যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল
বিস্মৃত বহুজনবাদী রাজনীতির পথিকৃৎ

১৯৪৭ সালের ১০–১১ আগস্ট করাচির সিন্ধু প্রাদেশিক পরিষদ ভবনে পাকিস্তানের প্রথম গণপরিষদের উদ্বোধনী অধিবেশনে দাঁড়িয়ে বক্তব্য দিচ্ছেন যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল
যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল—যিনি ‘যোগেন মণ্ডল’ নামেই অধিক পরিচিত— বিংশ শতাব্দীর দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির এক ক্যারিশম্যাটিক অথচ বিস্মৃত ব্যক্তিত্ব। ১৯০৪ সালের ২৯ জানুয়ারি ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির বাকেরগঞ্জ জেলার মৈস্তারকান্দিতে তাঁর জন্ম। পিতা রামদয়াল মণ্ডল ও মাতা সন্ধ্যা দেবী। নমশূদ্র সম্প্রদায়ে জন্মগ্রহণকারী এই মানুষটি শিক্ষাজীবনে অসাধারণ মেধার পরিচয় দেন। ১৯২৪ সালে অঙ্ক ও সংস্কৃতে ভালো নম্বর পেয়ে ম্যাট্রিক পাস করেন, এরপর বরিশালের ব্রজমোহন কলেজ থেকে আইএ এবং গণিত ও সংস্কৃত নিয়ে বিশেষ কৃতিত্বের সঙ্গে ১৯২৯ সালে বিএ পাস করেন। ১৯৩৪ সালে আইন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে কলকাতার ছোটো আদালতে শিক্ষানবিশ হিসেবে যোগ দেন, পরে ১৯৩৬ সালে বরিশাল সদর আদালতে আইনজীবী হন। সেই সময় থেকেই তিনি সামাজিকভাবে অনগ্রসর শ্রেণির উন্নতিসাধনে জনসেবামূলক কাজকর্মে যুক্ত হন।
১৯৩৭ সালের প্রাদেশিক আইনসভার নির্বাচনে যোগেন মণ্ডল নির্দলীয় প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং কংগ্রেসের প্রার্থী জমিদার সরল কুমার দত্তকে পরাজিত করেন। উল্লেখযোগ্য, যে আসন থেকে তিনি বিজয়ী হন সেটি তফসিলি সংরক্ষিত আসন ছিল না, একটি সাধারণ আসন ছিল। এই নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করতে গিয়ে অনেকে বলেছেন, এই বিজয়ের পেছনে ছিল এক নতুন সামাজিক উত্থান—বর্ণহিন্দুদের বিরুদ্ধে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ। তফসিলিরা ছাড়াও মুসলমানরা তাঁকে বিশেষভাবে সমর্থন করাতেই এই সাফল্য এসেছে। এই সমীকরণটি যোগেন্দ্রনাথকে বিশেষভাবে ভাবিয়ে থাকবে এবং তাঁর সারা জীবনের রাজনৈতিক অবস্থানে গভীর প্রভাব বিস্তার করেছে।
আইনসভায় প্রবেশের পর যোগেন্দ্রনাথ একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান নেন। বিভিন্ন দলের (বা নির্দলীয়) প্রতিনিধি হিসেবে মোট ৩১ জন তফশিলী প্রার্থী আইনসভায় বিজয়ী হয়ে এসেছিলেন। দলনিরপেক্ষভাবে তফশিলী প্রতিনিধিদের একটি মঞ্চে যোগেন মণ্ডল সমন্বিত করেন। বিভিন্ন ইস্যুতে নিজেদের জাতের স্বার্থে যেন তারা ঐক্যবদ্ধভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন—এটাই ছিল এই সমন্বয়ের মূল লক্ষ্য। তাঁর ঘোষণা ছিল নমঃশূদ্রদের স্বার্থে কাজ হলে তাঁরা সরকারকে রাখবেন, নচেৎ তার বিরুদ্ধে গিয়ে সরকার ফেলে দেবার চেষ্টা করবেন। বস্তুত বাংলার আইনসভায় নমঃশূদ্র ব্লকের এটাই ছিল প্রথম স্বাধীন আত্মঘোষণা। ১৯৩৮ সালে বঙ্গীয় বিধানসভায় তফশিলী সম্প্রদায়ভুক্ত সদস্যদের নিয়ে তিনি ‘ইনডিপেনডেন্ট শিডিউলড কাস্ট পার্টি’ নামে একটি তফশিলী দল গঠন করেন।
