বহু উপাখ্যান, গান, গীতি, শব্দ, ভাব ও ব্যঞ্জনা। আক্ষরিক অর্থেই তিনি ছিলেন ‘মাটির কাছাকাছি’। লোকজীবনের সঙ্গে তার ছিল প্রাণের যোগ। তার অর্জন ও সিদ্ধি এই মাটি আর মানুষকে অবলম্বন করেই রচিত।
১৯০৪ সালের ৩১ জানুয়ারি পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার মুরারিপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন। পিতা জায়দার আলী ছিলেন নিম্নবিত্ত কৃষক, মা জিউয়ারুন নেসা। গ্রামীণ আবহেই তার বেড়ে ওঠা। শৈশবেই তিনি লক্ষ্য করেছিলেন, সাধারণ মানুষ কাজের ফাঁকে, কৃষিকাজে কিংবা উৎসব-আনন্দে গান গেয়ে জীবনকে সহজ করে নিচ্ছে। এই গানগুলোই তাকে টেনে নেয় গবেষণার জগতে। নানাজনের, বিশেষ করে জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের সহায়তা ও আনুকূল্যে তার কাজের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়।
শিক্ষাজীবনে তিনি ছিলেন অসাধারণ মেধাবী। স্থানীয় খলিলপুর উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয় থেকে ১৯২১ সালে প্রথম বিভাগে প্রবেশিকা পাস করেন। পাবনা এডওয়ার্ড কলেজ থেকে আইএসসি এবং রাজশাহী সরকারি কলেজ থেকে বিএ পাসের পর ১৯২৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইন্ডিয়ান ভার্নাকুলার্সে প্রথম শ্রেণিতে তৃতীয় স্থান অধিকার করে এমএ পাস করেন। তার আগে আর কোনো মুসলিম ছাত্র এ বিষয়ে প্রথম শ্রেণি অর্জন করেননি। এই কৃতিত্ব নিঃসন্দেহে ঐতিহাসিক।
লোকসাহিত্য সংগ্রহে তার আত্মনিবেদন ঘটে ‘প্রবাসী’ পত্রিকা পাঠের মধ্য দিয়ে। কলকাতা থেকে প্রকাশিত এই পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সংগৃহীত লালনের গান ছাপা হয়, যা কিশোর মনসুরউদ্দীনকে গভীরভাবে উদ্বুদ্ধ করে। মাত্র দশম শ্রেণিতে পড়ার সময় তিনি লোকসাহিত্য সংগ্রহের কাজ শুরু করেন। নিজ গ্রাম মুরারিপুরের প্রেমদাস বৈরাগীর কাছ থেকে সংগ্রহ করেন লালনের একটি গান, ‘বাঁকির কাগজ মন তোর গেল হুজুরে’। গানটি তিনি পাঠিয়ে দেন ‘প্রবাসী’তে, যা ছাপা হয় ১৩৩০ সালের আশ্বিন সংখ্যায়। এটিই ছিল মনসুরউদ্দীনের প্রথম প্রকাশিত লোকগান। সৌভাগ্যের বিষয়, সেটি ছিল লালনের পদ। সেখান থেকেই লোকসাহিত্য সংগ্রাহক হিসেবে তার যাত্রা শুরু।
কর্মজীবনে তিনি ছিলেন একনিষ্ঠ শিক্ষক। ১৯২৯ সালে সহকারী স্কুল পরিদর্শক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করে বিভিন্ন কলেজে অধ্যাপনা করেন। ঢাকা ইসলামিক ইন্টারমিডিয়েট কলেজ, চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ, রাজশাহী কলেজ, হুগলী মোহসিন কলেজ, সিলেটের মুরারীচাঁদ কলেজসহ বহু প্রতিষ্ঠানে তিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫২ সালে সরকারি মাসিক পত্রিকা ‘মাহে নও’-এর সম্পাদক ছিলেন। সেখানে দায়িত্ব পালনকালে সরকার বাংলার বর্ণমালা পরিবর্তনের যে পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিল, তার বিরোধিতা করে তিনি সরকারের বিরাগভাজন হন। পাকিস্তান সরকার বেতার ও টেলিভিশনে রবীন্দ্রসংগীত প্রচার বন্ধের যে পদক্ষেপ নিয়েছিল, তার বিরুদ্ধেও তিনি সোচ্চার প্রতিবাদ জানান। ১৯৫৯ সালে ঢাকা কলেজ থেকে অবসর গ্রহণ করেন।
লোকসংগীত সংগ্রহে তার সবচেয়ে বড় কীর্তি ‘হারামণি’। ত্রয়োদশ খণ্ডে সমাপ্ত এই সংকলন বাংলা লোকগীতিকে বৈজ্ঞানিকভাবে নথিবদ্ধ করার এক বিরল উদ্যোগ। তিনি লিখেছেন, ‘বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে যে পল্লী-গানের কত অসংখ্য মণিমুক্তা লুক্কায়িত রহিয়াছে তাহা বলিয়া শেষ করা যায় না। গত ষাট বৎসর ধরিয়া এই পল্লী-গানের সন্ধানে ঘুরিয়াছি, ছাত্রজীবনে ও সরকারি কর্মজীবনের ফুরসতে এবং অবসর জীবনে। তাহাতে এই দৃঢ় ধারণা জন্মিয়াছে যে আমাদের দেশ মহৎ এবং ইহার লোকসংগীত সমাচার বিশ্বে আদর পাইবার যোগ্য।’
অন্নদাশঙ্কর রায় ‘হারামণি’কে বাউল ও লোকগানের ‘পদকল্পতরু’ আখ্যা দিয়েছেন। আচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ‘হারামণি’কে ‘সংহিতা পুস্তক’স্বরূপ ‘মহাগ্রন্থ’ বলে অভিহিত করেছেন।
মনসুরউদ্দীনের সঙ্গে অন্নদাশঙ্কর রায়ের প্রথম সাক্ষাৎ ও আলাপ ১৯৩১ সালে রাজশাহী জেলার মহকুমা শহর নওগাঁয়। অন্নদাশঙ্কর সেখানে ছিলেন মহকুমা শাসক, আর মনসুরউদ্দীন স্কুল সাব-ইন্সপেক্টর। তাদের আলাপ ও ঘনিষ্ঠতার মূলে ছিল লোকসংস্কৃতি। সম্পর্কের সূচনা হয় মনসুরউদ্দীনের তরফ থেকে তার সংকলিত ও সম্পাদিত লোকগীতিসংগ্রহ ‘হারামণি’ (১৩৩৭) উপহার দেওয়ার মাধ্যমে। পরে ‘হারামণি’র অষ্টম খণ্ড (১৩৮৩) অন্নদাশঙ্কর ও লীলা রায়ের নামে উৎসর্গের মধ্য দিয়ে সেই সম্পর্ক পূর্ণতা পায়। প্রতিদানে অন্নদাশঙ্করও মনসুরউদ্দীনকে তার বই ‘লালন ও তার গান’ (১৩৮৫) উৎসর্গ করেন।
অন্নদাশঙ্করের সৌজন্যেই মনসুরউদ্দীনের দেখা হয় ডক্টর আরনল্ড বাকের সঙ্গে। ডক্টর বাকে বাংলা মুলুক ঘুরে ঘুরে নানা ধরনের লোকগান যন্ত্রে ধারণের উদ্যোগ নেন। নওগাঁতেও অন্নদাশঙ্করের সহায়তায় তিনি বাউল-ফকিরদের বেশ কিছু গান ফোনোগ্রামে রেকর্ড করেন। এই আসরে মনসুরউদ্দীনও উপস্থিত ছিলেন। তিনি গানগুলো টুকে নেন এবং তা ‘হারামণি’র দ্বিতীয় খণ্ডে অন্তর্ভুক্ত হয়।
