Agamir Somoy E-Paper
সোমবার, ৫ অক্টোবর, ২০২৬
আগামীর সময়
শিশুদের সংগীত শিক্ষায় উয়েরার গুরুগৃহ
সোমবার, ৫ অক্টোবর, ২০২৬
আগামীর সময়
  • সর্বশেষ
  • জাতীয়
  • রাজনীতি
  • অর্থনীতি
  • চট্টগ্রাম
  • সারা দেশ
  • বিদেশ
  • খেলা
  • বিনোদন
  • লাইফস্টাইল
  • মতামত
  • ফিচার
  • ভিডিও
  • শিক্ষা
  • ক্লাব
  • বিচিত্রা
  • চাকরি
  • ছবি
  • সাহিত্য
  • বিবিধ
  • ধর্ম
  • প্রবাস
  • ফ্যাক্টচেক
  • সোশ্যাল মিডিয়া
  • ধন্যবাদ
  • বিশেষ সংখ্যা
  • সর্বজনের গল্প
  • বিশেষ লেখা
EN
  • সর্বশেষ
  • জাতীয়
  • রাজনীতি
  • অর্থনীতি
  • চট্টগ্রাম
  • সারা দেশ
  • বিদেশ
  • খেলা
  • বিনোদন
  • লাইফস্টাইল
  • মতামত
  • ফিচার
  • ভিডিও
  • শিক্ষা
  • ক্লাব
  • ইপেপার
  • EN
লোড হচ্ছে…

প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক : আবদুস সাত্তার মিয়াজী

সম্পাদক : মোস্তফা মামুন

আগামীর সময়
আমাদের সম্পর্কেযোগাযোগশর্তাবলিগোপনীয়তাআমরা

ইডিবি ট্রেড সেন্টার (লেভেল-৬ ও ৭), ৯৩ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কারওয়ানবাজার, ঢাকা-১২১৫

যোগাযোগ: ০৯৬৬৬ ৭৭১০১০

বিজ্ঞাপন: ০১৭৫৫ ৬৫১১৬৪

[email protected]

স্বত্ব © ২০২৬ | দৈনিক আগামীর সময়

আগামীর সময় সংস্কৃতি

যে চিঠিতে পদত্যাগের কারণ লিখেছিলেন যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল

শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন
শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন
agamir somoy
প্রকাশ: ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৪১
যে চিঠিতে পদত্যাগের কারণ লিখেছিলেন যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল

যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল (জন্ম: ২৯ জানুয়ারি, ১৯০৪ - মৃত্যু: ৫ অক্টোবর, ১৯৬৮)

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর রাষ্ট্রটির প্রথম আইন ও শ্রমমন্ত্রী হয়েছিলেন যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল। অবিভক্ত বাংলার গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে মুসলিম লীগে যুক্ত হয়েছিলেন তিনি। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষা হবে, এমন প্রত্যাশা ছিল তাঁর। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই সেই প্রত্যাশা ভেঙে যায়।

১৯৫০ সালে পূর্ব পাকিস্তানে হিন্দু ও দলিতদের ওপর নির্যাতন, বৈষম্য এবং সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর হতাশা থেকে দেশটির প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানকে দীর্ঘ একটি পদত্যাগপত্র দেন তিনি। পদত্যাগপত্রে নিজের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়েও আত্মসমালোচনা করেন। চিঠিটি পরবর্তীকালে পাকিস্তানের সংখ্যালঘু নীতি ও ১৯৪৭ পরবর্তী পূর্ব বাংলার সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতির গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়।

আগামীর সময়ের পাঠকদের জন্য ঐতিহাসিক সেই চিঠিটি ইংরেজি মূল থেকে বাংলা অনুবাদ করা হলো।

যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী,

আমি অত্যন্ত ভারাক্রান্ত হৃদয়ে এবং পূর্ববঙ্গের অনগ্রসর হিন্দু জনগণের উন্নয়নের জন্য আমার আজীবন মিশনের ব্যর্থতায় চরম হতাশা নিয়ে আপনার মন্ত্রিসভার সদস্যপদ থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হচ্ছি। ইন্দো-পাকিস্তান উপমহাদেশের এই গুরুত্বপূর্ণ সময়সন্ধিক্ষণে এই সিদ্ধান্ত নিতে আমাকে যে কারণগুলো প্ররোচিত করেছে, তা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা সমীচীন মনে করি। এটি শুধু সত্যটা জানানোর জন্য।

১. আমি আমার পদত্যাগের দূর ও তাৎক্ষণিক কারণ বর্ণনা করার আগে, মুসলিম লীগের সঙ্গে আমার সহযোগিতার সময়কালে ঘটে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর একটি সংক্ষিপ্ত পটভূমি দেওয়া উপযোগী মনে করি। ১৯৪৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলার কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ মুসলিম লীগ নেতা আমার সঙ্গে যোগাযোগ করলে আমি বঙ্গীয় আইনসভায় তাঁদের সঙ্গে কাজ করতে সম্মত হই। ১৯৪৩ সালের মার্চে ফজলুল হক মন্ত্রিসভার পতনের পর ২১ জন তফসিলি জাতির এমএলএকে নিয়ে আমি খাজা নাজিমুদ্দিনের সঙ্গে সহযোগিতা করতে সম্মত হই। তিনি তখন মুসলিম লীগ সংসদীয় দলের নেতা ছিলেন এবং ১৯৪৩ সালের এপ্রিলে মন্ত্রিসভা গঠন করেন। আমাদের সহযোগিতা কিছু নির্দিষ্ট শর্তের ভিত্তিতে ছিল। এর মধ্যে ছিল মন্ত্রিসভায় তিনজন তফসিলি জাতির মন্ত্রী অন্তর্ভুক্ত করা, তফসিলি জাতির শিক্ষার জন্য বার্ষিক পাঁচ লাখ টাকা আবর্তক অনুদান হিসেবে দেওয়া এবং সরকারি চাকরিতে সাম্প্রদায়িক অনুপাতের নিয়ম নিঃশর্তভাবে প্রয়োগ করা।

২. এসব শর্ত ছাড়াও মুসলিম লীগের সঙ্গে কাজ করতে আমাকে প্ররোচিত করার প্রধান কারণ ছিল, বাংলায় মুসলমানদের অর্থনৈতিক স্বার্থ সাধারণত তফসিলি জাতির স্বার্থের সঙ্গে অভিন্ন ছিল। মুসলমানদের বেশিরভাগই ছিলেন কৃষক ও শ্রমিক। তফসিলি জাতির সদস্যরাও তাই ছিলেন। মুসলমানদের একটি অংশ ছিলেন জেলে, তফসিলি জাতির একটি অংশও তাই ছিলেন। দ্বিতীয়ত, তফসিলি জাতি ও মুসলমান উভয়েই শিক্ষার দিক থেকে পিছিয়ে ছিল। আমি বিশ্বাস করতাম, লীগ ও তার মন্ত্রিসভার সঙ্গে আমার সহযোগিতা এমন আইনগত ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিতে সাহায্য করবে, যা বাংলার জনসংখ্যার বিশাল অংশের পারস্পরিক কল্যাণ নিশ্চিত করবে এবং সাম্প্রদায়িক শান্তি ও সম্প্রীতি এগিয়ে নেবে। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, খাজা নাজিমুদ্দিন তাঁর মন্ত্রিসভায় তিনজন তফসিলি জাতির মন্ত্রী নিয়েছিলেন এবং আমার সম্প্রদায়ের সদস্যদের মধ্য থেকে তিনজন সংসদীয় সচিব নিয়োগ করেছিলেন।

ফজলুর রহমান ও খাজা নাজিমুদ্দিনের পাশে যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলসোহরাওয়ার্দী মন্ত্রিসভা

৩. ১৯৪৬ সালের মার্চে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনের পর মি. এইচ  এস সোহরাওয়ার্দী লীগ সংসদীয় দলের নেতা হন এবং ১৯৪৬ সালের এপ্রিলে লীগ মন্ত্রিসভা গঠন করেন। ফেডারেশন টিকিটে নির্বাচিত একমাত্র তফসিলি জাতির সদস্য ছিলাম আমি। আমাকে মি. সোহরাওয়ার্দীর মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সেই বছরের ১৬ আগস্ট কলকাতায় মুসলিম লীগ ‘প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস’ পালন করে। এর ফলে, আপনি জানেন, ব্যাপক দাঙ্গা ও হত্যাযজ্ঞ ঘটে। হিন্দুরা লীগ মন্ত্রিসভা থেকে আমার পদত্যাগ দাবি করে। আমার জীবন বিপন্ন হয়ে পড়ে। প্রায় প্রতিদিনই আমি হুমকিমূলক চিঠি পেতে শুরু করি। কিন্তু আমি আমার নীতিতে অটল থাকি। তাছাড়া, আমি আমাদের পত্রিকা ‘জাগরণ’-এর মাধ্যমে তফসিলি জাতির মানুষদের প্রতি আহ্বান জানাই, তারা যেন কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের রক্তক্ষয়ী দ্বন্দ্ব থেকে দূরে থাকে, এমনকি আমার জীবনের ঝুঁকি থাকলেও। আমি কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্বীকার না করে পারি না যে, আমার বর্ণের হিন্দু প্রতিবেশীরা আমাকে ক্ষুব্ধ হিন্দু জনতার ক্রোধ থেকে রক্ষা করেছিলেন। কলকাতার হত্যাকাণ্ডের পর ১৯৪৬ সালের অক্টোবরে ‘নোয়াখালী দাঙ্গা’ হয়। সেখানে তফসিলি জাতিসহ হিন্দুরা নিহত হন এবং শত শত মানুষ ইসলামে ধর্মান্তরিত হন। হিন্দু নারীরা ধর্ষিত ও অপহৃত হন। আমার সম্প্রদায়ের সদস্যরাও জীবন ও সম্পত্তির ক্ষতি সহ্য করেন। এই ঘটনার পরপরই আমি ত্রিপুরা ও ফেনী সফর করি এবং কিছু দাঙ্গাকবলিত এলাকা দেখি। হিন্দুদের ভয়াবহ কষ্ট আমাকে দুঃখে অভিভূত করে। কিন্তু তবুও আমি মুসলিম লীগের সঙ্গে সহযোগিতার নীতি চালিয়ে যাই। কলকাতার ব্যাপক হত্যাকাণ্ডের পরপরই সোহরাওয়ার্দী মন্ত্রিসভার বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনা হয়। শুধু আমার প্রচেষ্টার কারণেই চারজন অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান সদস্য এবং আইনসভার চারজন তফসিলি জাতির সদস্যের সমর্থন পাওয়া যায়, যারা আদতে কংগ্রেসের সঙ্গে ছিলেন। তা না হলে মন্ত্রিসভা পরাজিত হতো।