যোগেন মণ্ডলের রাজনৈতিক দর্শনের মূল ভিত্তি ছিল নিপীড়িত বর্গগুলোর ঐক্যের তাগিদ। তিনি মনে করতেন, ভারতবর্ষে দলিত ও মুসলমানরা হলো প্রধান দুই নিপীড়িত বর্গ। এদের ঐক্য প্রয়োজন। উপনিবেশমুক্ত নতুন দক্ষিণ এশিয়ায় বর্ণব্যবস্থার বাইরে থাকা অচ্যুত ‘তফসিলি হিন্দু’ এবং ‘অন্যান্য পশ্চাৎপদ শ্রেণি’র সঙ্গে ‘ম্লেচ্ছ’ মুসলমানদের ঐক্যের মধ্য দিয়ে ‘বহুজন’বাদী রাজনীতি গড়ে তোলা না গেলে ব্রিটিশ-পরবর্তী সম্ভাব্য যেকোনো ‘সমাধান’-এ ঔপনিবেশিক আলোকপ্রাপ্তদেরই নেতৃত্বে ও নীতিনির্ধারণের জায়গায় থেকে যাবে।
তিনি বলতেন, এই দেশ হিন্দু এবং মুসলমানদের মধ্যে বিভক্ত হয়ে যায়নি, তফশিলীদের আলাদা অবস্থান রয়েছে এবং তারা হিন্দুসমাজের অংশ নন। গান্ধীজীর হরিজন আন্দোলনের সূত্রে তফশিলীদের হিন্দু সমাজের অন্তর্ভুক্ত করে নেওয়ার রাজনীতির বিরোধী ছিলেন তিনি। বঙ্গীয় রাজনীতিতে যোগেন্দ্রনাথ সুভাষচন্দ্রের অনুগামী হয়েছিলেন। কিন্তু সুভাষচন্দ্রকেও তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন তাঁর অবস্থান। জাতীয় কংগ্রেস থেকে সুভাষচন্দ্রের বিদায়ের পরও তিনি সুভাষচন্দ্রের সঙ্গেই ছিলেন। সুভাষচন্দ্রের দেশত্যাগের পর তিনি আম্বেদকরের শিডিউলড কাস্ট ফেডারেশনের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করেন।
১৯৪৩ সালে খাজা নাজিমুদ্দিনের মন্ত্রীসভায় তিনি সমবায় ও ঋণদান বিষয়ক মন্ত্রী ছিলেন। ১৯৪৬ সালে তিনি ভারতের অন্তর্বর্তী সরকারের আইনমন্ত্রীর দায়িত্বভার পালন করেন। বাংলার সোহরাওয়ার্দির মন্ত্রীসভায় ১৯৪৬ সালের এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত কাজ করেছেন। ১৯৪৬ সালে সংবিধান সভার নির্বাচনে আম্বেদকর মহারাষ্ট্র থেকে জিততে ব্যর্থ হলে যোগেন মণ্ডল তাঁকে বাংলা থেকে জিতিয়ে সংবিধান সভায় পাঠান। ভারতীয় রাজনীতিতে এই ঘটনাটি স্বাভাবিকভাবেই ঐতিহাসিক তাৎর্যমণ্ডিত। যোগেন মণ্ডলের ব্যাপকভিত্তিক রাজনৈতিক উদ্যোগের মধ্য দিয়ে ১৯৪৬-এ আম্বেদকরকে বেঙ্গল থেকে নির্বাচিত করার ব্যবস্থা হয় এবং ওই ভূমিকার কারণেই ভারতীয় গণপরিষদে আম্বেদকরের উপস্থিতি সুনিশ্চিত হয় এবং ভারতীয় সংবিধান প্রণয়নে আম্বেদকরের বহুল প্রচারিত ভূমিকাসমূহ রাখা সম্ভব হয়। যোগেন মণ্ডল যদি আম্বেদকরকে ভারতীয় সংবিধান প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় পুনঃস্থাপিত না করতেন, তাহলে আজকের ভারতে দলিতদের জন্য যেসব সাংবিধানিক ও আইনগত সুরক্ষা তৈরি হয়েছে, তার অনেক কিছুর অর্জনই সুদূরপরাহত হয়ে যেত।