বাউল-ফকিরদের সঙ্গে মিশে যাওয়ার অনন্য ক্ষমতা ছিল মুহম্মদ মনসুরউদ্দীনের। গ্রামবাংলার আমজনতার সঙ্গে একাত্ম হতে, ছোট-বড় সবার মন হরণ করতে তার তুলনা মেলা ভার। শুধু গ্রামীণ মানুষ নয়, শহুরে মানুষ কিংবা বিদ্বজ্জন, সবার সঙ্গে মিশে যেতে পারার ঈর্ষণীয় প্রতিভা ছিল তার।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আশীর্বাণী ও সহযোগিতায় ধন্য হয়েছিলেন তিনি। ‘হারামণি’র ভূমিকায় রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন মহাশয় বাউল সংগীত সংগ্রহ করে প্রকাশ করবার যে উদ্যোগ করেছেন, আমি তার অভিনন্দন করি।’ জীবনের সায়াহ্নবেলায় আরেকবার লিখেছিলেন, ‘তোমার গ্রাম্য গীতি সংগ্রহের অধ্যবসায় সফলতা লাভ করুক এই আমি কামনা করি।’
‘হারামণি’র প্রথম খণ্ড হাতে পেয়ে উচ্ছ্বসিত নজরুল বলেছিলেন, ‘এ গানে বাংলার স্নেহসিঞ্চিত ভেজা মাটির গন্ধ, বাংলার নিরক্ষর পল্লীকবির অনাড়ম্বর প্রকাশ-স্বচ্ছতা, নিরাবিল প্রাণ, নিস্তরঙ্গ স্তব্ধতা; এ তো কোলাহলমুখর জলসার জন্য নয়।’
প্রখ্যাত লোকগবেষক আবুল আহসান চৌধুরী ‘কালি ও কলম’-এ এক নিবন্ধে লিখেছেন, ‘মনসুরউদ্দীনের সঙ্গে আলাপের সুযোগ এলো ১৯৬৯ সালে, ছেঁউড়িয়ায় লালন-স্মরণোৎসবে। ছেলেবেলা থেকেই বাউল-ফকিরদের গানের প্রতি টান ছিল। একটু বড়ো হলে এখানে-সেখানে ঘুরে কিছু গান সংগ্রহ করেছিলাম, নেহাতই শখের বশে। তার সামনে মেলে ধরলাম গানের সেই খেয়াল-খাতা। একটু উলটে-পালটে দেখে তারপর রহস্য করে বললেন, ‘ভালোই তো, তবে কিনা জানিস, এ তো সব গুরুমুখী বিদ্যেরে, গুরু র্ধ, অমনি অমনি কী হয়! আর হ্যাঁ, গুরুদক্ষিণার কথা ভুলিসনে যেন।’ মনে মনে সেইদিনই গুরুপদে দীক্ষা নিলাম, ‘গুরু দোহাই তোমার মনকে আমার লওগো সুপথে।’ মামুলি দু-চার কথা, কিন্তু তাতেই আপন করে নিলেন। আর সেইসঙ্গে ধরিয়ে দিলেন নেশা।’
আবুল আহসান চৌধুরী আরও লিখেছেন, ‘ধীরে ধীরে পরিচয় গাঢ় হয়, তার একান্ত সাহচর্যে আসি, একেবারে কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য হয় যখন আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। এই পরিচয় শেষ পর্যন্ত পারিবারিক সম্পর্কে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। আমি থাকতাম মাতুল জাতীয় অধ্যাপক ডক্টর কাজী মোতাহার হোসেনের ১১৩ সেগুনবাগিচার বাড়িতে। মোতাহার হোসেনের সঙ্গে মনসুরউদ্দীনের বিশেষ অন্তরঙ্গতা ছিল। দুই বৃদ্ধকে রসের ভিয়েন দিয়ে সব গল্পসল্প করতে শুনেছি।’
পরে কাজী মোতাহার হোসেনকে দিয়ে ফকির লালন সাঁই সম্পর্কে একটি প্রবন্ধ লেখানোর প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ‘সেখান থেকেই জানতে পারি, মনসুরউদ্দীনের বাড়িতে নানা গল্পে আসর জমে উঠত। চায়ে চুমুক দিয়ে আয়েশ করে গড়গড়ায় টান দিতেন, গল্প করতে করতে বাংলার মানচিত্রের প্রায় সবটুকুই স্পর্শ করা হয়ে যেত তার, চলে যেতেন ফেলে আসা দিনগুলোতে। লালনের গানের কলি মাঝেমধ্যে উচ্চারিত হতো তার কণ্ঠে। জ্ঞানদাস বাঘেলির একটি কবিতাও তার খুব প্রিয় ছিল, প্রায়ই আওড়াতেন।’