৪. ১৯৪৬ সালের অক্টোবরে সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিতভাবে মি. সোহরাওয়ার্দীর মাধ্যমে ভারতের অন্তর্বর্তী সরকারে একটি আসনের প্রস্তাব আমার কাছে আসে। কিছুটা দ্বিধার পর এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য মাত্র এক ঘণ্টার সময় দেওয়া হলে আমি প্রস্তাব গ্রহণে সম্মত হই। তবে শর্ত ছিল, আমার নেতা ড. বি আর আম্বেদকর আমার এই পদক্ষেপে অসম্মতি জানালে আমি পদত্যাগ করতে পারব। তবে ভাগ্যক্রমে, লন্ডন থেকে পাঠানো টেলিগ্রামে আমি তাঁর সম্মতি পাই। দিল্লিতে গিয়ে আইনসভার সদস্য হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার আগে আমি তৎকালীন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মি. সোহরাওয়ার্দীকে রাজি করাই যে তিনি তাঁর মন্ত্রিসভায় আমার জায়গায় দুইজন মন্ত্রী নেবেন এবং তফসিলি জাতি ফেডারেশন গ্রুপ থেকে দুইজন সংসদীয় সচিব নিয়োগ করবেন।

৫. আমি ১৯৪৬ সালের ১ নভেম্বর অন্তর্বর্তী সরকারে যোগ দিই। প্রায় এক মাস পর যখন আমি কলকাতায় যাই, মি. সোহরাওয়ার্দী আমাকে জানান, পূর্ববঙ্গের কিছু অংশে, বিশেষত গোপালগঞ্জ মহকুমায়, যেখানে নমঃশূদ্ররা সংখ্যাগরিষ্ঠ, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা অত্যন্ত বেশি। তিনি আমাকে সেই এলাকাগুলো সফর করতে এবং মুসলমান ও নমঃশূদ্রদের সভায় ভাষণ দিতে অনুরোধ করেন। আসল কথা ছিল, ওই এলাকার নমঃশূদ্ররা পাল্টা আক্রমণের প্রস্তুতি নিয়েছিল। আমি প্রায় এক ডজন বিশাল সমাবেশে ভাষণ দিই। ফলে নমঃশূদ্ররা পাল্টা আক্রমণের ধারণা ত্যাগ করে। এভাবে একটি অনিবার্য বিপজ্জনক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এড়ানো হয়।

৬. কয়েক মাস পর ব্রিটিশ সরকার ভারত বিভাজনের কিছু প্রস্তাবসহ ১৯৪৭ সালের ৩ জুনের বিবৃতি দেয়। সমগ্র দেশ, বিশেষত সমগ্র অমুসলিম ভারত, বিস্মিত হয়। সত্যের খাতিরে আমাকে স্বীকার করতে হবে, আমি সবসময় মুসলিম লীগের পাকিস্তানের দাবিকে দর-কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করতাম। যদিও আমি দৃঢ়ভাবে মনে করতাম, সমগ্র ভারতের প্রেক্ষাপটে মুসলমানদের উচ্চবিত্ত হিন্দু সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে বৈধ অভিযোগ ছিল, তবুও আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতাম, পাকিস্তান সৃষ্টি কখনোই সাম্প্রদায়িক সমস্যার সমাধান করবে না। বরং এটি সাম্প্রদায়িক ঘৃণা ও তিক্ততা বাড়াবে। এছাড়া, আমি মনে করতাম, এটি পাকিস্তানের মুসলমানদের অবস্থারও উন্নতি করবে না। দেশ বিভাজনের অনিবার্য ফল হবে উভয় রাষ্ট্রের শ্রমজীবী মানুষের দারিদ্র্য, নিরক্ষরতা ও করুণ অবস্থা দীর্ঘায়িত করা, যদি না তা চিরস্থায়ী হয়। আমি আরও আশঙ্কা করতাম, পাকিস্তান দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম পিছিয়ে পড়া ও অনুন্নত দেশে পরিণত হতে পারে।

লাহোর প্রস্তাব

৭. আমাকে স্পষ্ট করতে হবে যে আমি ভেবেছিলাম, পাকিস্তানকে শরিয়ত ও ইসলামের নির্দেশ ও সূত্রের ভিত্তিতে একটি সম্পূর্ণ ‘ইসলামী’ রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করা হবে। আমি অনুমান করেছিলাম, এটি ১৯৪০ সালের ২৩ মার্চ মুসলিম লীগের লাহোর অধিবেশনে গৃহীত প্রস্তাবের মূল বিষয়গুলোর অনুরূপ হবে। সেই প্রস্তাবে বলা হয়েছিল, ‘ভৌগোলিকভাবে সংলগ্ন এলাকাগুলোকে প্রয়োজনীয় আঞ্চলিক পুনর্গঠনসহ এমন অঞ্চলে বিভক্ত করা হবে, যেখানে মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ, যেমন ভারতের উত্তর-পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চলীয় অঞ্চল। এসব অঞ্চলকে স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের জন্য গঠন করা হবে, যেখানে সাংবিধানিক এককগুলো স্বায়ত্তশাসিত ও সার্বভৌম হবে।’ আরও বলা হয়েছিল, ‘এই একক ও অঞ্চলে সংখ্যালঘুদের ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও অন্যান্য অধিকার ও স্বার্থ সুরক্ষার জন্য সংবিধানে পর্যাপ্ত, কার্যকর ও বাধ্যতামূলক সুরক্ষা সুনির্দিষ্টভাবে প্রদান করা হবে, তাদের সঙ্গে পরামর্শ করে।’ এই শর্তে বলা হয়েছিল, (ক) উত্তর-পশ্চিম ও পূর্ব মুসলিম অঞ্চলগুলোকে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রে গঠিত করা হবে, (খ) এসব রাষ্ট্র সাংবিধানিকভাবে স্বায়ত্তশাসিত ও সার্বভৌম হবে, (গ) সংখ্যালঘুরা তাদের অধিকার ও স্বার্থের ক্ষেত্রে সুরক্ষিত থাকবে এবং তাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তা কার্যকর হবে এবং (ঘ) এসব বিষয়ে সাংবিধানিক ব্যবস্থা সংখ্যালঘুদের সঙ্গে পরামর্শ করে করা হবে। এই প্রস্তাব ও লীগ নেতৃত্বের প্রতি আমার বিশ্বাস আরও দৃঢ় হয়, যখন কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ১৯৪৭ সালের ১১ আগস্ট গণপরিষদের সভাপতি হিসেবে হিন্দু ও মুসলমানদের সমান আচরণের নিশ্চয়তা দিয়ে একটি বিবৃতি দেন এবং তাঁদের মনে করিয়ে দেন যে তাঁরা সবাই পাকিস্তানি। তখন ধর্মের ভিত্তিতে জনগণকে পূর্ণাঙ্গ মুসলিম নাগরিক ও জিম্মিতে বিভক্ত করার কোনো প্রশ্ন ছিল না, যারা ইসলামী রাষ্ট্র ও তার মুসলিম নাগরিকদের চিরস্থায়ী জিম্মায় থাকবে। এই প্রতিশ্রুতিগুলোর প্রত্যেকটি স্পষ্টভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে, আপনার জ্ঞান ও অনুমোদনে, কায়েদে আজমের ইচ্ছা ও আবেগের সম্পূর্ণ অবহেলায় এবং সংখ্যালঘুদের ক্ষতি ও অপমানের জন্যই তা করা হচ্ছে।

১৯৪৭ সালের ১০–১১ আগস্ট করাচির সিন্ধু প্রাদেশিক পরিষদ ভবনে পাকিস্তানের প্রথম গণপরিষদের উদ্বোধনী অধিবেশনে দাঁড়িয়ে বক্তব্য দিচ্ছেন যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল

দেশভাগ

৮. এই প্রসঙ্গে এটাও উল্লেখ করা যেতে পারে যে আমি দেশভাগের বিরোধী ছিলাম। এ বিষয়ে একটি প্রচার শুরু করতে গিয়ে আমাকে সব দিক থেকে শুধু প্রচণ্ড প্রতিরোধই নয়, অকথ্য গালি, অপমান ও অসম্মানেরও মুখোমুখি হতে হয়। অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে আমি সেই দিনগুলোর কথা স্মরণ করি, যখন এই ইন্দো-পাকিস্তান উপমহাদেশের ৩২ কোটি হিন্দু আমার বিরুদ্ধে যায় এবং আমাকে হিন্দু ও হিন্দুধর্মের শত্রু বলে অভিহিত করে। কিন্তু আমি পাকিস্তানের প্রতি আমার আনুগত্যে অটল ও অচল থাকি। এটি কৃতজ্ঞতার বিষয় যে পাকিস্তানের ৭০ লাখ তফসিলি জাতির মানুষের প্রতি আমার আবেদনে তাঁদের কাছ থেকে স্বতঃস্ফূর্ত ও আগ্রহউদ্দীপক সাড়া পাই। তাঁরা আমাকে অকুণ্ঠ সমর্থন, সহানুভূতি ও উৎসাহ দিয়েছিলেন।