যোগেন মণ্ডল দেশভাগের সময় ঐক্যবদ্ধ বাংলার পক্ষে ছিলেন। কিন্তু সোহরাওয়ার্দী -শরৎ বসুর ঐক্যবদ্ধ বাংলার প্রস্তাব বাংলার হিন্দুপ্রধান জেলাগুলির বাঙালিরা গ্রহণ করেনি। তাদের আশঙ্কা ছিল প্রথমে পৃথক ঐক্যবদ্ধ বাংলা গঠিত হলেও মুসলিমপ্রধান এই অঞ্চল একসময়ে পাকিস্তানে যোগ দেবে। তাই হিন্দুপ্রধান জেলাগুলির বাঙালিরা বঙ্গবিভাজনের পক্ষে সোচ্চারে সায় দিয়েছিলেন। যোগেন মণ্ডল ৩ জুন ১৯৪৭-এ ব্রিটিশদের দেশভাগের ঘোষণায় আকাশ থেকে পড়েছিলেন। তাঁর ধারণা ছিল বাস্তবে দেশভাগ হবে না এবং এটা মুসলিম লীগের তরফে শুধুমাত্র একটি দর কষাকষির অস্ত্র।
বাস্তবে যখন পাকিস্তানের ঘোষণা হল ১৪ আগস্ট ১৯৪৭-এ, লিয়াকত আলি খানের নেতৃত্বাধীন পাকিস্তানের সেই কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভায় যোগেন মণ্ডল অন্তর্ভুক্ত হন। তিনি ছিলেন পাকিস্তানের প্রথম আইনমন্ত্রী। পাকিস্তান সৃষ্টিতে অবদানের স্বীকৃতি মেলে সংবিধানে যোগেন্দ্রনাথকে নবসৃষ্ট দেশের সংবিধান সভার সাময়িক প্রধান করার মাধ্যমে। পাকিস্তানের প্রথম আইন ও শ্রমমন্ত্রীও হন যোগেন মণ্ডল। জিন্নাহর অঙ্গীকারে যোগেনের প্রবল আস্থা ছিল। আর যোগেনের আস্থার কারণেই পূর্ববঙ্গের লাখ লাখ নমশূদ্র ও দলিত ভারতে পাড়ি জমায়নি। পূর্ব পাকিস্তানে থেকে গিয়েছিল তারা।
কিন্তু লিয়াকত আলী খানের মন্ত্রিসভা ক্রমে জিন্নাহর অঙ্গীকার থেকে দূরে সরে যেতে থাকলে এবং পূর্ব পাকিস্তানে দলিত তফসিলীদের ওপর নিপীড়ন নেমে এলে হতাশ ও বিক্ষুব্ধ যোগেন মন্ডল কেবল যে মন্ত্রিত্ব ত্যাগ করেন তা-ই নয়, পাকিস্তান ভূমিও ত্যাগ করেন। সময়টা তখন ১৯৫০-এর অক্টোবর। পাকিস্তানী প্রশাসনের হিন্দু বিরোধী পক্ষপাতিত্ব অনুধাবন করার কথা উদ্ধৃত করে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের কাছে পদত্যাগ পত্র জমা দেওয়ার পরে ১৯৫০ সালে যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল ভারতে ফিরে আসেন। তিনি তার পদত্যাগের চিঠিতে অমুসলিম সংখ্যালঘুদের প্রতি সামাজিক অন্যায় ও পক্ষপাতমূলক আচরণ সম্পর্কিত ঘটনা উল্লেখ করেছেন।
পদত্যাগপত্রে তিনি লিখেছিলেন, ‘The present condition is not only unsatisfactory but absolutely hopeless and that the future completely dark and dismal.’ তিনি আরও বলেছিলেন, ‘I would like to reiterate in this connection my firm conviction that East Bengal Govt. is still following the well-planned policy of squeezing Hindus out of the Province.’ জিন্নাহর মৃত্যুর পরে তিনি সেখানে কোণঠাসা হয়ে পড়েন এবং ১৯৫০-এ পাকিস্তানকে মুসলিম রাষ্ট্র করার দাবি জোরালো হলে এবং সেখানে কেন হিন্দু যোগেন মণ্ডল মন্ত্রী থাকবেন এই প্রশ্ন উঠলে শারীরিক আক্রমণের আশঙ্কায় ভগ্নমনোরথ হয়ে তিনি আইনমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে ভারতে ফিরে আসেন।