মনসুরউদ্দীনের স্নেহ-ভালোবাসার কথা স্মরণ করে আবুল আহসান চৌধুরী লিখেছেন, ‘আমার কত তুচ্ছ কাজের প্রশংসা করেছেন, প্রেরণা দিয়েছেন, আজ সেসব কথা ভাবলে চোখটা ভিজে আসে। নানা ভাবে তিনি পণ্ডিতজনকে আমার প্রতি মনোযোগী করে তুলতে চেয়েছিলেন। তার শিক্ষক আচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ঢাকায় এলে মনসুরউদ্দীন একদিন তাকে প্রাতরাশের নেমন্তন্ন করেন। সেই চা-নাশতার আসরে উপস্থিত ছিলেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, ডক্টর মুহম্মদ এনামুল হক, ডক্টর নীলিমা ইব্রাহিম, অধ্যাপক কবীর চৌধুরী এবং আরও কেউ কেউ। স্নেহবশত আমাকেও তিনি এই মজলিশে ডেকেছিলেন।’
আবুল আহসান চৌধুরীর লেখা থেকে জানা যায়, ‘মনসুরউদ্দীন ছিলেন তারুণ্যের প্রতীক। তরুণদের প্রতি তার প্রীতি ও প্রেরণা ছিল অপরিসীম। দেখেছি তিনি কী তীব্রভাবে তরুণদের আকর্ষণ করতেন, আপন করে নিতেন, আপন হতেন। একধরনের তারুণ্যের ঝলক বৃদ্ধ বয়সেও তাকে অধিকার করে রেখেছিল। কপট গাম্ভীর্য, পোশাকি অহমিকা আর বয়সের সংস্কার থেকে মুক্ত ছিলেন তিনি।’
১৯৮৫ সালের মার্চে কুষ্টিয়ায় মনসুরউদ্দীনের সঙ্গে কাটানো একটি দিনের স্মৃতিচারণা করে আবুল আহসান চৌধুরী লিখেছেন, ‘তিনি ছিলেন বিটিসির রেস্টহাউসে। লালন-স্মরণোৎসব উপলক্ষে ঢাকা থেকে এসেছিলেন বিটিসির করপোরেট রিলেশনস ম্যানেজার রুহুল আমিন মজুমদার। তিনি বিটিসির তরফ থেকে মনসুরউদ্দীনকে সদ্য বাজারে আসা এক কার্টন মাইল্ড গোল্ড লিফ সিগারেট উপহার দেন। একটু রহস্য করে আমি বললাম, ‘লোকসংস্কৃতির স্বার্থে এই বিজাতীয় তাম্রকূট ত্যাগ করাই ভালো, নইলে ধূমপানের লোক-উপকরণ হুঁকাকে যে অবহেলা করা হয়। এগুলো বরঞ্চ বিলিয়ে দিলেই ভালো হয়।’ ধমকে উঠলেন তিনি, তারপর সিগারেটের কার্টনটা তার মেয়ে ঊষাকে দিয়ে বললেন, ‘শিগগির ব্যাগে তুলে রাখ, চৌধুরীর পো-র নজর খারাপ।’’
তিনি আরও লিখেছেন, ‘বিকেলে লালনের আখড়ায় বেড়াতে গেছেন, চারদিক ঘুরেফিরে এসে শ্রান্ত হয়ে বসলেন এক জায়গায়। একসময় ছোট মেয়ে পুষুকে ডেকে তার হাতে দু-প্যাকেট সিগারেট গুঁজে ইশারায় আমাকে আর পাশে থাকা ভেড়ামারার ফকির আজিম শাহকে দেখিয়ে দিয়ে তারপর মুখ ফিরিয়ে নিলেন। গুরুর প্রসন্ন প্রসাদ পেয়ে ধন্য হলাম।’
মনসুরউদ্দীন আক্ষরিক অর্থেই ছিলেন সহজ-সরল। পোশাকি আভিজাত্য বা ছদ্ম-কপটতা ছিল না তার। ‘আমি চাষার ছেলে, গরিব ঘরে জন্ম আমার’ ধরনের অসংকোচ সত্য-প্রকাশে অভ্যস্ত ছিলেন। থেলো হুঁকোয় তামাক খেতে তার কুণ্ঠা ছিল না, তেমনি বাউল-ফকিরের মাজার, আখড়া কিংবা বাড়িতে রাত্রিযাপনেও স্বাচ্ছন্দ্যের অভাব হয়নি। বাউলগান সংগ্রহের লোভে হুডুম-নাড়ুর জিয়াফত খেতে দুই-চার ক্রোশ পথ হেঁটে ভিনগাঁয়ে চলে গেছেন।