৯. ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর আপনি পাকিস্তান মন্ত্রিসভা গঠন করেন, যাতে আমাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। খাজা নাজিমুদ্দিন পূর্ববঙ্গের জন্য একটি অস্থায়ী মন্ত্রিসভা গঠন করেন। ১০ আগস্ট আমি করাচিতে খাজা নাজিমুদ্দিনের সঙ্গে কথা বলি এবং তাঁকে পূর্ববঙ্গ মন্ত্রিসভায় দুজন তফসিলি জাতির মন্ত্রী নেওয়ার অনুরোধ করি। তিনি পরে কোনো এক সময় তা করার প্রতিশ্রুতি দেন। এরপর এই বিষয়ে যা ঘটে, তা ছিল আপনার, খাজা নাজিমুদ্দিন ও পূর্ববঙ্গের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মি. নুরুল আমিনের সঙ্গে অপ্রীতিকর ও হতাশাজনক দর-কষাকষির ঘটনা। আমি বুঝতে পারি, খাজা নাজিমুদ্দিন কোনো না কোনো অজুহাতে বিষয়টি এড়িয়ে যাচ্ছেন। এতে আমি প্রায় অধৈর্য ও ক্ষুব্ধ হয়ে পড়ি। আমি পাকিস্তান মুসলিম লীগ ও তার পূর্ববঙ্গ শাখার সভাপতিদের সঙ্গেও আলোচনা করি। শেষ পর্যন্ত আমি বিষয়টি আপনার নজরে আনি। আপনি আপনার বাসভবনে আমার উপস্থিতিতে খাজা নাজিমুদ্দিনের সঙ্গে বিষয়টি আলোচনা করেন। খাজা নাজিমুদ্দিন ঢাকায় ফিরে একজন তফসিলি জাতির মন্ত্রী নিতে সম্মত হন। যেহেতু আমি ইতিমধ্যে তাঁর প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে সন্দিহান হয়ে পড়েছিলাম, তাই আমি সময়সীমা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে চাই। আমি জোর দিয়ে বলি, তিনি এক মাসের মধ্যে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেবেন, তা না হলে আমি পদত্যাগ করার স্বাধীনতা পাব। আপনি এবং খাজা নাজিমুদ্দিন উভয়েই শর্তে সম্মত হন। কিন্তু হায়! আপনি হয়তো যা বলেছিলেন, তা মন থেকে বলেননি। খাজা নাজিমুদ্দিন তাঁর প্রতিশ্রুতি রাখেননি। মি. নুরুল আমিন পূর্ববঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর আমি আবার তাঁর সঙ্গে বিষয়টি তুলি। তিনিও একই পুরোনো কৌশলে বিষয়টি এড়িয়ে যান। ১৯৪৯ সালে ঢাকা সফরের আগে আমি আবার এ বিষয়ে আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করলে আপনি আমাকে নিশ্চিত করেন যে পূর্ববঙ্গে সংখ্যালঘু মন্ত্রী নিয়োগ করা হবে এবং আপনি আমার কাছ থেকে বিবেচনার জন্য দুই-তিনটি নাম চান। আপনার ইচ্ছার প্রতি সম্মান দেখিয়ে আমি আপনাকে একটি নোট পাঠাই, যাতে পূর্ববঙ্গ আইনসভার ফেডারেশন গ্রুপের তিনজনের নাম সুপারিশ করা হয়। ঢাকা থেকে আপনার ফেরার পর কী হয়েছে জানতে চাইলে আপনি খুব ঠান্ডা আচরণ করেন এবং শুধু মন্তব্য করেন, ‘নুরুল আমিন দিল্লি থেকে ফিরুক।’ কয়েক দিন পর আমি আবার বিষয়টি নিয়ে চাপ দিই। কিন্তু আপনি বিষয়টি এড়িয়ে যান। তখন আমি এই সিদ্ধান্তে আসতে বাধ্য হই যে আপনি বা মি. নুরুল আমিন কেউই পূর্ববঙ্গ মন্ত্রিসভায় কোনো তফসিলি জাতির মন্ত্রী নেওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেন না। এছাড়া, আমি লক্ষ্য করছিলাম, মি. নুরুল আমিন ও পূর্ববঙ্গের কিছু লীগ নেতা তফসিলি জাতি ফেডারেশনের সদস্যদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করার চেষ্টা করছিলেন। আমার কাছে মনে হয়েছিল, আমার নেতৃত্ব ও ব্যাপক জনপ্রিয়তাকে বিপজ্জনক মনে করা হচ্ছিল। আমার স্পষ্টভাষিতা, সতর্কতা এবং পাকিস্তানের সংখ্যালঘুদের, বিশেষত তফসিলি জাতির স্বার্থ রক্ষায় আন্তরিক প্রচেষ্টাকে পূর্ববঙ্গ সরকার ও কিছু লীগ নেতা বিরক্তির বিষয় মনে করতেন। নির্ভীকভাবে আমি পাকিস্তানের সংখ্যালঘুদের স্বার্থ রক্ষায় আমার দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিলাম।

হিন্দুবিরোধী নীতি

১০. যখন দেশভাগের প্রশ্ন ওঠে, তখন তফসিলি জাতির মানুষ বিভাজনের প্রত্যাশিত বিপজ্জনক ফলাফলে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। তাঁদের পক্ষ থেকে তৎকালীন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মি. সোহরাওয়ার্দীর কাছে আবেদন করা হয়। তিনি সংবাদ বিবৃতি দিয়ে ঘোষণা করেন, তফসিলি জাতির মানুষ এতকাল যেসব অধিকার ও বিশেষাধিকার ভোগ করেছেন, বিভাজনের পর সেগুলো কমানো হবে না। বরং তাঁরা আগের অধিকার ও বিশেষাধিকার ভোগ করার পাশাপাশি অতিরিক্ত সুবিধাও পাবেন। এই নিশ্চয়তা মি. সোহরাওয়ার্দী শুধু ব্যক্তিগত ক্ষমতায় নয়, লীগ মন্ত্রিসভার মুখ্যমন্ত্রী হিসেবেও দিয়েছিলেন। অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, দেশভাগের পর, বিশেষত কায়েদে আজমের মৃত্যুর পর, তফসিলি জাতিরা কোনো বিষয়েই ন্যায্য আচরণ পায়নি। আপনি স্মরণ করবেন, আমি সময়ে সময়ে তফসিলি জাতির অভিযোগ আপনার নজরে এনেছি। আমি আপনাকে বারবার পূর্ববঙ্গের অদক্ষ প্রশাসনের প্রকৃতি ব্যাখ্যা করেছি। আমি পুলিশ প্রশাসনের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ করেছি। আমি পুলিশের তুচ্ছ অজুহাতে বর্বরতার ঘটনা আপনার নজরে এনেছি। আমি পূর্ববঙ্গ সরকার, বিশেষত পুলিশ প্রশাসন ও মুসলিম লীগ নেতাদের একটি অংশের হিন্দুবিরোধী নীতি আপনার নজরে আনতেও দ্বিধা করিনি।

যোগেন মণ্ডলের রাজনৈতিক দর্শনের মূল ভিত্তি ছিল নিপীড়িত বর্গগুলোর ঐক্যের তাগিদকিছু ঘটনা

১১. প্রথম ঘটনা যা আমাকে আহত করেছিল, তা ঘটে গোপালগঞ্জের কাছে দিঘরকুল নামের একটি গ্রামে। সেখানে একজন মুসলমানের মিথ্যা অভিযোগে স্থানীয় নমঃশূদ্রদের ওপর বর্বরতা করা হয়। আসল ঘটনা ছিল, একজন মুসলমান নৌকায় গিয়ে মাছ ধরার জাল ফেলতে চেষ্টা করছিলেন। একজন নমঃশূদ্র, যিনি ইতিমধ্যে একই উদ্দেশ্যে সেখানে ছিলেন, তাঁর সামনে জাল ফেলার বিরোধিতা করেন। এরপর কিছু কথা কাটাকাটি হয়। মুসলমানটি বিরক্ত হয়ে নিকটবর্তী মুসলিম গ্রামে গিয়ে মিথ্যা অভিযোগ করেন যে তাঁকে এবং তাঁর নৌকায় থাকা একজন মহিলাকে নমঃশূদ্ররা আক্রমণ করেছে। সেই সময় গোপালগঞ্জের এসডিও একটি নৌকায় খাল দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি কোনো তদন্ত না করেই অভিযোগটি সত্য বলে গ্রহণ করেন এবং নমঃশূদ্রদের শাস্তি দিতে সশস্ত্র পুলিশ পাঠান। সশস্ত্র পুলিশ এলে স্থানীয় মুসলমানরাও তাদের সঙ্গে যোগ দেয়। তারা শুধু নমঃশূদ্রদের কিছু ঘরে হামলা চালায়নি, নারী-পুরুষ উভয়কে নির্দয়ভাবে মারধর করে, তাঁদের সম্পত্তি ধ্বংস করে এবং মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে যায়। একজন গর্ভবতী মহিলাকে নির্দয়ভাবে মারধরের ফলে ঘটনাস্থলেই তাঁর গর্ভপাত ঘটে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের এই বর্বর পদক্ষেপ বিস্তীর্ণ অঞ্চলে আতঙ্ক সৃষ্টি করে।

১২. পুলিশি অত্যাচারের দ্বিতীয় ঘটনাটি ঘটে ১৯৪৯ সালের প্রথম দিকে বরিশাল জেলার গৌরনদী থানার অধীনে। এখানে একটি ইউনিয়ন বোর্ডের দুই পক্ষের সদস্যদের মধ্যে ঝগড়া হয়। একটি পক্ষ, যারা পুলিশের গুডবুকে ছিল, তারা বিরোধীদের বিরুদ্ধে কমিউনিস্ট হওয়ার অভিযোগ আনে। পুলিশ স্টেশনে হামলার হুমকির খবর পেয়ে গৌরনদীর ওসি সদর দপ্তর থেকে সশস্ত্র বাহিনী চেয়ে পাঠান। পুলিশ সশস্ত্র বাহিনীর সহায়তায় এলাকার অনেক ঘরে হামলা চালায় এবং মূল্যবান সম্পত্তি নিয়ে যায়। এমনকি যারা কখনো রাজনীতিতে ছিলেন না, কমিউনিস্ট পার্টিতে তো দূরের কথা, তাঁদেরও অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়। অনেক ইংরেজি উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ছাত্রকে কমিউনিস্ট সন্দেহভাজন হিসেবে অযথা হয়রানি করা হয়। এই এলাকা আমার জন্মস্থানের খুব কাছে হওয়ায় আমি ঘটনাটি সম্পর্কে জানতে পারি। জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও এসপিকে তদন্তের জন্য লিখি। স্থানীয় কিছু মানুষও এসডিওর কাছে তদন্তের আবেদন করেন। কিন্তু কোনো তদন্ত হয়নি। এমনকি জেলা কর্তৃপক্ষের কাছে আমার চিঠিগুলোরও স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। তখন আমি বিষয়টি পাকিস্তানের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ, আপনারসহ, নজরে আনি। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি।

সেনাবাহিনীর জন্য নারী

১৩. সিলেট জেলার হবিগঞ্জে নিরপরাধ হিন্দুদের, বিশেষত তফসিলি জাতির ওপর পুলিশ ও সেনাবাহিনীর নৃশংসতা বর্ণনার অযোগ্য। নিরপরাধ পুরুষ ও নারীদের নির্মমভাবে নির্যাতন করা হয়। কিছু নারীকে ধর্ষণ করা হয়। তাঁদের ঘরে হামলা চালানো হয় এবং তাঁদের সম্পত্তি পুলিশ ও স্থানীয় মুসলমানরা লুট করে। এলাকায় সামরিক পিকেট বসানো হয়। সামরিক বাহিনী শুধু এসব মানুষের ওপর অত্যাচার করেনি এবং হিন্দুদের ঘর থেকে জোরপূর্বক জিনিসপত্র নিয়ে যায়নি, বরং হিন্দুদের রাতে তাঁদের নারীদের ক্যাম্পে পাঠাতে বাধ্য করেছিল সামরিক বাহিনীর কামনা চরিতার্থ করার জন্য। এই ঘটনাও আমি আপনার নজরে আনি। আপনি আমাকে এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদনের আশ্বাস দেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত কোনো প্রতিবেদন আসেনি।

