অতীত বনাম ভবিষ্যৎ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
হিন্দি ভাষায় ‘আগে’ মানে যে ‘পরে’— সেটি বুঝতে আমার বেশ সময় লেগেছে। শৈশবে আমাদের সীমান্ত এলাকার মফস্বল শহরে ভারতের জাতীয় টেলিভিশন চ্যানেল দূরদর্শন দেখা যেত। বিটিভির অনুষ্ঠানের পাশাপাশি আমরা ডিডি বা দূরদর্শনের অনুষ্ঠানমালা দেখতে পেতাম। তাতে হিন্দি ভাষায়ও আমরা বেশ সড়গড় হয়ে উঠছিলাম। লক্ষ করছিলাম, বাংলা ভাষার সঙ্গে এই ভাষার অনেক মিল। কিন্তু আমার শিশুমন এই ‘আগে’ শব্দটায় এসে খটকায় পড়ে যেত। ‘আগলিবার’ মানে যে পরের বার, এইটা মানতে আমার অভ্যাসে বাধত।
সামনেটা কী করে পেছনে আর পেছনটা কী করে সামনে হয়ে যায়? অতীত কী করে ভবিষ্যৎ আর ভবিষ্যৎ কী করে অতীত হতে পারে?
আমরা বাঙালি আর ভারতীয়রা কি সময়কে উল্টো করে দেখি?
এটা বোধ হয় একটু কষ্টকল্পনা হয়ে যেত আমাদের। আমরা দক্ষিণ-এশীয়রা একই ইতিহাস আর জলহাওয়ায় এতকাল বসবাস করেছি যে আমাদের চিন্তা ও পরিপাকতন্ত্রের খুব বেশি তফাত কল্পনা করা কঠিন।
তবে একটা ব্যাপার জেনে ভিরমি খেলাম। দক্ষিণ আমেরিকার আন্দেজ পর্বতমালার পাদদেশে চিলি, বলিভিয়া, পেরু আর আর্জেন্টিনার মাঝামাঝি অঞ্চলে একটি জাতি আছে, যাদের নাম আইমারা। এ ভাষায় অতীত হচ্ছে এমন একসময়, যেটি সামনে থাকে, আর ভবিষ্যৎ থাকে পেছনে। এটি শুধু রূপকার্থে নয়। অতীতকাল-সংক্রান্ত ক্রিয়াপদ উচ্চারণের সময় সামনের দিকে দেহভঙ্গি করে, যেন অতীতকালটা তাদের সামনে আছে। আর ভবিষ্যৎকাল সম্পর্কে কিছু বলার সময় তারা পেছনদিক নির্দেশ করে।
এটি কীভাবে ঘটল, এ নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে ভাষাবিদরা বেশ বিস্মিত হলেন। আইমারা জনগোষ্ঠীর কাছে অতীত সামনে থাকে, কেননা অতীতকে দেখা যায়। অতীত সম্পর্কে আমাদের কাছে সবরকম তথ্যপ্রমাণ আছে। আর ভবিষ্যৎ যেহেতু অদৃশ্য, অনির্দিষ্ট, সে কারণে সেটি থাকে পেছনে। সে কারণে আইমারা জনগোষ্ঠী অতীতের দিকে এগিয়ে যায়। ভবিষ্যৎ এমন একটা কিছু, যা মানুষকে পেছনে টেনে রাখে।
এখানে একটা মজার ব্যাপার আছে। আমরা যখন আগামী বৃহস্পতিবারের কথা বলি, তখন আমরা একটা সময়রেখার ছবি কল্পনা করে নিই, আর তাতে ভবিষ্যতের দিনগুলো আমরা সামনে রাখি। ভাষাবিদরা বলছেন, এই মানসছবিটা নিরপেক্ষ নয়। আমাদের এতে অভ্যস্ত করানো হয়েছে। চিন্তার একটা নির্দিষ্ট সংস্কৃতির ভেতরে আমরা বড় হয়েছি।
এখন কথা হলো, অন্য ভাষাগুলোয় সময়কে যে ভিন্নভাবে বর্ণনা করা হয়, এটি কি শুধুই একটা বর্ণনাগত তফাত? রাফায়েল নুনেজ নামে এক কগনিটিভ সায়েন্টিস্ট বলছেন, ভিন্ন ভিন্ন ভাষাগোষ্ঠীর লোকদের অভিজ্ঞতার জগৎটাই আসলে ভিন্ন থাকে। এ কারণে ভাষার মধ্যে সেটার ছাপ পড়ে। আমরা যে সময়রেখা কল্পনা করি, সেটাকে অতীত থেকে ভবিষ্যতের দিকে প্রবহমান একটা রেখা হিসেবে দেখি। এখানে সামনে-পেছনে, আগে-পরে যেন আমাদের ইচ্ছাধীন কোনো সজ্জা নয়। এটার সঙ্গে নিয়তির ধারণা যুক্ত থাকে।
আইমারা জনগোষ্ঠীর কাছে সময়ের অভিজ্ঞতা ভিন্ন। তাদের কাছে সময়ের সজ্জা ইচ্ছাধীন। সময় তাদের কাছে প্রবহমান রেখা নয়। অতীত ও ভবিষ্যৎ একই রেখার দুটি ভিন্ন বিন্দু নয় তাদের ধারণায়। এগুলো ভিন্ন ধরনের অভিজ্ঞতামাত্র। নুনেজ বলছেন, ভাষা সময়কে শুধু মাপে না, ভাষা ঠিক করে দেয় সময়ের মধ্যে আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে আছি।
এক হিসাবে দেখলে,
ভাষাই ঠিক করে দেয়, আমরা আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে কী চোখে দেখব। আমরা আমাদের রাষ্ট্র
ও সমাজকে কীভাবে গড়ে তুলব। আমাদের মনুমেন্টগুলো শহরের কেন্দ্রে থাকবে, নাকি থাকবে শহরের
প্রান্তদেশে। আমাদের শোভাযাত্রার নাম মঙ্গল শোভাযাত্রা হবে, নাকি আনন্দ শোভাযাত্রা—
তারও শিকড় নিহিত আসলে ভাষার অভিজ্ঞতার ভেতরে। এমনকি এই শোভাযাত্রা কোন কোন রাজপথ দিয়ে
এগিয়ে যাবে— তাও নির্ধারিত থাকে আমাদের ভাষার মধ্যে।



