ইতিহাসের অংশ হচ্ছে রামিসা হত্যার রায়

প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার। ছবি : সংগৃহীত
শিশু ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় দ্রুত বিচার নিয়ে নতুন এক অধ্যায়ের সাক্ষী হতে যাচ্ছে দেশ। ১৪৪ বছর আগে ব্রিটিশ আমলে নদীয়ার এক শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় বিচার শুরুর দিনই রায় হয়েছিল। স্বাধীন বাংলাদেশেও কয়েকটি আলোচিত মামলায় নজিরবিহীন গতিতে বিচার শেষ হয়েছে। বাগেরহাটের সাত বছরের শিশু, মাগুরার আছিয়া কিংবা মেহেরপুরের ৯ বছরের শিশুকে ধর্ষণের মামলাগুলোতে অল্প সময়ের মধ্যেই রায় ঘোষণা করেছিলেন আদালত। তবে সেসব রেকর্ড ভেঙে এবার মাত্র পাঁচ কার্যদিবসে শেষ হতে যাচ্ছে রাজধানীর পল্লবীর শিশু রামিসা আক্তার ধর্ষণ ও হত্যা মামলার রায়।
আজ রবিবার রায়ের মধ্য দিয়ে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে কম সময়ে বিচার শেষ হওয়ার নতুন নজির স্থাপিত হতে পারে, যা একই সঙ্গে দ্রুত বিচার এবং শিশু নির্যাতনের ঘটনায় রাষ্ট্রের কঠোর অবস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
রাজধানীর পল্লবীতে শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর হত্যা মামলার রায় হচ্ছে আজ রবিবার। ঈদের ছুটি শেষে গত ১ জুন অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে এ মামলার বিচার শুরু হয়। মাত্র পাঁচ কার্যদিবসে এত দ্রুত সময়ে কোনো মামলার রায় দেওয়ার নজির এ দেশে নেই। সে হিসাবে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে কম সময়ে বিচার শেষ হওয়ার রেকর্ড গড়তে যাচ্ছে মামলাটি।
ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেহীন এ রায় ঘোষণা করবেন। রায়ে প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের সাজা নির্ধারণ করা হবে।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু আগামীর সময়কে বলেছেন, দুই আসামির বিরুদ্ধে সাক্ষ্য-প্রমাণে অভিযোগ নিরঙ্কুশভাবে প্রমাণিত হয়েছে। আইন অনুযায়ী, বিরতিহীনভাবে মামলার বিচারকাজ পরিচালিত হয়েছে। সরকারের আন্তরিকতায় দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে কম সময়ে মামলাটির রায় হতে যাচ্ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
অন্যদিকে, আসামিপক্ষে রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী মুসা কালিমুল্যাহ বলেছেন, ‘আইনের বাধ্যবাধকতার কারণে দুই আসামির পক্ষে নিযুক্ত হয়েছি। আদালতের কাছে ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করছি।’
রামিসার বাবা ও মামলার বাদী আব্দুল হান্নান মোল্লার কাছে আজকের দিনটি শুধু একটি মামলার রায়ের দিন নয়, একজন সন্তানের জন্য ন্যায়বিচার পাওয়ার প্রত্যাশার দিনও। তিনি আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘এই রায় বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। একজন বাবা হিসেবে আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি প্রত্যাশা করছি। সেই শাস্তি যেন দ্রুত কার্যকর হতে দেখি। এটিই আমার একমাত্র চাওয়া।’
গত ১৯ মে রাজধানীর পল্লবীতে প্রতিবেশী সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের ফ্ল্যাট থেকে রামিসার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ওইদিনই রামিসার বাবা দুজনকে আসামি করে পল্লবী থানায় মামলা করেন। ঘটনার পরপরই দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
২০ মে সোহেল রানা আদালতে দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দেন। এরপর ২৪ মে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও পল্লবী থানার উপপরিদর্শক অহিদুজ্জামান দুই আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। একই দিন ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আশরাফুল হক অভিযোগপত্র গ্রহণ করে মামলাটি বিচারের জন্য শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে পাঠান। পরে ট্রাইব্যুনাল অভিযোগপত্র আমলে নিয়ে বিচার শুরুর আদেশ দেন।
ঈদের ছুটি শেষে ১ জুন অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরু হয়। পরদিন মাত্র চার ঘণ্টায় রামিসার মা-বাবা, বোনসহ ১৬ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। ৩ জুন আত্মপক্ষ সমর্থনে সোহেল রানা নিজের অপরাধ স্বীকার করে আদালতের কাছে ক্ষমা চান। তবে স্বপ্না আক্তার নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন। ৪ জুন যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে আদালত রায়ের জন্য ৭ জুন দিন ধার্য করেন।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. সরকার আলী আককাস বলেছেন, রায়ের পর প্রক্রিয়াগুলোর দ্রুততাও নিশ্চিত করতে হবে এবং শুধু এই মামলা নয়, সব মামলার ক্ষেত্রেই যৌক্তিক সময়ে বিচার নিশ্চিত করতে উদ্যোগ নিতে হবে।