১৪. এরপর রাজশাহী জেলার নাচোলের ঘটনা ঘটে। সেখানে কমিউনিস্ট দমনের নামে শুধু পুলিশ নয়, স্থানীয় মুসলমানরাও পুলিশের সঙ্গে মিলে হিন্দুদের ওপর অত্যাচার করে এবং তাঁদের সম্পত্তি লুট করে। তখন সাঁওতালরা সীমান্ত পেরিয়ে পশ্চিমবঙ্গে চলে আসে। তারা মুসলমান ও পুলিশের ইচ্ছাকৃতভাবে সংঘটিত নৃশংসতার কাহিনি বর্ণনা করে।

১৫. নির্দয় ও রক্তহিম করা বর্বরতার একটি উদাহরণ ১৯৪৯ সালের ২০ ডিসেম্বর খুলনা জেলার মোল্লারহাট থানার কালশিরায় ঘটে। ঘটনা ছিল, গভীর রাতে চারজন কনস্টেবল কমিউনিস্টদের খোঁজে কালশিরা গ্রামের জয়দেব ব্রহ্মের বাড়িতে হামলা চালায়। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে অর্ধ ডজন যুবক, যাদের কেউ কেউ কমিউনিস্ট হতে পারে, বাড়ি থেকে পালিয়ে যায়। পুলিশ কনস্টেবল বাড়িতে ঢুকে জয়দেব ব্রহ্মের স্ত্রীকে আক্রমণ করে। তাঁর কান্না শুনে তাঁর স্বামী ও বাড়ি থেকে পালিয়ে যাওয়া কয়েকজন সঙ্গী ফিরে আসতে বাধ্য হন। তাঁরা আবার বাড়িতে ঢুকে চারজন কনস্টেবলকে দেখতে পান। তাঁদের কাছে ছিল একটি বন্দুক। এতে সম্ভবত যুবকরা উৎসাহিত হয়। তারা একজন সশস্ত্র কনস্টেবলকে আঘাত করে। ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়। যুবকরা তখন আরেকজন কনস্টেবলকে আক্রমণ করে। অন্য দুজন পালিয়ে গিয়ে চিৎকার করে। এতে কয়েকজন প্রতিবেশী তাঁদের উদ্ধারে এগিয়ে আসে। ঘটনাটি সূর্যোদয়ের আগে অন্ধকারে ঘটায়, গ্রামবাসীরা আসার আগে হামলাকারীরা মৃতদেহ নিয়ে পালিয়ে যায়। খুলনার এসপি সামরিক ও সশস্ত্র পুলিশের একটি দল নিয়ে পরের দিন বিকেলে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। ইতিমধ্যে হামলাকারীরা পালিয়ে যায় এবং বুদ্ধিমান প্রতিবেশীরাও পালিয়ে যায়। কিন্তু গ্রামের অধিকাংশ মানুষ ঘরেই ছিল, কারণ তারা সম্পূর্ণ নিরপরাধ ছিল এবং ঘটনার পরিণতি বুঝতে পারেনি। এরপর এসপি, সামরিক ও সশস্ত্র পুলিশ পুরো গ্রামের নিরপরাধ নাগরিকদের নির্দয়ভাবে মারধর শুরু করে এবং প্রতিবেশী মুসলমানদের তাঁদের সম্পত্তি নিয়ে যেতে উৎসাহিত করে। অনেককে হত্যা করা হয় এবং পুরুষ ও নারীদের জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত করা হয়। গৃহদেবতার মূর্তি ভাঙা হয় এবং উপাসনালয় অপবিত্র ও ধ্বংস করা হয়। পুলিশ, সামরিক ব্যক্তি ও স্থানীয় মুসলমানরা হিন্দু নিম্নবর্গের নারীদের ধর্ষণ করে। এভাবে কালশিরা গ্রাম, যা প্রায় দেড় মাইল দীর্ঘ এবং বিশাল জনসংখ্যার, শুধু নয়, কয়েকটি প্রতিবেশী নমঃশূদ্র গ্রামকেও নরকে পরিণত করা হয়। কালশিরা গ্রামকে কখনো কর্তৃপক্ষ কমিউনিস্ট কার্যকলাপের স্থান হিসেবে সন্দেহ করেনি। ঝালরডাঙ্গা নামের আরেকটি গ্রাম, যা কালশিরা থেকে তিন মাইল দূরে, কমিউনিস্ট কার্যকলাপের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। সেই দিন কমিউনিস্টদের খুঁজতে সেখানে পুলিশের একটি বড় দল হামলা চালায়। তাঁদের কয়েকজন পালিয়ে কালশিরা গ্রামের বাড়িতে আশ্রয় নেয়, যা তাঁদের কাছে নিরাপদ স্থান হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল।

১৬. আমি ১৯৫০ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি কালশিরা ও এর দুটি প্রতিবেশী গ্রাম সফর করি। খুলনার এসপি ও জেলার কিছু গুরুত্বপূর্ণ লীগ নেতা আমার সঙ্গে ছিলেন। যখন আমি কালশিরা গ্রামে আসি, সেখানে শুধু ধ্বংসাবশেষ দেখতে পাই। এসপির উপস্থিতিতে আমাকে বলা হয়, এই গ্রামে ৩৫০টি গৃহস্থবাড়ি ছিল। এর মধ্যে মাত্র তিনটি রক্ষা পেয়েছে এবং বাকিগুলো ধ্বংস করা হয়েছে। নমঃশূদ্রদের নৌকা ও গবাদিপশু সব নিয়ে যাওয়া হয়। আমি এসব তথ্য পূর্ববঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী, মুখ্য সচিব ও পুলিশের মহাপরিদর্শক এবং আপনার কাছে প্রতিবেদন আকারে জানাই।

১৭. এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে, এই ঘটনার খবর পশ্চিমবঙ্গের সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয় এবং এটি সেখানকার হিন্দুদের মধ্যে ব্যাপক অস্থিরতা সৃষ্টি করে। কালশিরার অনেক নির্যাতিত পুরুষ ও নারী গৃহহীন ও সহায়-সম্বলহীন হয়ে কলকাতায় আসেন এবং তাঁদের কষ্টের কাহিনি বর্ণনা করেন। এর ফলে জানুয়ারির শেষভাগে পশ্চিমবঙ্গে কিছু সাম্প্রদায়িক অস্থিরতা ঘটে।

ফেব্রুয়ারির অস্থিরতার কারণ

১৮. এটি লক্ষ্য করা আবশ্যক যে কালশিরার ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় পশ্চিমবঙ্গে ঘটে যাওয়া কয়েকটি সাম্প্রদায়িক অস্থিরতার খবর পূর্ববঙ্গের সংবাদপত্রে অতিরঞ্জিতভাবে প্রকাশিত হয়। ১৯৫০ সালের ফেব্রুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে যখন পূর্ববঙ্গ আইনসভার বাজেট অধিবেশন শুরু হয়, কংগ্রেস সদস্যরা কালশিরা ও নাচোলে সৃষ্ট পরিস্থিতি আলোচনার জন্য দুটি স্থগিতাদেশ প্রস্তাব আনার অনুমতি চান। কিন্তু অনুমতি দেওয়া হয়নি। কংগ্রেস সদস্যরা প্রতিবাদে আইনসভা থেকে ওয়াকআউট করেন। আইনসভার হিন্দু সদস্যদের এই পদক্ষেপ শুধু মন্ত্রীদের নয়, প্রদেশের মুসলিম নেতা ও কর্মকর্তাদেরও বিরক্ত ও ক্রুদ্ধ করে। এটি সম্ভবত ঢাকা ও পূর্ববঙ্গের ফেব্রুয়ারি ১৯৫০-এর দাঙ্গার প্রধান কারণগুলোর একটি ছিল।

১৯. এটি তাৎপর্যপূর্ণ যে ১৯৫০ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল ১০টার দিকে একজন মহিলাকে লাল রঙে রাঙানো হয়, যাতে দেখানো হয় কলকাতার দাঙ্গায় তাঁর স্তন কাটা হয়েছে। তাঁকে ঢাকার পূর্ববঙ্গ সচিবালয়ের চারপাশে ঘোরানো হয়। সঙ্গে সঙ্গে সচিবালয়ের সরকারি কর্মচারীরা কাজ বন্ধ করে হিন্দুদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধের স্লোগান দিয়ে মিছিলে বেরিয়ে পড়েন। মিছিলটি এক মাইলের বেশি দূরত্ব অতিক্রম করার সময় স্থানীয়দের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এই মিছিল দুপুর ১২টার দিকে ভিক্টোরিয়া পার্কে একটি সভার মাধ্যমে শেষ হয়। সেখানে অনেক বক্তা হিন্দুদের দেখে নেওয়ার হুমকি দেন। পুরো ব্যাপারটি আরও কৌতুককর হয়ে ওঠে এ কারণে যে, সচিবালয়ের কর্মচারীরা যখন মিছিলে বেরিয়ে যান, তখন পূর্ববঙ্গ সরকারের মুখ্য সচিব একই ভবনে তাঁর পশ্চিমবঙ্গের সচিবের সঙ্গে দুই বাংলায় সাম্প্রদায়িক অস্থিরতা বন্ধের উপায় খুঁজতে বৈঠক করছিলেন।

কর্মকর্তারা লুটেরাদের সাহায্য করেছিলেন

২০. দুপুর ১টার দিকে সারা শহরে একযোগে দাঙ্গা শুরু হয়। হিন্দু দোকান ও ঘর লুট করা হয় এবং যেখানেই হিন্দু পাওয়া যায়, তাদের হত্যা করা হয়। শহরের সব অংশে পুরোদমে দাঙ্গা শুরু হয়। আমি মুসলমানদের কাছ থেকেও প্রমাণ পাই যে পুলিশের বড় কর্তাদের চোখের সামনেই এসব লুটপাট ও হামলা হয়। হিন্দুদের জহরতের দোকান পুলিশ কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে লুট করা হয়। তাঁরা শুধু লুট বন্ধ করার চেষ্টা করেননি, বরং পরামর্শ ও নির্দেশ দিয়ে লুটেরাদের সাহায্য করেছিলেন। আমার দুর্ভাগ্য, আমি ১৯৫০ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি বিকেল ৫টায় ঢাকায় পৌঁছাই। আমি চূড়ান্ত হতাশ হই, কারণ খুব কাছ থেকে এসব দেখতে ও জানতে পারি। আমি যা দেখেছি এবং সরেজমিনে যেসব তথ্য জেনেছি, তা শুধু হতাশারই ছিল।

