নোয়াখালীর বােরামাসি গান

বােরামাসি গীত বা গান বিশ্বের সব ভাষা ও সাহিত্যে দেখা যায়। তবে এই শ্রেণির গীত সবচেয়ে বেশি দেখা যায়, বাংলা সাহিত্যে ও বাংলাদেশে। এ দেশে বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন যুগ ও সময়ের বারোমাসি গীত এত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে, সেকালের লৌকিক বা অভিজাত কোনো সাহিত্য শাখাতেই এমন কোনো কবি ছিলেন না; যিনি একটি বারোমাসিও রচনা করেননি। বিশেষ বিশেষ দেব-দেবীর বন্দনা বা মাহাত্ম্য-কীর্তন এবং পৌরাণিক; ইতিহাসভিত্তিক বা সামাজিক ঘটনা, প্রেম এবং কৃষিকর্ম— এগুলো হচ্ছে বারোমাসির বিষয়। নোয়াখালীর সর্বত্রই বারোমাসি গান অত্যন্ত জনপ্রিয়।
আমাদের লোকসাহিত্যের বারোমাসিতে এমন
কিছু তথ্য রয়েছে যা সাহিত্যিক, সামাজিক এবং ঐতিহাসিক দিক থেকে মূল্যবান। কথা এখানে সবিশেষ উল্লেখ করা যায়। প্রায়ই প্রবাসী নোয়াখালীবাসীর ঘরে ঘরে গুঞ্জরিত বিরহের এ বারোমাসি; এ তার লোকগীতির মূল সুর। এখানে তা উদ্ধৃত করছি:
আসিবে আগন মাস অল্প অল্প শীত।
তুমি বন্ধু বৈদেশে গেলে কে করবে পিরিত।।
কালিধানের নোয়ার ভাত খাবে খাবে ঘরে ঘরে।
তোমারে হারায়ে আমি সে ভাত দিব কারে।
নোয়াখালী জেলায় একসময় প্রচুর বারোমাসি গান শোনা যেত। প্রেমসংগীত ধাঁচের এ বারোমাসিতে যে আর্তি ও চিত্র ফুটে উঠেছে, তা সত্যিই অপূর্ব। একজন নারীর আকুল প্রেম ও বিরহ-বেদনা রসে গীতিগুলো সিক্ত ও প্লাবিত। এখানেই এ জেলার বারোমাসির সৌন্দর্য ও মাধুর্য প্রকাশিত। যেমন—
ছোকরা বন্ধু যাইছ না বিদেশে
তর লাই আমার দিল কান্দে—
ডেঁই আতালের কুঁড়া খাইয়া
তেল দিমু তোর বাবরিতে।
চালের কুঁড়া খেয়ে জীবন ধারণ করেও অপ্রবাসী স্বামীর বাবরিতে তেল দেওয়ার আকুতি এ জেলার ঘরে ঘরে, তারই সুর বেজে উঠেছে আলোচ্য বারোমাসি গানে। বারোমাসি হলো নিঃসঙ্গ নারীমনের বিভিন্ন সময়ের বিবর্তনে যে দুঃখ-বেদনা ও প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় তারই প্রতিচ্ছবি মাত্র। এসব দৃশ্য ও দুঃখের বর্ণনা আদিবাসীদের লোকসাহিত্যে যেমন ছিল; তেমনি ছিল মধ্যযুগের লোকসাহিত্যেও। একজন বিরহিনী নারীর সংসারের সুখ-দুঃখের সজীব চিত্র বারোমাসিতে রূপবাণীর মতো চিত্রায়িত হয়। বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলেও প্রচলিত একটি বারোমাসির ভিন্ন পাঠ নোয়াখালী জেলায় শোনা যায়—
অগ্রাণ মাসে থরে-থরে
পৌষ মাসে পড়ে জাড়
মাঘের শীত পড়ল নারীর বুকেতে বুকেতে
কত পাষাণ বাইন্দছেন পতি রইলা বিদেশে।
‘শান্তির বার মাই’ নামে এ জেলায় প্রচলিত বারোমাসিটির শুরু এবং শেষ এভাবে—
বনে থাকে বন হরিণী বনের পাতা খায়
জলতৃষ্ণা লাগলে হরিণ গো সই নদীর কূলে যায়।
ও কি মাস ওরে।
এই মাস গেলরে শান্তর না পুরিল আশ।
নব রঙ-ছুরুত লইয়া সামতে ভাদ্র মাস।।
ভাদ্র তো মাসের ধানে করে থোড়।
কুড়াইয়া বলে কুডুম কুডুম,
কুড়নী বলে রইয়া
কত কাল বঞ্চিব আমি গো সই লোকের বৈরী হইয়া
ও কি মাস ওরে।
বারো মাসে তের ফল রে লহরে গুনিয়া
এ গীদের ভুনতি করে শ্রী দাস বানিয়া
শ্রী দাস বানিয়া না রে কালা বতির বাপ
যে শুনিবে সে গাইবে গো
সই তার কণ্ঠের ছাড়ে বাপ
ও কি মাস ওরে।
পরিশেষে এ কথা বলা যায়, নোয়াখালীর বারোমাসি গান বাংলার লোকসাহিত্যে এক বিপুল ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিস্তার করে আছে, যা লোকায়ত বাংলার চিরায়ত সম্পদ।
লেখক: শিক্ষাবিদ ও লেখক