পাকিস্তান থেকে ফিরে আসার পরে যোগেন মণ্ডল পশ্চিমবঙ্গে অজ্ঞাতনামা জীবনযাপন করেন। পূর্ববঙ্গের নমশূদ্র দলিতদের বিশাল অংশ তখন পশ্চিমবঙ্গমুখী উদ্বাস্তু। যোগেন মণ্ডল এদের মাঝে গিয়ে আবার নতুন করে তাঁর বহুজনবাদী রাজনীতির চর্চা করতে মনস্থ করেছিলেন। উদ্বাস্তুদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকারের দাবিতে সে সময় রিফিউজি কাউন্সিল গঠন করে সত্যাগ্রহে নামলে যোগেন মণ্ডলের রাজনৈতিক উত্থানে শঙ্কিত কংগ্রেস ও প্রথাগত বামপন্থীরা সেদিন প্রায় মিলিতভাবেই তাঁকে কোণঠাসা করেছিল। এ রকম অবস্থাতেই ৬৪ বছর বয়সে ১৯৬৮ সালের ৫ অক্টোবর বনগাঁয় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। ১৯০৪-এ আগৈলঝাড়া থেকে যে সংগ্রামী জীবনের শুরু, সারা জীবন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় অন্তর্ভুক্তিমূলক সর্বজনবাদী (Inclusive) রাজনীতির ডাক দিয়ে হঠাৎই তিনি বিদায় নিয়েছিলেন সাংগঠনিকভাবে প্রায় নিঃসঙ্গ অবস্থায়।
বিস্মৃতি ও প্রাসঙ্গিকতা
যোগেন মণ্ডলের মৃত্যু ভারতে যেমন বর্ণ হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিবিদদের একাংশকে স্বস্তি দিয়েছিল, তেমনি করাচি থেকে তাঁর পশ্চিমবঙ্গে চলে আসাও পাকিস্তানে নিম্নবর্গের মানুষের সঙ্গে মুসলিম লীগের দক্ষিণপন্থী এলিট নেতৃত্বের বিচ্ছিন্নতা নিশ্চিত করেছিল। তারই দ্রুতলয়ের ফসল বাংলাদেশ। হয়তো প্রায় একই কারণে আজও বাংলাদেশে, পশ্চিমবঙ্গে, পাকিস্তানে যোগেন মণ্ডল বিস্মৃত। পশ্চিমবঙ্গের বর্ণহিন্দুদের বিবেচনায়, যোগেনের কারণেই পূর্ব বাংলা পূর্ব পাকিস্তান হয়েছিল। যে জন্য তারা যোগেনকে বলতেন ‘যোগেন আলী মোল্লা’। পাকিস্তানের জিন্নাহ-পরবর্তী মুসলিম লীগ মনে করে, ১৯৫০-এ যোগেনের ভারতে আশ্রয় গ্রহণ পাকিস্তান-চেতনার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা।
কিন্তু বাংলাদেশ যোগেন মণ্ডলকে কেন ভুলে গেছে? বাংলাদেশ ছিল দক্ষিণ এশিয়ায় প্রবল সংস্কৃতির বিরুদ্ধে নিপীড়িত জাতিসত্তার প্রথম সফল রাষ্ট্র। সাতচল্লিশে এখানে ‘ম্লেচ্ছ’ আর ‘তফসিলী’রা পূর্ব পাকিস্তানকে নিশ্চিত করেছিল আর একাত্তরে একই জোট পাঞ্জাবি কর্তৃত্বকে প্রত্যাখ্যান করে এ ভূখণ্ডে পাকিস্তানের সমাধী রচনা করেছিল। বস্তুত, জাতিঘৃণা প্রত্যাখ্যানে যোগেন মণ্ডলের সেই শিক্ষা যে বাংলাদেশের ধমনিতে এখনো বহমান, তার একটা বড় নজির রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার ক্ষেত্রে