দাঙ্গার পটভূমি

২১. ঢাকার দাঙ্গার কারণ মূলত পাঁচটি।

(ক) কালশিরা ও নাচোল বিষয়ে দুটি স্থগিতাদেশ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হলে আইনসভায় তাঁদের প্রতিনিধিদের প্রতিবাদী সাহসী পদক্ষেপের জন্য হিন্দুদের শাস্তি দেওয়া।

(খ) সংসদীয় দলে সোহরাওয়ার্দী গ্রুপ ও নাজিমুদ্দিন গ্রুপের মধ্যে মতানৈক্য ও পার্থক্য তীব্র হচ্ছিল।

(গ) হিন্দু ও মুসলিম উভয় নেতার মাধ্যমে পূর্ব ও পশ্চিম বাংলার পুনর্মিলনের একটি আন্দোলন শুরু হওয়ার আশঙ্কা পূর্ববঙ্গ মন্ত্রিসভা ও মুসলিম লীগকে আতঙ্কিত করে তোলে। তারা এটি প্রতিরোধ করতে চেয়েছিল। তারা ভেবেছিল, পূর্ববঙ্গে যেকোনো বড় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা পশ্চিমবঙ্গে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে, যেখানে মুসলমানরা নিহত হতে পারে। পূর্ব ও পশ্চিম বাংলায় এমন দাঙ্গার ফল, তাদের বিশ্বাস ছিল, বাংলার পুনর্মিলনের যেকোনো আন্দোলন প্রতিরোধ করবে।

(ঘ) পূর্ববঙ্গে বাংলাভাষী মুসলমান ও অবাংলাভাষী মুসলমানদের মধ্যে বৈরিতার অনুভূতি বাড়ছিল। এটি কেবল পূর্ববঙ্গের হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে ঘৃণা সৃষ্টি করে প্রতিরোধ করা যেত। ভাষার প্রশ্নও এর সঙ্গে যুক্ত ছিল।

(ঙ) অহিংসা ও ইন্দো-পাকিস্তান বাণিজ্যচুক্তির পরিণতি পূর্ববঙ্গের অর্থনীতিতে সবচেয়ে তীব্রভাবে শহর ও গ্রামাঞ্চলে অনুভূত হচ্ছিল। মুসলিম লীগ সদস্য ও সরকারি কর্মচারীরা মুসলিম জনসাধারণের মনোযোগ আসন্ন অর্থনৈতিক ধস থেকে হিন্দুদের বিরুদ্ধে এক ধরনের জিহাদের দিকে সরাতে চেয়েছিলেন।

দেশভাগের সময় ঐক্যবদ্ধ বাংলার পক্ষে ছিলেন যোগেন মণ্ডলহতবাক করা বিবরণ, প্রায় ১০ হাজার নিহত

২২. ঢাকায় আমার নয় দিনের অবস্থানকালে আমি শহর ও উপশহরের বেশিরভাগ দাঙ্গাকবলিত এলাকা সফর করি। আমি তেজগাঁও থানার মিরপুরও সফর করি। ট্রেনে, ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ এবং ঢাকা ও চট্টগ্রামের মধ্যে রেলপথে শত শত নিরপরাধ হিন্দু হত্যার খবর আমাকে সবচেয়ে বেশি পীড়া দেয়। ঢাকা দাঙ্গার দ্বিতীয় দিনে আমি পূর্ববঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করি এবং তাঁকে অনুরোধ করি জেলা কর্তৃপক্ষকে অবিলম্বে নির্দেশ দিতে, যাতে জেলা শহর ও গ্রামাঞ্চলে দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়া প্রতিরোধে সব সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ১৯৫০ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি আমি বরিশাল শহরে পৌঁছাই এবং বরিশালে ঘটে যাওয়া ঘটনা জেনে হতবাক হই। জেলা শহরে অনেক হিন্দুর ঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয় এবং অনেক হিন্দুকে হত্যা করা হয়। আমি জেলার প্রায় সব দাঙ্গাকবলিত এলাকা সফর করি। জেলা শহর থেকে ছয় মাইল ব্যাসার্ধের মধ্যে এবং গাড়ি যায় এমন সংযুক্ত কাশিপুর, মাধবপাশা ও লাকুতিয়ার মতো স্থানেও মুসলিম দাঙ্গাকারীরা যে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে, তা দেখে আমি হতবাক হয়ে পড়ি। মাধবপাশা জমিদারের বাড়িতে প্রায় ২০০ মানুষ নিহত এবং ৪০ জন আহত হন। মুলাদী নামের একটি স্থান ভয়াবহ নরকে পরিণত হয়েছিল। মুলাদী বন্দরেই স্থানীয় মুসলমানদের কিছু কর্মকর্তাসহ আমার কাছে থাকা প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিহতের সংখ্যা মোট তিনশোর বেশি হবে। আমি মুলাদী গ্রামও সফর করি। সেখানে কিছু স্থানে আমি মৃতদেহের কঙ্কাল দেখতে পাই। নদীর পাশে কুকুর ও শকুনকে মৃতদেহ খেতে দেখি। সেখানে আমি তথ্য পাই যে সব প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষকে একসঙ্গে হত্যার পর সব তরুণীকে অপরাধী দলের নেতাদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। রাজাপুর থানার কাইবার্তাখালী নামের স্থানে ৬৩ জন নিহত হন। ওই থানা অফিস থেকে এক পাথর নিক্ষেপের দূরত্বে হিন্দুদের ঘর লুট, পুড়িয়ে দেওয়া এবং বাসিন্দাদের হত্যা করা হয়। বাবুগঞ্জ বাজারের সব হিন্দু দোকান লুট করে পুড়িয়ে দেওয়া হয় এবং অনেক হিন্দুকে হত্যা করা হয়। পাওয়া বিস্তারিত তথ্য অনুযায়ী, ক্ষয়ক্ষতির রক্ষণশীল অনুমান ছিল বরিশাল জেলায় কমপক্ষে ২ হাজার ৫০০ নিহত। ঢাকা ও পূর্ববঙ্গের দাঙ্গায় মোট নিহতের সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার বলে অনুমান করা হয়। নারী ও শিশুদের অসহায়ত্ব, যারা তাঁদের সবকিছু ও প্রিয়জন হারিয়েছে, আমার হৃদয় গলিয়ে দেয়। আমি শুধু নিজেকে জিজ্ঞাসা করি, ‘ইসলামের নামে পাকিস্তানের কপালে কী আসছে।’

দিল্লি চুক্তি বাস্তবায়নে কোনো আন্তরিক ইচ্ছা নেই

২৩. বাংলা থেকে হিন্দুদের বড় আকারের দেশত্যাগ মার্চের শেষভাগে শুরু হয়। মনে হয়েছিল, অল্প সময়ের মধ্যে সব হিন্দু ভারতে অভিবাসন করবে। ভারতে যুদ্ধের আহ্বান ওঠে। পরিস্থিতি অত্যন্ত সংকটজনক হয়ে পড়ে। একটি জাতীয় বিপর্যয় অনিবার্য বলে মনে হয়। তবে আশঙ্কিত দুর্যোগ ৮ এপ্রিলের দিল্লি চুক্তির মাধ্যমে এড়ানো হয়। ভয়ার্ত হিন্দুদের হারানো মনোবল পুনরুজ্জীবিত করার উদ্দেশ্যে আমি পূর্ববঙ্গের একটি বিস্তৃত সফর করি। আমি ঢাকা, বরিশাল, ফরিদপুর, খুলনা ও যশোর জেলার কয়েকটি স্থান সফর করি। আমি এক ডজন বিশাল সমাবেশে ভাষণ দিই এবং হিন্দুদের সাহস রাখতে এবং তাঁদের পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি ও ঘর না ছাড়তে বলি। আমার প্রত্যাশা ছিল, পূর্ববঙ্গ সরকার ও মুসলিম লীগ নেতারা দিল্লি চুক্তির শর্তাবলি বাস্তবায়ন করবেন। কিন্তু সময় অতিবাহিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমি বুঝতে শুরু করি, পূর্ববঙ্গ সরকার বা মুসলিম লীগ নেতারা কেউই দিল্লি চুক্তি বাস্তবায়নের বিষয়ে সত্যিই আন্তরিক ছিলেন না। পূর্ববঙ্গ সরকার শুধু দিল্লি চুক্তিতে কথিত ব্যবস্থা স্থাপন করতেই প্রস্তুত ছিল না, বরং সেই উদ্দেশ্যে কার্যকর পদক্ষেপ নিতেও ইচ্ছুক ছিল না। দিল্লি চুক্তির পরপরই যেসব হিন্দু নিজ গ্রামে ফিরে আসেন, তাঁদের ঘর ও জমি ফিরিয়ে দেওয়া হয়নি, যা ইতিমধ্যে মুসলমানরা দখল করে নিয়েছিল।

মৌলানা আকরাম খানের উসকানি

২৪. লীগ নেতাদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে আমার সন্দেহ নিশ্চিত হয় যখন আমি প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সভাপতি মৌলানা আকরাম খানের সম্পাদকীয় মন্তব্য পড়ি ‘মোহাম্মদী’ নামের একটি মাসিক পত্রিকার ‘বৈশাখ’ সংখ্যায়। পাকিস্তানের সংখ্যালঘুবিষয়ক মন্ত্রী ড. এ.এম. মালিকের ঢাকা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রথম বেতার সম্প্রচারে মন্তব্য করার সময় তিনি বলেন, ‘এমনকি নবী মুহাম্মদ (সা.) আরবের ইহুদিদের ধর্মীয় স্বাধীনতা দিয়েছিলেন।’ মৌলানা আকরাম খান বলেন, ‘ড. মালিক ভালো করতেন, যদি তিনি তাঁর বক্তৃতায় আরবের ইহুদিদের কোনো উল্লেখ না করতেন। এটা সত্য যে আরবের ইহুদিদের নবী মুহাম্মদ ধর্মীয় স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। কিন্তু এটি ইতিহাসের প্রথম অধ্যায়। শেষ অধ্যায়ে নবী মুহাম্মদের (সা.) সুনির্দিষ্ট নির্দেশ রয়েছে, যা নিম্নরূপ, ‘আরব থেকে সব ইহুদিকে বিতাড়িত করো।’ এমনকি মুসলিম সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক, সামাজিক ও আধ্যাত্মিক জীবনে খুব উচ্চ পদে অধিষ্ঠিত একজন ব্যক্তির এই সম্পাদকীয় মন্তব্য সত্ত্বেও আমি কিছুটা প্রত্যাশা করেছিলাম, নুরুল আমিন মন্ত্রিসভা হয়তো এত অসৎ নাও হতে পারে। কিন্তু সেই প্রত্যাশা সম্পূর্ণভাবে ভেঙে যায়, যখন মি. নুরুল আমিন দিল্লি চুক্তির শর্তাবলি অনুসারে সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য ডি.এন. বারারিকে মন্ত্রী হিসেবে নির্বাচন করেন। দিল্লি চুক্তিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল, সংখ্যালঘুদের মনে আস্থা ফিরিয়ে আনতে তাঁদের একজন প্রতিনিধিকে পূর্ববঙ্গ ও পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মন্ত্রিসভায় নেওয়া হবে।

