টাঙ্গাইলের বস্ত্রবয়ন শিল্প

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বাংলাদেশের লোকশিল্প জগতে ময়মনসিংহ অঞ্চলের লোকশিল্পের বিশেষ স্বাতন্ত্র্য বিদ্যমান। আচার্য দীনেশ চন্দ্র সেন বলেছেন, ‘বঙ্গদেশ বস্ত্র বয়নশিল্পের জনমভূমি। বসরার যেমন গোলাপ, হিমালয়ের যেমন দেবদারু, বস্ত্রবয়ন শিল্প তেমন বঙ্গের নিজস্ব। এক্ষেত্রে বাঙ্গালীর প্রতিদ্বন্দ্বী নেই।’ কথাটি বাংলাদেশের ময়মনসিংহ অঞ্চলের বস্ত্রশিল্পের জন্য প্রযোজ্য। বাস্তবে, বস্ত্রবয়ন শিল্পে বাঙালির ঐতিহ্য তার প্রাপ্ত ইতিহাসের চেয়েও দীর্ঘ। যে সময়কার বাঙালির জাতীয় ইতিহাস এখনো আমাদের কাছে তিমিরাচ্ছন্ন, সে সময়ও তার বস্ত্রবয়ন শিল্পের খ্যাতি স্বদেশের সীমা অতিক্রম করে ইউরোপ পর্যন্ত বিস্তৃত। এ ছাড়া মধ্যযুগে অর্থাৎ মুসলমান আমলে বাংলাদেশের বস্ত্রশিল্পের বিকাশ এতই সমৃদ্ধি অর্জন করেছিল, তা সারা বিশ্বের বিস্ময় উৎপাদনে সমর্থ হয়েছিল। বাংলাদেশের সুমহান ঐতিহ্যমণ্ডিত বস্ত্রশিল্পে ময়মনসিংহ অঞ্চল বিশিষ্টতার দাবিদার। বাংলা লোকসাহিত্যে তার প্রমাণ মেলে।
বাংলা লোকসাহিত্যে মৈমনসিংহ গীতিকা এবং নারায়ণ দেবের পদ্মাপুরাণের সাক্ষ্যে জানা যায়, পূর্ব ময়মনসিংহে এক সময় শৌখিন সুন্দর পট্রবস্ত্র বিশেষ খ্যাতি এবং সম্মান লাভ করেছিল। আজও পূর্ব-ময়মনসিংহের গ্রামে ‘পাটের শাড়ি’ মানে শৌখিন এবং মূল্যবান শাড়ি।
ময়মনসিংহ অঞ্চলের লোকসাহিত্য ‘পদ্মাপুরাণে’ তার উল্লেখ আছে এভাবে:
‘লাল বর্ণ পাট শাড়ী নীলম্বরী আদি করি
শত বঞ্চ লহ বহুর্তর।’
আবার মৈমনসিংহ গীতিকায় উল্লিখিত মলুয়ার একটি বিবাহ প্রস্তাবে তার পিতার অসম্মতির কারণ— ‘পাটের শাড়ী পিন্দ্যা কন্যা সুখ নাহি পায়।/ হেন ঘরে কন্যা দিতে মন না জুয়ায়।’ মলুয়া নিদারুণ অর্থকষ্টে পতিত হয়ে—
‘হাতের বাজু বান্ধা দিয়া ভাদ্র মাস খায়।
পাটের শাড়ী বেইচ্যা মলুয়া আশ্বিন মাস খায়।’
দেওয়ান জাহাঙ্গীরও পাটের শাড়িতেই মলুয়াকে প্রলোভিত করতে চেয়েছেন—
‘দিল্লী হইতে আইন্যা দিবাম অগ্নিপাটের শাড়ী।
নাকের বেসর দিবাম তোমার কাঞ্চা সোনায় গড়ি।’
তাই অনেক উত্থানপতন আর ভাঙা-গড়ার মধ্য দিয়ে ময়মনসিংহের বস্ত্রবয়ন শিল্পের দীর্ঘ ঐতিহ্যের একটি ক্ষীয়মান ধারা বহন করে চলেছে আজও টাঙ্গাইলের তাঁতিরা। টাঙ্গাইল সম্পর্কে লোকসাহিত্যের একটি প্রবাদ আছে:
‘খাল বিল চর আর গজারীর বন।
টাঙ্গাইলের শাড়ী তার গরবের ধন।’
ময়মনসিংহের লোকায়তশিল্পের মধ্যে টাঙ্গাইলের শাড়ি সত্যিই ‘তার গরবের ধন।’ মাছ, ময়ূর, হাতি, শূকর, শঙ্খ, পদ্ম এবং নানা প্রকার আলপনা ও জ্যামিতিক চিত্রাঙ্কিত পাড়ে সুশোভিত সূত্র-মিহি টাঙ্গাইলের শাড়ি আজও ময়মনসিংহ অঞ্চলের মা-বোনদের অত্যন্ত প্রিয়। এখনো ময়মনসিংহের গ্রাম সমাজে কোনো বিয়েতে, যৌতুকে, উৎসবে-অনুষ্ঠানে টাঙ্গাইলের শাড়ি ছাড়া গৃহিণীদের মন ওঠে না। শুধু ময়মনসিংহে নয়, টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ি ও ধুতির খ্যাতি আছে বাংলাদেশের সর্বত্র।
আমাদের লোকসংস্কৃতির বলয়ে লোকায়ত বাংলার আয়নায় ময়মনসিংহ গীতিকায় বস্ত্রবয়ন শিল্প নিয়ে রচিত লোকসাহিত্য আমাদের লোকায়ত বাংলার সম্পদ ও সম্পত্তি। যাতে ভেসে ওঠে সজল সজীব বাংলাদেশের প্রতিকৃতি।



