প্রকাশ হলো ফেরদৌসী রহমানের আত্মজীবনী
- ‘লোকে বলে প্রেম আমি বলি জ্বালা’

ছবি: আগামীর সময়
বাংলা গানের কিংবদন্তি শিল্পী ফেরদৌসী রহমানের আত্মজীবনী ‘লোকে বলে প্রেম আমি বলি জ্বালা’-এর প্রকাশনা উৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রথমা থেকে প্রকাশিত বইটির মোড়ক উন্মোচন উপলক্ষে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রাজধানীর ধানমন্ডির বেঙ্গল শিল্পালয়ে আয়োজিত অনুষ্ঠানটি স্মৃতিচারণ, সংগীত পরিবেশনা ও শুভেচ্ছা বিনিময়ে মুখর হয়ে ওঠে।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন সংগীতশিল্পী সৈয়দ আব্দুল হাদী ও রুমানা মোর্শেদ কনকচাঁপা। নিজের অনুভূতি প্রকাশ করেন ফেরদৌসী রহমান। সংগীত পরিবেশন করেন অনুপমা মুক্তি।
আত্মজীবনী প্রসঙ্গে ফেরদৌসী রহমান বললেন, বইটি লেখা তার জন্য সহজ ছিল না। শুরুতে বাংলা ভাষায় লেখার আত্মবিশ্বাসও ছিল না। পরে দীর্ঘ সময় ধরে রেকর্ড করা কথোপকথন এবং শানু মুস্তাফিজের সহযোগিতায় বইটি সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছে। তিনি বলেছেন, অনেকেই তাকে আত্মজীবনী লেখার অনুরোধ করেছিলেন। বিশেষ করে তার বাবা চেয়েছিলেন তার সংগীতজীবনের নানা অজানা অধ্যায় সংরক্ষিত থাকুক। সেই অনুপ্রেরণাই শেষ পর্যন্ত তাকে বইটি লিখতে উৎসাহ জুগিয়েছে।
তার ভাষ্য, ‘নিজে বিশেষ কোনো কাজ করতে পেরেছি বলে মনে হয় না। তবে বইটিতে অনেক মানুষের কথা আছে, অনেক ঘটনার কথা আছে। বিশেষ করে পুরোনো দিনের ঢাকা কেমন ছিল, তখনকার পরিবেশ, খাদ্যসংস্কৃতি, কোথায় কী হতো, বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া নানা আচার-অনুষ্ঠানের কথাও রয়েছে। বইটি পড়তে পড়তে সেসব জানা যাবে।’
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, সংগীতশিল্পী ফাহমিদা নবী, ইয়াসমিন মুশতারী, অনিমা রায়, আলোকচিত্রী নাসির আলী মামুনসহ সংস্কৃতি অঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।
বইটির প্রকাশ-প্রক্রিয়ার পেছনের দীর্ঘ আট বছরের গল্প তুলে ধরেন কবির বকুল। তিনি জানান, ২০১৮ সালে প্রথমার প্রকাশক মতিউর রহমানের সঙ্গে ফেরদৌসী রহমানের বনানীর বাসভবনে প্রথম বৈঠক থেকেই আত্মজীবনী প্রকাশের উদ্যোগ শুরু হয়। এরপর করোনা মহামারি, শিল্পীর শারীরিক অসুস্থতা এবং পারিবারিক নানা শোকের মধ্য দিয়েও কাজ এগিয়ে চলে। লেখার পুরো প্রক্রিয়ায় শিল্পীর দীর্ঘ কথোপকথন রেকর্ড, লিপিবদ্ধ ও সম্পাদনায় সহযোগিতা করেন শানু মুস্তাফিজ।
কবির বকুল বলেছেন, এই বই কেবল একজন শিল্পীর ব্যক্তিগত জীবনকথা নয়, বাংলাদেশের সংগীতের ইতিহাসেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। তার ভাষায়, ‘এই গল্প হারিয়ে গেলে আমরা সংগীতের একটি যুগ হারিয়ে ফেলতাম।’
সৈয়দ আব্দুল হাদী স্মৃতিচারণ করে বলেন, ১৯৫৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই ফেরদৌসী রহমানের সঙ্গে তার পরিচয়। ১৯৬৫ সালে তাদের প্রথম দ্বৈত গান রেকর্ড হয়, যা তার সংগীতজীবনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
তিনি বললেন, উচ্চাঙ্গসংগীত, আধুনিক গান ও লোকসংগীত—সব ধারাতেই সমান দক্ষ শিল্পী উপমহাদেশে খুব কমই আছেন; ফেরদৌসী রহমান তাদের অন্যতম।
বইয়ের নাম প্রসঙ্গেও রসিকতা করেন সৈয়দ আব্দুল হাদী। তিনি যোগ করেন, বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে ফেরদৌসী রহমানের অসংখ্য অনুরাগী থাকলেও তার সংযত ব্যক্তিত্বের কারণে সবাই দূরত্ব বজায় রাখতেন। বইয়ের নামের সঙ্গে হয়তো সেই সময়ের কিছু স্মৃতিও জড়িয়ে আছে।
কনকচাঁপার মতে, একজন শিল্পীর সাধনার পাশাপাশি পড়াশোনারও প্রয়োজন রয়েছে, আর সেই শিক্ষার বড় একটি অংশ তিনি পেয়েছেন ফেরদৌসী রহমানের কাছ থেকে। তার ভাষায়, ‘ফেরদৌসী রহমান আমার কাছে যমুনা নদীর মতো—অবিরাম প্রবাহমান। তিনি আমাদের গানের যমুনা।’
অনুষ্ঠানে সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে প্রথম আলোর সম্পাদক ও প্রথমার প্রকাশক মতিউর রহমান জানান, ফেরদৌসী রহমান শুধু দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিল্পীই নন, তিনি ছিলেন একজন অসাধারণ মেধাবী শিক্ষার্থীও। প্রবেশিকা পরীক্ষায় তিনি মেয়েদের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করেছিলেন। পরে মাধ্যমিক পরীক্ষাতেও সেই কৃতিত্ব ধরে রাখেন। তিনি বলেছেন, আত্মজীবনীতে ফেরদৌসী রহমান তার পরিবার, উপমহাদেশের গুণী সংগীতজ্ঞ, পুরোনো ঢাকার পরিবেশ, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির নানা দিক অত্যন্ত আন্তরিকভাবে তুলে ধরেছেন।
তার মতে, ফেরদৌসী রহমান যেমন দেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতীকে পরিণত হয়েছেন, তেমনি তার এই আত্মজীবনীও বাংলাদেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতি চর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হয়ে থাকবে।