নুরুল আমিন সরকারের অসততা

২৫. আমার একটি প্রকাশ্য বিবৃতিতে আমি মত প্রকাশ করি যে সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্বকারী মন্ত্রী হিসেবে ডি.এন. বারারির নিয়োগ শুধু কোনো আস্থা ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করেনি, বরং উল্টো সংখ্যালঘুদের মনে মি. নুরুল আমিন সরকারের দায়িত্বজ্ঞান সম্পর্কে কোনো প্রত্যাশা বা বিভ্রম থাকলে তা ধ্বংস করেছে। আমার নিজের প্রতিক্রিয়া ছিল, মি. নুরুল আমিন সরকার শুধু অসৎ নয়, বরং দিল্লি চুক্তির প্রধান উদ্দেশ্যগুলো ব্যর্থ করতেও চেয়েছিল। আমি আবারও বলি, ডি.এন. বারারি নিজেকে ছাড়া আর কারও প্রতিনিধিত্ব করেন না। তিনি কংগ্রেসের টাকা ও সংগঠনের মাধ্যমে কংগ্রেসের টিকিটে বাংলা আইনসভায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি তফসিলি জাতি ফেডারেশনের প্রার্থীদের বিরোধিতা করেছিলেন। নির্বাচনের কিছু পরে তিনি কংগ্রেসের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে ফেডারেশনে যোগ দেন। যখন তাঁকে মন্ত্রী নিয়োগ করা হয়, তখন তিনি ফেডারেশনের সদস্যও ছিলেন না। আমি জানি, পূর্ববঙ্গের হিন্দুরা আমার সঙ্গে একমত হবেন যে চরিত্র ও বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষের দিক থেকে বারারি দিল্লি চুক্তিতে যুক্ত মন্ত্রীর পদ ধারণ করার যোগ্য নন।

২৬. আমি এই পদে মি. নুরুল আমিনের কাছে তিনটি নাম সুপারিশ করি। আমি যাঁদের সুপারিশ করেছিলাম, তাঁদের একজন ছিলেন এমএ, এলএলবি, অ্যাডভোকেট, ঢাকা হাইকোর্ট। তিনি বাংলায় প্রথম ফজলুল হক মন্ত্রিসভায় চার বছরের বেশি সময় মন্ত্রী ছিলেন। তিনি কলকাতার খনিজ কয়লা উত্তোলন বোর্ডের প্রায় ছয় বছর চেয়ারম্যান ছিলেন। তিনি তফসিলি জাতি ফেডারেশনের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন। আমার দ্বিতীয় প্রার্থী ছিলেন বি.এ., এলএলবি পাস ব্যক্তি। তিনি সাত বছর আইন পরিষদের সদস্য ছিলেন। আমি জানতে চাই, মি. নুরুল আমিন এই দুই ভদ্রলোকের কাউকে নির্বাচন না করে এমন একজনকে নিয়োগ করার কী কারণ থাকতে পারে, যার মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগে আমি ন্যায্য বিবেচনায় তীব্র আপত্তি করেছিলাম। কোনো দ্বিধা ছাড়াই আমি বলতে পারি, দিল্লি চুক্তির শর্তাবলি অনুসারে বারারিকে মন্ত্রী হিসেবে নির্বাচন করা মি. নুরুল আমিনের এই পদক্ষেপ চূড়ান্ত প্রমাণ যে পূর্ববঙ্গ সরকার দিল্লি চুক্তির শর্তাবলি সম্পর্কে তাদের দায়িত্বের অভাব দেখিয়েছে। চুক্তির মূল উদ্দেশ্য ছিল এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করা, যাতে হিন্দুরা পূর্ববঙ্গে তাঁদের জীবন, সম্পত্তি, সম্মান ও ধর্মের নিরাপত্তা নিয়ে বসবাস করতে পারেন।

আরও পড়ুন

বিস্মৃত বহুজনবাদী রাজনীতির পথিকৃৎ

০৫ অক্টোবর ২০২৬


হিন্দুদের বের করে দেওয়ার সরকারি পরিকল্পনা

২৭. এই প্রসঙ্গে আমি আমার দৃঢ় বিশ্বাস আবারও জানাতে চাই যে পূর্ববঙ্গ সরকার এখনও হিন্দুদের প্রদেশ থেকে বের করে দেওয়ার সুপরিকল্পিত নীতি অনুসরণ করছে। আপনার সঙ্গে একাধিকবার আলোচনায় আমি আমার এই মত প্রকাশ করেছি। আমাকে বলতে হবে, পাকিস্তান থেকে হিন্দুদের বিতাড়নের এই নীতি পশ্চিম পাকিস্তানে সম্পূর্ণভাবে সফল হয়েছে এবং পূর্ব পাকিস্তানেও প্রায় সম্পূর্ণ হওয়ার পথে। ডি.এন. বারারিকে মন্ত্রী নিয়োগ এবং এ বিষয়ে আমার সুপারিশে পূর্ববঙ্গ সরকারের অনানুষ্ঠানিক বিরোধিতা কঠোরভাবে তাদের সেই নীতির সঙ্গে মিলে যায়, যাকে তারা ইসলামী রাষ্ট্র বলে। পাকিস্তান হিন্দুদের সম্পূর্ণ নিশ্চয়তা ও নিরাপত্তার অনুভূতি দেয়নি। তারা এখন হিন্দু বুদ্ধিবৃত্তি থেকেও মুক্তি পেতে চায়, যাতে পাকিস্তানের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবন কোনোভাবেই তাদের দ্বারা প্রভাবিত না হয়।

যৌথ নির্বাচকমণ্ডলী বাছাইয়ের কৌশল

২৮. আমি বুঝতে পারিনি কেন নির্বাচনের প্রশ্ন এখনও নিষ্পত্তি হয়নি। এখন তিন বছর ধরে সংখ্যালঘু উপকমিটি নিয়োগ করা হয়েছে। এটি তিনবার বসেছে। গত ডিসেম্বরে কমিটির একটি সভায় যৌথ বা পৃথক নির্বাচকমণ্ডলী রাখার প্রশ্ন বিবেচনার জন্য ওঠে। পাকিস্তানের স্বীকৃত সংখ্যালঘুদের সব প্রতিনিধি পিছিয়ে পড়া সংখ্যালঘুদের জন্য আসন সংরক্ষণসহ যৌথ নির্বাচনের পক্ষে মত দেন। আমরা তফসিলি জাতির পক্ষ থেকে তফসিলি জাতির জন্য আসন সংরক্ষণসহ যৌথ নির্বাচন দাবি করি। এই বিষয়টি গত আগস্টে ডাকা একটি সভায় আবার বিবেচনার জন্য ওঠে। কিন্তু এ বিষয়ে কোনো আলোচনা ছাড়াই সভাটি মুলতবি করা হয়। পাকিস্তানের শাসকদের পক্ষ থেকে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এই ধরনের সিদ্ধান্তের পেছনে উদ্দেশ্য কী, তা বোঝা কঠিন নয়।

হিন্দুদের জন্য অন্ধকার ভবিষ্যৎ

২৯. এখন দিল্লি চুক্তির ফলে পূর্ববঙ্গে হিন্দুদের বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আসি। আমি বলব, বর্তমান অবস্থা শুধু অসন্তোষজনক নয়, বরং সম্পূর্ণ আশাহীন এবং ভবিষ্যৎ সম্পূর্ণ অন্ধকার ও অনিশ্চিত। পূর্ববঙ্গে হিন্দুদের আস্থা একটুও ফিরে আসেনি। চুক্তিটি পূর্ববঙ্গ সরকার ও মুসলিম লীগ উভয়ের কাছেই শুধু এক টুকরো কাগজ হিসেবে বিবেচিত। বেশ বড়সংখ্যক হিন্দু অভিবাসন করেছেন। বেশিরভাগ তফসিলি জাতির কৃষক পূর্ববঙ্গে ফিরে আসছেন, এটি কোনোভাবেই আস্থা ফিরে আসার ইঙ্গিত নয়। এটি শুধু ইঙ্গিত করে যে পশ্চিমবঙ্গে বা ভারতীয় ইউনিয়নের অন্য কোথাও তাঁদের অবস্থান ও পুনর্বাসন সম্ভব হয়নি। উদ্বাস্তু জীবনের কষ্ট তাঁদের ঘরে ফিরতে বাধ্য করছে। এছাড়া, তাঁদের অনেকেই ফিরে যাচ্ছেন ঘটিবাটি নিয়ে আসতে এবং স্থাবর সম্পত্তির ঝামেলা নিষ্পত্তি করতে বা সম্পত্তি বিক্রি করতে। পূর্ববঙ্গে সম্প্রতি কোনো গুরুতর সাম্প্রদায়িক অস্থিরতা ঘটেনি, এটি দিল্লি চুক্তির কারণে নয়। চুক্তি না থাকলেও এটি শুধু চলতে পারত না।

৩০. স্বীকার করতে হবে, দিল্লি চুক্তি নিজেই কোনো সমাপ্তি ছিল না। এর উদ্দেশ্য ছিল এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করা, যা ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে বিদ্যমান সমস্যা ও সংঘর্ষ সমাধানে কার্যকরভাবে সাহায্য করতে পারে। কিন্তু চুক্তির পর ছয় মাসে কোনো সমস্যা বা সংঘর্ষই সত্যিই সমাধান হয়নি। উল্টো পাকিস্তানের পক্ষ থেকে দেশে ও বিদেশে সাম্প্রদায়িক প্রচার ও ভারতবিরোধী প্রচার পুরোদমে চলছে। সারা পাকিস্তানে মুসলিম লীগ কর্তৃক কাশ্মীর দিবস পালন পাকিস্তানের সাম্প্রদায়িক ভারতবিরোধী প্রচারের প্রমাণ। পাঞ্জাবের পাকিস্তানি গভর্নরের সাম্প্রতিক বক্তব্য, পাকিস্তানের ভারতীয় মুসলমানদের নিরাপত্তার জন্য একটি শক্তিশালী সেনাবাহিনী প্রয়োজন, তা ভারতে পাকিস্তানের আসল মনোভাব প্রকাশ করেছে। এটি শুধু দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনাই বাড়াবে।