মৃত্যুর কয়েক মাস আগে কলকাতায় গিয়েছিলেন সম্মানসূচক ডিলিট নিতে। খালি হাতে যান কী করে! গুরু সুনীতিকুমার আছেন, বয়স্য অন্নদাশঙ্কর আছেন, আছেন আরও সব বন্ধুজন। কিছু তো একটা নিয়ে যেতে হয়! শেষ পর্যন্ত বেছে বেছে নিয়ে গেলেন বাজারের সেরা পদ্মার ইলিশ। কুটুমবাড়ি কি খালি হাতে যাওয়া চলে! এই হলেন মনসুরউদ্দীন।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরপরই কুষ্টিয়ায় লালন-উৎসবে এসেছেন তিনি। উঠেছেন সার্কিট হাউসে। সকালে ডেকে বললেন, ‘গন্ধভাদাল চেনো? খেয়েছো কখনো? ওর পাতার অনেক গুণ, সর্দি-কাশিতে ভালো কাজ দেয়। জলদি যাও, গন্ধভাদালের পাতা জোগাড় করে আনো, বাবুর্চিকে বলবে বড়া ভাজতে, দুপুরে গরম গরম খাবো।’
বহু কষ্টে বন-বাদাড় ঘুরে গন্ধভাদাল জোগাড় হলো। খুশি হয়ে ‘বাহ্, খুব খলিফা ছেলে দেখছি’ বলে পিঠ চাপড়ে সাবাসি দিলেন। সেই গন্ধভাদালের পাতা ঢাকায় নিয়ে গিয়ে বিদেশের কোনো এক গবেষণাপ্রতিষ্ঠানে পাঠিয়ে দেন এর গুণবিচারের জন্য।
মনসুরউদ্দীন ছিলেন বাউলপ্রাণ, বাউলপ্রেমিক। বাউলদের সঙ্গে তার ছিল সহজ সম্পর্ক, আত্মার বন্ধন। ছেঁউড়িয়ার লালন আখড়ায় বাউলদের দেখেছি গড় হয়ে তাকে ‘ভক্তি’ দিতে। ঢাকায় তার বাড়িতে ছিল বাউলদের অনায়াস প্রবেশাধিকার। তিনি ছিলেন বাউলদের পরমাত্মীয়।
মনসুরউদ্দীন যশোরের ঝিকরগাছার নামকরা বাউলগায়ক কানাই খ্যাপার গান খুবই পছন্দ করতেন। কুষ্টিয়ায় এলেই জিজ্ঞেস করতেন, ‘খ্যাপা এসেছে নাকি?’
লালনের সুবাদে কুষ্টিয়ার সঙ্গে তার একটি আত্মিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। বহুবার এসেছেন এখানে। অশক্ত শরীর নিয়ে শেষবারের মতো আসেন ১৯৮৫ সালের মার্চে লালন-স্মরণোৎসবে। এখানে বসে ৬ মার্চ দুপুরে আমি প্রায় দু-ঘণ্টা ধরে ক্যাসেট রেকর্ডারে তার সাক্ষাৎকার গ্রহণ করি। এই সাক্ষাৎকারে তিনি ব্যক্তিগত প্রসঙ্গের পাশাপাশি সাহিত্য, রাজনীতি ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অনেক কথা বলেন।
দেশ তখন স্বৈর-সামরিক শাসনের কবলে। দেশ, সরকার, জনগণ ও রাজনীতি নিয়ে তিনি দ্বিধাহীনচিত্তে বলেছিলেন, ‘এঁরা যাঁরা দেশ শাসন করেন, তারা সব একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ, কোনো পরিবর্তন নেই। তো একমাত্র কথা হচ্ছে, আমাদের দেশে প্রত্যেকেই যদি, শিক্ষিত কিংবা অশিক্ষিত, দেশকে ভালোবাসে, তাহলেই দেশের মঙ্গল সাধিত হবে।’
