প্রলয়ের প্রয়াণে থমকে যাওয়া সপ্তসুরে নতুন ছন্দ

আগস্টের শেষ সপ্তাহ থেকে প্রতি শুক্র ও শনিবার বসছে ‘সপ্তসুর’-এর এই সুরের আসর। ছবি: আগামীর সময়
গানে গানে মুখরিত পাবনা শহরের চিরচেনা বিকালগুলো হঠাৎই একদিন থমকে গিয়েছিল অজানা এক স্তব্ধতায়। যে প্রবীণ গুণী মানুষটি বিনামূল্যে শহরের তরুণদের বুকে গানের বীজ বুনে দিতেন, যার হাত ধরে অনেকেরই পথচলা শুরু হয়েছিল সংগীতের জগতে— সেই প্রলয় চাকী আজ না-ফেরার দেশে। কিন্তু মৃত্যু কি সব স্বপ্নের ইতি টানতে পারে?
বাবার রেখে যাওয়া সেই অসমাপ্ত স্বপ্নের মশাল এবার হাতে তুলে নিয়েছেন তার সন্তান সানি চাকী। প্রলয় চাকীর চেনা সুরের আঙিনা আবারও ফিরে এসেছে— নতুন ঠিকানায়, নতুন আয়োজনে। শহরের গোপালপুরের আব্দুল মান্নান মিয়ার গলিতে ফের জমে উঠছে সুরেলা আড্ডা আর গানের অনুশীলন। আগস্টের শেষ সপ্তাহ থেকে প্রতি শুক্র ও শনিবার বসছে ‘সপ্তসুর’-এর এই সুরের আসর।
পাবনার সংগীতানুরাগীদের কাছে ‘সপ্তসুর’ শুধু একটি সংগঠনের নাম নয়; নতুন প্রজন্মের শিল্পী গড়ে তোলার এক নিভৃত আশ্রম। প্রয়াত জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী প্রলয় চাকীর হাত ধরে ২০১২ সালে শুরু হয়েছিল এই সুরের যাত্রা। এর পেছনে ছিল একটি মহৎ উদ্দেশ্য— নতুন প্রজন্মকে সংগীতের পথে এগিয়ে নেওয়া।
প্রথাগত গান শেখানোর পাশাপাশি পরিবেশনের নানা সূক্ষ্ম কৌশলও তিনি শেখাতেন পরম মমতায়। মাইক্রোফোন ব্যবহারের সঠিক পদ্ধতি, গানের মধ্যে শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণ, স্কেল ও কর্ডের প্রাথমিক ধারণা থেকে শুরু করে উচ্চাঙ্গ সংগীতের তালিম— সবকিছুরই ব্যবস্থা ছিল সেখানে। উচ্চাঙ্গ সংগীত শেখানোর জন্য ছিলেন আলাদা প্রশিক্ষকও। আর পুরো আয়োজনটিই চলত সম্পূর্ণ বিনামূল্যে।
গানের মানুষ প্রলয় চাকী খাঁটি প্রতিভার খোঁজে ঘুরে বেড়াতেন শহরের আনাচে-কানাচে। অটোরিকশা চালাতে চালাতে আনমনে কেউ গান গাইছেন— এমন সুর কানে এলেও তিনি থমকে দাঁড়াতেন, পরম আদরে তাকে ডেকে আনতেন ‘সপ্তসুর’-এর আঙিনায়।
শুধু গান শেখানোতেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি প্রলয় চাকী। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, নতুন শিল্পীদের আত্মপ্রকাশের জন্য প্রয়োজন একটি উপযুক্ত প্ল্যাটফর্ম। সেই ভাবনা থেকেই ছেলে সানি চাকীর সঙ্গে পরামর্শ করে পাবনায় প্রতিষ্ঠা করেন ‘স্টুডিও কৃত্রিম’ নামে একটি আধুনিক রেকর্ডিং স্টুডিও।
সেখান থেকে সপ্তসুরের তরুণ শিল্পীদের গান ছড়িয়ে পড়তে থাকে বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে। দেশ-বিদেশের অগণিত শ্রোতার মন জয় করার পাশাপাশি দেশের অনেক কিংবদন্তি ও গুণী শিল্পীর প্রশংসাও কুড়ায় তাদের এই প্রয়াস।
তবে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে বন্ধ হয়ে যায় সপ্তসুরের নিয়মিত কার্যক্রম। চেনা সেই গান আর আড্ডার বিকালগুলো আবার ফিরে আসবে— এমন স্বপ্ন বুক বেঁধে রেখেছিলেন প্রলয় চাকী। কিন্তু সেই পুনর্জাগরণ আর দেখে যাওয়া হয়নি তার। ২০২৫ সালের ১১ জানুয়ারি তিনি পাড়ি জমান না-ফেরার দেশে।
বাবার সেই অসম্পূর্ণ অনুভূতির প্রদীপটি নিভে যেতে দেননি সন্তান সানি চাকী। বাবার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে নতুন করে সাজিয়েছেন সপ্তসুরকে।
সানি চাকী বলেছেন, ‘বাবার মূল ভাবনাকেন্দ্রিক জায়গাটি অক্ষুণ্ন রেখেই সপ্তসুরের কার্যক্রম আবার শুরু হয়েছে। নিয়মিত রেওয়াজ ও আগের প্রশিক্ষণগুলোর পাশাপাশি এবার শিশু-কিশোরদের জন্য গিটার ও ছবি আকা শেখার বিশেষব্যবস্থা থাকছে। এ ছাড়া সেটেও আনা হয়েছে আধুনিকতার ছোঁয়া— রাতের শহর ও ছাদের আবহ তৈরি করে সেট ডিজাইন করা হয়েছে। লাইটিং ও ক্যামেরার কাজ শেষ হলেই শিল্পীদের রেওয়াজ ও লাইভ পরিবেশনা সরাসরি অনলাইনে দেখতে পাবেন দর্শক-শ্রোতারা।’
প্রলয় চাকীর সুরের উত্তরাধিকার বয়ে নিয়ে সানি চাকী ও সপ্তসুরের তরুণ শিল্পীরা এখন নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। পাবনার সাংস্কৃতিক অঙ্গনে প্রাণ ফিরিয়ে আনা এই পথচলায় তারা সবার ভালোবাসা ও সহযোগিতা চেয়েছেন।