আজ পূর্ববঙ্গে কী ঘটছে

৩১. আজ পূর্ববঙ্গের অবস্থা কী? দেশ বিভাজনের পর প্রায় ৫০ লাখ হিন্দু চলে গেছে। গত ফেব্রুয়ারির পূর্ববঙ্গের দাঙ্গা ছাড়াও হিন্দুদের এমন বড় আকারে ভিটে ছাড়ার অনেক কারণ রয়েছে। হিন্দু আইনজীবী, চিকিৎসক, দোকানদার, ব্যবসায়ী ও বণিকদের প্রতি মুসলমানদের বর্জন হিন্দুদের জীবিকার সন্ধানে পশ্চিমবঙ্গে অভিবাসন করতে বাধ্য করেছে। অনেক ক্ষেত্রে আইনের যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে হিন্দুদের ঘরবাড়ি দখল করা হয়েছে এবং মালিকদের কোনো ভাড়া না দেওয়ায় তাঁদের ভারতে আশ্রয় খুঁজতে বাধ্য করা হয়েছে। হিন্দু জমিদারদের ভাড়া দেওয়া অনেক আগেই বন্ধ হয়েছিল। এছাড়া মুসলমান আনসার, যাদের বিরুদ্ধে আমি সর্বত্র অভিযোগ পেয়েছি, তারা হিন্দুদের নিরাপত্তাকে হাস্যকর করে তুলেছে। শিক্ষার বিষয়ে হস্তক্ষেপ ও শিক্ষাবোর্ডের ইসলামীকরণের জন্য নেওয়া পদ্ধতি উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষকদের পুরোনো পরিচিত পরিবেশ থেকে ভীত করে তুলেছে। তাঁরা পূর্ববঙ্গ ছেড়ে চলে গেছেন। ফলে বেশিরভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। আমি তথ্য পেয়েছি, কিছু সময় আগে শিক্ষা কর্তৃপক্ষ উচ্চবিদ্যালয়ে একটি সাধারণ নির্দেশনা জারি করে স্কুলের কাজ শুরু হওয়ার আগে সব সম্প্রদায়ের শিক্ষক ও ছাত্রকে পবিত্র কোরআন থেকে আবৃত্তিতে বাধ্যতামূলক অংশগ্রহণের নির্দেশ দেয়। আরেকটি ঘোষণায় বলা হয়, স্কুলের প্রধান শিক্ষকদের ১২ জন বিশিষ্ট মুসলমানের নামে বিভিন্ন প্রাঙ্গণ ও ব্লকের নামকরণ করতে হবে, যেমন জিন্নাহ, ইকবাল, লিয়াকত আলী, নাজিমুদ্দিন ইত্যাদি। খুব সম্প্রতি ঢাকায় একটি শিক্ষা সম্মেলনে সভাপতি মতপ্রকাশ করেন যে পূর্ববঙ্গে ১ হাজার ৫০০ উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ের মধ্যে মাত্র ৫০০টি চালু আছে। চিকিৎসাশাস্ত্রের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের অভিবাসনের ফলে রোগীদের যথাযথ চিকিৎসার প্রায় কোনো উপায় নেই। হিন্দু ঘরে গৃহদেবতার পূজা করতে যেসব পুরোহিত ছিলেন, তাঁরা প্রায় সবাই চলে গেছেন। গুরুত্বপূর্ণ উপাসনালয় পরিত্যক্ত হয়েছে। ফলে পূর্ববঙ্গের হিন্দুরা এখন ধর্মীয় আচার বাদই দেওয়া যাক, বিবাহের মতো সামাজিক অনুষ্ঠান পালনেরও প্রায় কোনো উপায় পাচ্ছেন না, যেখানে পুরোহিতের সেবা অপরিহার্য। দেবদেবীর মূর্তি তৈরির কারিগররাও চলে গেছেন। ইউনিয়ন বোর্ডের হিন্দু সভাপতিদের পুলিশ ও সার্কেল কর্মকর্তাদের সক্রিয় সহায়তায় মুসলমানদের দ্বারা প্রতিস্থাপিত করা হয়েছে। স্কুলের হিন্দু প্রধান শিক্ষক ও সচিবদের মুসলমানদের দ্বারা প্রতিস্থাপিত করা হয়েছে। অল্প কিছু হিন্দু সরকারি কর্মচারীর জীবন অত্যন্ত করুণ করা হয়েছে। তাঁদের অনেককে অপেক্ষাকৃত কম অভিজ্ঞ মুসলমানদের অধীনে কাজ করতে হচ্ছে এবং যথেষ্ট বা কোনো কারণ ছাড়াই বরখাস্ত করা হয়েছে। খুব সম্প্রতি চট্টগ্রামের একজন হিন্দু সরকারি কৌঁসুলিকে চাকরি থেকে অপসারণ করা হয়েছে, যা শ্রীমতী নেলি সেনগুপ্তের একটি বিবৃতিতে স্পষ্ট করা হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে অন্তত মুসলমানবিরোধী কোনো অভিযোগ আনা যায় না।

হিন্দুরা কার্যত রাষ্ট্রহীন

৩২. চুরি ও ডাকাতি, এমনকি খুনও আগের মতো চলছে। থানা হিন্দুদের করা অর্ধেক অভিযোগও কদাচিৎ নথিভুক্ত করে। হিন্দু মেয়েদের অপহরণ ও ধর্ষণ কিছুটা কমেছে শুধু এই কারণে যে পূর্ববঙ্গে বর্তমানে ১২ থেকে ৩০ বছর বয়সী কোনো হিন্দু মেয়ে বাস করছে না। গ্রামাঞ্চলে তাঁদের বাবা-মায়ের সঙ্গে বসবাসকারী অল্প কিছু নিম্নবর্গের হিন্দু মেয়েকেও মুসলিম যুবকেরা ছাড়ছে না। আমি মুসলমানদের দ্বারা তফসিলি জাতির মেয়েদের ধর্ষণের অনেক ঘটনার তথ্য পেয়েছি। হিন্দুরা বাজারে যে পাট ও অন্যান্য কৃষিপণ্য বিক্রি করে, তার দাম মুসলিম ক্রেতারা খুব কমই পুরোপুরি দেয়। বাস্তবিকভাবে পাকিস্তানে হিন্দুদের যতদূর সম্পর্ক, সেখানে আইন, নীতি বা ন্যায়ের কোনো বালাই নেই।

পাকিস্তান থেকে ফিরে আসার পরে পশ্চিমবঙ্গে অজ্ঞাতনামা জীবনযাপন করেন যোগেন মণ্ডলপশ্চিম পাকিস্তানে জোরপূর্বক ধর্মান্তর

৩৩. পূর্ব পাকিস্তানের প্রশ্ন বাদ দিয়ে এখন আমি পশ্চিম পাকিস্তান, বিশেষত সিন্ধুর প্রসঙ্গে বলি। পশ্চিম পাঞ্জাবে বিভাজনের পর প্রায় এক লাখ তফসিলি জাতির মানুষ ছিল। উল্লেখ করা যেতে পারে, তাঁদের একটি বড় অংশ ইসলামে ধর্মান্তরিত হয়েছিল। মুসলমানদের দ্বারা অপহৃত এক ডজন তফসিলি জাতির মেয়ের মধ্যে এখন পর্যন্ত মাত্র চারজনকে উদ্ধার করা হয়েছে, কর্তৃপক্ষের কাছে বারবার আবেদন সত্ত্বেও। সেই মেয়েদের নাম ও তাঁদের অপহরণকারীদের নাম সরকারকে দেওয়া হয়েছিল। অপহৃত মেয়েদের উদ্ধারের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সম্প্রতি যে শেষ উত্তর দিয়েছেন, তা ছিল, ‘তাঁর কাজ হিন্দু মেয়েদের উদ্ধার করা এবং ‘অচ্ছুত’ (তফসিলি জাতি) হিন্দুদের নয়।’ সিন্ধু ও করাচিতে, পাকিস্তানের রাজধানী, এখনও বসবাসকারী অল্পসংখ্যক হিন্দুর অবস্থা শুধু নাজুকই নয়, দৈন্যদশায়। আমি করাচি ও সিন্ধুর ৩৬৩টি হিন্দু মন্দির ও গুরুদ্বারের একটি তালিকা পেয়েছি, যা কোনোভাবেই সম্পূর্ণ তালিকা নয়। এসব এখনো মুসলমানদের দখলে। কিছু মন্দির মুচির দোকান, কসাইখানা ও হোটেলে রূপান্তরিত হয়েছে। হিন্দুদের কেউ তা ফেরত পায়নি। তাঁদের জমিদারি সম্পত্তি কোনো নোটিশ ছাড়াই দখল করে নেওয়া হয়েছে এবং উদ্বাস্তু ও স্থানীয় মুসলমানদের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে জানি, ২০০ থেকে ৩০০ হিন্দুকে অনেক আগে অচ্ছুত ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত তাঁদের কারও সম্পত্তি ফেরত দেওয়া হয়নি। এমনকি করাচি পিঞ্জিরাপোলের দখলও ট্রাস্টিদের ফেরত দেওয়া হয়নি, যদিও কিছু সময় আগে এটিকে ‘কারও নয়’ এমন সম্পত্তি ঘোষণা করা হয়েছিল। করাচিতে আমি অনেক ভাগ্যহীন পিতা ও স্বামীর কাছ থেকে অপহৃত হিন্দু মেয়েদের, বেশিরভাগই তফসিলি জাতির, উদ্ধারের আবেদন পেয়েছি। আমি দ্বিতীয় অস্থায়ী সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করি। কিন্তু সামান্য বা কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে আমি তথ্য পেয়েছি, সিন্ধুতে এখনও বসবাসকারী অনেক তফসিলি জাতির মানুষকে জোরপূর্বক ইসলামে ধর্মান্তরিত করা হয়েছে।

পাকিস্তান হিন্দুদের জন্য ‘অভিশপ্ত’