মনসুরউদ্দীন ছিলেন এক বিশুদ্ধ বাঙালি, যাঁর ‘হারামণি’ নামের শিল্পদর্পণে শাশ্বত স্বদেশের ছবি বিম্বিত। চিরকালই তিনি ছিলেন মুক্তবুদ্ধির মানুষ। যুক্ত ছিলেন শিখাগোষ্ঠীর বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের সঙ্গে। রাষ্ট্রীয় অন্যায়-অনাচার, সামাজিক অবক্ষয় ও দুর্নীতি, গণতন্ত্রের সমস্যা ও সংকট, ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিরুদ্ধে আগ্রাসন, এসব বিষয়ে তিনি ছিলেন সচেতন ও প্রতিবাদী।
মনসুরউদ্দীন ছিলেন এক বাউলের নাম, বেশভূষা ও চিন্তা-চেতনায় তাদেরই সমধর্মী। বাউলদের মতো তিনিও ছিলেন অসাম্প্রদায়িক, মানবমনস্ক ও সমন্বয়পন্থী।
মনসুরউদ্দীন ছিলেন বাঙালির মূলধারার সংস্কৃতিচর্চার প্রধান সাধক। এ দেশে লোকজ সংস্কৃতির চর্চায় তিনিই পথিকৃৎ। তবে তার যথার্থ মূল্যায়ন ও সমাদর এখানে হয়েছে, এমন কথা বলা যায় না। তা হয়েছে ভিনদেশে। এ আমাদের লজ্জা ও অগৌরবের বিষয়।
এ প্রসঙ্গে মনসুরউদ্দীনের গুণী ছাত্র ডক্টর আহমদ শরীফ না বলে পারেননি, ‘এ সেদিন রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় তার কীর্তির স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে সর্বোচ্চ ডি-লিট উপাধি দিয়ে সম্মানিত করেছে। এতে বাংলাদেশি হিসেবে আমাদের গৌরব ও গর্ব অনুভব করা স্বাভাবিক। কিন্তু ক্ষোভ ও লজ্জার বিষয় এই যে, আমরা ঘরের গুরুকে, সমাজের ও সাহিত্যের কৃতী পুরুষকে আদর-কদর করিনি, দিইনি তাকে তার প্রাপ্য মর্যাদা ও সম্মান।’
তিনি ছিলেন সহজ মানুষের উপাসক। লালন সাঁইয়ের সেই অমর পঙ্ক্তি, ‘সহজ মানুষ ভজে দেখনা রে মন দিব্যজ্ঞানে, পাবি রে অমূল্য নিধি বর্তমানে’, যেন তার জীবনদর্শনেরই প্রতিচ্ছবি। সহজ মানুষকে আরাধনা করে তিনি নিজেই হয়ে উঠেছিলেন সহজ মানুষের মূর্ত প্রতীক। তাই খুঁজে পেয়েছিলেন সহজ মানুষদের, যাঁদের ভজে সিঞ্চন করেছেন লোকসাহিত্যের অমূল্য নিধি ‘হারামণি’।
আসাদ চৌধুরী তাকে নিয়ে লিখেছেন, ‘যে-গভীর সত্যবাণী নিরক্ষর গীতিকার কবিদের ঠোঁটে ঠোঁটে কেঁদে উঠেছিল, তাকে তুমি ছড়ালে নিখিলে।’
আজ যখন আধুনিকতা ও প্রযুক্তি আমাদের গ্রামীণ সংস্কৃতিকে দ্রুত বদলে দিচ্ছে, তখন মনসুরউদ্দীনের কাজ নতুন করে মনে করিয়ে দেয়, আমাদের শেকড়ের সঙ্গে সংযোগ কতটা জরুরি। তিনি প্রমাণ করেছিলেন, লোকগান শুধু মাটির মানুষের কণ্ঠে নয়, তা এক জাতির চেতনারও প্রতিচ্ছবি।
মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন মানে আমাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতি দায়বদ্ধতা নতুন করে উপলব্ধি করা। ঐতিহ্যের বহমান ধারা সাক্ষ্য দেয়, লোকসংস্কৃতির ক্ষয় থাকলেও লয় নেই। কাল থেকে কালান্তরে তা আশ্রয় পেয়ে যায় জনমানসপটে। তেমনি প্রায়-বিস্মৃত হয়েও মনসুরউদ্দীন বারবার গৃহীত হবেন, জেগে উঠবেন শেকড়সন্ধানী অস্তিত্বের টানে। এখানেই রয়ে গেছে নশ্বর মনসুরউদ্দীনের অবিনশ্বরতার জাদুরহস্য।