স্থানীয় সমাজের সচেতন ঐকমত্য। সাতচল্লিশে এবং একাত্তরে দু-দুটি সফল সংগ্রাম শেষে যোগেনের স্বপ্নের ইনক্লুসিভ রাজনীতির প্রতি এ দেশের সাধারণ মানুষের সমর্থন প্রশ্নাতীত। কিন্তু শাসক এলিটদের কারণেই সাতচল্লিশ-পরবর্তী ভারত-পাকিস্তান এবং একাত্তর-পরবর্তী বাংলাদেশের ‘প্রবল’ জাতিসত্তাগুলো আজও ‘অপর’কে ধারণ করে নতুন সমাজ নির্মাণ করতে সমর্থ হয়নি। সে জন্যই আজও যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের ‘বহুজনবাদী’ রাজনীতির প্রাসঙ্গিকতা শেষ হয়নি। এই রাজনৈতিক-দার্শনিক বোঝাপড়া ছাড়া বাংলাদেশ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এগোতে পারবে বলে মনে হয় না।
২০১০ সালে প্রকাশিত দেবেশ রায়ের সুবৃহৎ উপন্যাস ‘বরিশালের যোগেন মণ্ডল’ নিকট ইতিহাসকে অবলম্বন করে লেখা। উপন্যাসের কালপর্ব মোটামুটিভাবে স্বাধীনতার আগের কয়েকটি দশক। সময়টা একদিকে যেমন ঘটনাবহুল, তেমনি নানা বিতর্কের আধার। যোগেন মণ্ডল বাংলার রাজনীতি বা ইতিহাসের আলোচনায় মাঝে পরিণত হয়েছিলেন এক বিস্মৃত মানুষে। খুব সম্প্রতি তাকে নিয়ে নতুন করে চর্চা শুরু হয়েছে। আর সেই চর্চায় সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাধারার একটা প্রত্যক্ষ ভূমিকা আছে। বাবরি মসজিদের ভাঙন, রাম মন্দির আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে হিন্দুত্ববাদের নয়া উত্থান ও রাজনৈতিক স্তরে তার ক্ষমতা দখলের প্রেক্ষাপটে দলিত-সংখ্যালঘু সমীকরণটি নতুন করে রাজনীতিতে প্রয়োগ করতে চাইছেন অনেকেই। এ কারণেই গত সিকি শতাব্দীর মধ্যে রচিত আখ্যানের মধ্যে দেবেশ রায়ের এই মহাগ্রন্থ বিশেষ তাৎপর্যে মণ্ডিত হয়ে গেছে। শুধু সাহিত্য আলোচনার জগতেই নয়, রাজনীতি সমাজবিজ্ঞান চর্চার জগতেও এটি এখন গুরুত্বপূর্ণ চর্চার বিষয়। ২০২৪ এর আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে পরে তথ্যমন্ত্রী হওয়া মাহফুজ আলমের নানা বক্তৃতাও যোগেন মন্ডলকে সামনের দিকে নিয়ে আসে।
যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল আজ প্রায়-বিস্মৃত। কিন্তু তাঁর স্বপ্ন—দলিত ও মুসলমানের ঐক্য, বহুজনবাদী অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি—আজও দক্ষিণ এশিয়ার সামনে জ্বলন্ত এক প্রশ্ন হয়ে আছে। কাশ্মীর, বেলুচিস্তান, তামিলনাড়ু, চাকমা-সান্তালদের সংকট, রোহিঙ্গা সমস্যা—সবই বহুজনবাদী রাজনীতির অনুপস্থিতিজনিত সংকটের কথাই জানান দিচ্ছে। যোগেন মণ্ডল সেই স্বপ্নের প্রথম স্থপতি। তাঁর জীবন ও সংগ্রাম আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, নিপীড়িতের ঐক্যই পারে একটি ন্যায়সংগত, অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তুলতে। যে স্বপ্নের বাস্তবায়ন আজও অধরা।