৩৪. এখন পাকিস্তানে হিন্দুদের সামগ্রিক চিত্র সংক্ষেপে তুলে ধরলে, আমি বলতে বাধ্য হব, পাকিস্তানের হিন্দুরা তাঁদের নিজেদের ঘরেই কার্যত ‘রাষ্ট্রহীন’ হয়ে পড়েছে। তাঁদের একমাত্র দোষ, তাঁরা হিন্দুধর্ম পালন করেন। মুসলিম লীগ নেতারা বারবার ঘোষণা দিচ্ছেন যে পাকিস্তান ইসলামী রাষ্ট্র এবং থাকবে। ইসলামকে সব দুনিয়াবি সমস্যার সার্বভৌম প্রতিকার হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রের দ্বন্দ্বে আপনি ইসলামী সমতা ও ভ্রাতৃত্বের উদাহরণ উপস্থাপন করুন। শরিয়তের সেই ঐশী ব্যবস্থায় কেবল মুসলমানরাই শাসক, আর হিন্দু ও অন্যান্য সংখ্যালঘুরা জিম্মি, যারা মূল্যের বিনিময়ে সুরক্ষার অধিকারী। আর আপনি যে কারও থেকে ভালো জানেন, মি. প্রধানমন্ত্রী, সেই মূল্য কী। দীর্ঘ ও উদ্বিগ্ন সংগ্রামের পর আমি এই সিদ্ধান্তে এসেছি যে পাকিস্তান হিন্দুদের বাস করার স্থান নয় এবং তাঁদের ভবিষ্যৎ ধর্মান্তর বা দেশান্তরের অশুভ ছায়ায় অন্ধকার। উচ্চবিত্ত হিন্দুদের বড় অংশ ও রাজনৈতিকভাবে সচেতন তফসিলি জাতিরা পূর্ববঙ্গ ছেড়ে চলে গেছে। যেসব হিন্দু পাকিস্তানে অভিশপ্ত অবস্থায় থাকবেন, আমি আশঙ্কা করি, ধীরে ধীরে ও পরিকল্পিতভাবে হয় ইসলামে ধর্মান্তরিত হবেন অথবা সম্পূর্ণ ধ্বংস হবেন। সত্যিই বিস্ময়কর যে আপনার শিক্ষা, সংস্কৃতি ও অভিজ্ঞতার একজন মানুষ মানবতার জন্য এত বড় বিপদ এবং সমতা ও সুবিবেচনার সব নীতি থাকা সত্ত্বেও আপনি এর জন্য দায়ী হবেন। আমি আপনাকে ও আপনার সহকর্মীদের বলতে চাই, হিন্দুরা কোনো ভয় বা প্রলোভন সত্ত্বেও তাঁদের জন্মভূমিতে জিম্মি হিসেবে আচরণ করতে দেবে না। আজ তাঁরা হয়তো, যেমন অনেকেই ইতিমধ্যে করেছেন, দুঃখে কিন্তু আতঙ্কে তাঁদের ভিটেমাটি ও ঘর ত্যাগ করবেন। আগামীকাল তাঁরা জীবনের অর্থনীতিতে তাঁদের ন্যায্য স্থানের জন্য সংগ্রাম করবেন। কে জানে ভবিষ্যতের গর্ভে কী আছে? যখন আমি নিশ্চিত যে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারে আমার দায়িত্ব চালিয়ে যাওয়া হিন্দুদের কোনো সাহায্য করে না, তখন আমি পরিষ্কার বিবেক নিয়ে পাকিস্তানের হিন্দুদের ও বিদেশের জনগণের মনে এই মিথ্যা ছাপ তৈরি করা উচিত নয় যে হিন্দুরা সেখানে তাঁদের জীবন, সম্পত্তি ও ধর্মের নিরাপত্তা নিয়ে সম্মানের সঙ্গে বাস করতে পারে। এতটুকুই হিন্দুদের সম্পর্কে।

মুসলমানদের জন্যও কোনো নাগরিক স্বাধীনতা নেই

৩৫. আর যেসব মুসলমান লীগ শাসকদের ও তাঁদের দুর্নীতিগ্রস্ত ও অদক্ষ আমলাদের বৃত্তের বাইরে? পাকিস্তানে নাগরিক স্বাধীনতা নামক কিছু প্রায় নেই। উদাহরণ হিসেবে খান আবদুল গাফফার খানের ভাগ্য দেখুন, যাঁর চেয়ে বেশি ধর্মপ্রাণ মুসলমান বহু বছর এই পৃথিবীতে হাঁটেননি, এবং তাঁর সাহসী দেশপ্রেমিক ভাই ড. খান সাহেবের। উত্তর-পশ্চিম ও পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলের অনেক সাবেক লীগ নেতা বিচার ছাড়াই কারাগারে আছেন। মি. সোহরাওয়ার্দী, যাঁর কাছে বাংলায় লীগের বিজয় অনেকাংশে ঋণী, কার্যত একজন পাকিস্তানি বন্দী, যাঁকে সরকারের নির্দেশে চলতে হয় এবং সরকারের নির্দেশে মুখ খুলতে হয়। মি. ফজলুল হক, বাংলার সেই প্রিয় প্রবীণ নেতা, যিনি এখন বিখ্যাত লাহোর প্রস্তাবের রচয়িতা, ঢাকা হাইকোর্টের বিচার ব্যবস্থার অংশীদার হয়ে তাঁর একাকী প্রস্থান রচনা করছেন এবং তথাকথিত ইসলামী পরিকল্পনা যতটা নির্মম, ততটাই সম্পূর্ণ। পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের সাধারণ অবস্থা সম্পর্কে কম বলা ভালো। তাঁদের স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বায়ত্তশাসিত ও সার্বভৌম অঞ্চলের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। পরিবর্তে তাঁরা কী পেয়েছেন? পূর্ববঙ্গ পাকিস্তানের পশ্চিমাঞ্চলের একটি উপনিবেশে পরিণত হয়েছে, যদিও এর জনসংখ্যা পাকিস্তানের সব অঞ্চল একসঙ্গে মিলিয়েও বেশি ছিল। এটি করাচির একটি বর্ধিত অঞ্চলে পরিণত হয়েছে, যা পরের জন্য চাষাবাদ করছে এবং তার নির্দেশ পালন করছে। পূর্ববঙ্গের মুসলমানরা নিজেদের রুটি চেয়েছিল এবং ইসলামী রাষ্ট্র ও শরিয়তের রহস্যময় কার্যকলাপের মাধ্যমে তারা সিন্ধু ও পাঞ্জাবের শুষ্ক মরুভূমি থেকে পেয়েছে পাথর।

আমার নিজের দুঃখজনক ও তিক্ত অভিজ্ঞতা

৩৬. পাকিস্তানের সামগ্রিক চিত্র এবং অন্যদের প্রতি নির্দয় ও নিষ্ঠুর অবিচার বাদ দিলেও আমার নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা কম দুঃখজনক, তিক্ত ও প্রকাশযোগ্য নয়। আপনি প্রধানমন্ত্রী ও সংসদীয় দলের নেতা হিসেবে আপনার অবস্থান ব্যবহার করে আমাকে একটি বিবৃতি জারি করতে বলেছিলেন, যা আমি গত ৮ সেপ্টেম্বর করি। আপনি জানেন, আমি এমন একটি বিবৃতি দিতে ইচ্ছুক ছিলাম না, যাতে অসত্য ও অর্ধসত্য থাকে, যা অসত্যের চেয়েও খারাপ। আপনার নেতৃত্বে এবং আপনার সঙ্গে মন্ত্রী হিসেবে কাজ করার সময় আপনার অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। কিন্তু আমি আর আমার বিবেকে এই মিথ্যা অভিনয় ও অসত্যের বোঝা বহন করতে পারি না। তাই আমি আপনার মন্ত্রী হিসেবে পদত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি, যা আমি এতদ্বারা আপনার হাতে তুলে দিচ্ছি এবং আশা করি আপনি বিলম্ব ছাড়াই তা গ্রহণ করবেন। আপনি অবশ্যই স্বাধীন যে আপনি সেই পদ বাতিল করুন বা আপনার ইসলামী রাষ্ট্রের উদ্দেশ্যগুলো যথাযথ ও কার্যকরভাবে পূরণ করার জন্য প্রকাশ করুন।

বিনীত,

স্বাক্ষরিত/- জে.এন. মণ্ডল

৮ অক্টোবর ১৯৫০

যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল
    আগামীর সময় ইপেপার
    শেয়ার করুন:
    বন্ধ হচ্ছে পদ্মা ব্যাংক

    বন্ধ হচ্ছে পদ্মা ব্যাংক

    ‘আমাকে বিক্রি করে দিয়েছে’, সৌদি থেকে রেহেনার আকুতি

    ‘আমাকে বিক্রি করে দিয়েছে’, সৌদি থেকে রেহেনার আকুতি

    সবাইকে জামিন দিক, আমাদের সেফ কাস্টডিতে রাখুক

    সবাইকে জামিন দিক, আমাদের সেফ কাস্টডিতে রাখুক

    কোটালীপাড়ায় শিক্ষিকাকে উত্ত্যক্ত করার অভিযোগে যুবককে মারধর

    কোটালীপাড়ায় শিক্ষিকাকে উত্ত্যক্ত করার অভিযোগে যুবককে মারধর

    তৌফিক খালিদী মোহ-নির্মোহ দ্বন্দ্বের যবনিকা

    তৌফিক খালিদী মোহ-নির্মোহ দ্বন্দ্বের যবনিকা

    ‘সোনার ডিমপাড়া হাঁস’ বিদেশিদের পাতে!

    ‘সোনার ডিমপাড়া হাঁস’ বিদেশিদের পাতে!

    আ. লীগের দুই পক্ষকে নিয়ে টানাটানি বিএনপির দুই এমপির

    আ. লীগের দুই পক্ষকে নিয়ে টানাটানি বিএনপির দুই এমপির

    যুক্তরাষ্ট্রে প্রতারণার অভিযোগে বাংলাদেশি গ্রেপ্তার

    যুক্তরাষ্ট্রে প্রতারণার অভিযোগে বাংলাদেশি গ্রেপ্তার

    কুষ্টিয়ায় নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর হামলার অভিযোগ, গাড়ি ভাঙচুর

    কুষ্টিয়ায় নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর হামলার অভিযোগ, গাড়ি ভাঙচুর

    রামপাল কি সত্যিই গ্রিডে ১,৩২১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ দিচ্ছে?

    রামপাল কি সত্যিই গ্রিডে ১,৩২১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ দিচ্ছে?

    সালমানের বন্ধুর ছেলে ‘দেখতে সালমানের মতো’

    সালমানের বন্ধুর ছেলে ‘দেখতে সালমানের মতো’

    ১২ কেজি এলপিজির দাম বাড়ল ২৫২ টাকা

    ১২ কেজি এলপিজির দাম বাড়ল ২৫২ টাকা

    উত্থানের পর অস্বস্তির বৃত্তে জামায়াত

    উত্থানের পর অস্বস্তির বৃত্তে জামায়াত

    বিয়ে বিচ্ছেদের ঘোষণা প্রীতম-শেহতাজের

    বিয়ে বিচ্ছেদের ঘোষণা প্রীতম-শেহতাজের

    রিমান্ড শেষে আখতারুজ্জামান আদালতে, আটক রাখার আবেদন

    রিমান্ড শেষে আখতারুজ্জামান আদালতে, আটক রাখার আবেদন