হাইকোর্ট
চুক্তিভিত্তিক লেনদেনে প্রতিশ্রুতি পালনে ব্যর্থ হওয়া প্রতারণা নয়

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
‘বৈধ ব্যবসায়িক বা চুক্তিভিত্তিক লেনদেনের পরে টাকা পরিশোধ না করা বা চুক্তি প্রতিপালনে ব্যর্থ হওয়া ‘ফৌজদারি প্রতারণা’ হিসেবে গণ্য হবে না। সেক্ষেত্রে বিষয়টি দেওয়ানি (সিভিল) বিরোধ হিসেবে বিবেচিত হবে।’ একটি ক্রিমিনাল রিভিশন মামলার পূর্ণাঙ্গ রায়ে এই পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন হাইকোর্টের বিচারপতি মো. সেলিম।
গত ১২ মে এ বিষয়ে সংক্ষিপ্ত রায় প্রদান করা হয়। সম্প্রতি পূর্ণাঙ্গ রায়টি প্রকাশ করা হয়েছে সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে।
এতে হাইকোর্ট বলেছেন, ‘প্রতারণার উদ্দেশ্য অপরাধ সংঘটনের সময়ই বিদ্যমান ছিল— এটি প্রমাণ করতে হবে। পরবর্তী সময়ে কোনো আচরণ বা প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি পালন করতে ব্যর্থ হওয়া মাত্রই দণ্ডবিধির ৪১৫ ধারার অধীনে অপরাধ (ফৌজদারি প্রতারণা) হিসেবে গণ্য হবে না।’
পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ‘সব স্বাভাবিক ব্যবসায়িক লেনদেনের ক্ষেত্রেই মৌখিক বা লিখিত কোনো না কোনো চুক্তির অস্তিত্ব নিহিত থাকে। কোনো পক্ষ যদি বাকিতে পণ্য ক্রয়ও করে, তবুও সাধারণত ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে কিছু শর্ত নির্ধারিত হয়, যা একটি চুক্তি হিসেবে গণ্য হয়। প্রত্যেক ক্ষেত্রে লিখিত চুক্তি থাকা আবশ্যক নয়।’
এতে আরও বলা হয়, ‘বর্তমান মামলায় পক্ষদ্বয়ের মধ্যে দুটি লিখিত চুক্তি বিদ্যমান ছিল। অভিযোগকারীর সঙ্গে অভিযুক্তের পূর্বেও ব্যবসায়িক লেনদেন ছিল এবং আমাদের আলোচনায় প্রতীয়মান হয়েছে যে, সংশ্লিষ্ট লেনদেনটি ছিল একটি নিয়মিত ও স্বাভাবিক ব্যবসায়িক লেনদেন। অতএব, অভিযুক্তের কোনো দায় থেকে থাকলে তা দেওয়ানি (সিভিল) প্রকৃতির, ফৌজদারি নয়।’
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১১ সালে সুখচান আলী নামে এক ব্যক্তি অভিযোগকারী আম্বিয়া বেগমের কাছ থেকে জমি বন্ধকের বিনিময়ে দুই দফায় মোট ৮০ হাজার টাকা নেন এবং প্রতি বছর ২৪ মণ ধান দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। পরে তিনি সেই প্রতিশ্রুতি পালন করেননি এবং টাকা বা ধান ফেরত দেননি। এ ঘটনায় তার বিরুদ্ধে প্রতারণা ও বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগে মামলা করেন আম্বিয়া বেগম।
বিচারিক আদালত সুখচানকে দুই ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে এক বছর কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেন। পরে আপিল আদালত ৪০৬ ধারার অভিযোগ থেকে খালাস দিলেও ৪২০ ধারায় ছয় মাসের কারাদণ্ড বহাল রাখেন। এই দণ্ডের বিরেুদ্ধে হাইকোর্টে ক্রিমিনাল রিভিশন পিটিশন করেন সুখচান। হাইকোর্ট রিভিশন শুনানিতে পর্যবেক্ষণ করেন যে, প্রতারণার অপরাধ প্রমাণ করতে হলে শুরু থেকেই অভিযুক্তের প্রতারণার উদ্দেশ্য ছিল- এটি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে হয়। শুধু কোনো চুক্তির শর্ত পরবর্তী সময়ে পালন না করা বা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করাই প্রতারণা নয়।
আদালত দেখতে পান, পক্ষদ্বয়ের মধ্যে এটি ছিল একটি সাধারণ ব্যবসায়িক বা আর্থিক লেনদেন, যেখানে লিখিত চুক্তিও ছিল। অভিযোগপত্রে এমন কোনো নির্দিষ্ট তথ্য নেই যা থেকে বোঝা যায় যে, টাকা গ্রহণের সময়ই অভিযুক্তের প্রতারণার উদ্দেশ্য ছিল। ফলে বিষয়টি ফৌজদারি অপরাধের চেয়ে দেওয়ানি (সিভিল) বিরোধের আওতাভুক্ত।
এ কারণে হাইকোর্ট মনে করেন, নিম্ন আদালত ও আপিল আদালত সাক্ষ্য-প্রমাণ যথাযথভাবে মূল্যায়ন না করে দণ্ড দিয়েছেন এবং আইনের ভুল প্রয়োগ করেছেন। ফলে এ বিষয়ে জারি করা রুল অ্যাবসোলিউট ঘোষণা করে আপিল আদালতের রায় বাতিল করেন হাইকোর্ট এবং সব অভিযোগ থেকে খালাস দেন সুখচান আলীকে।




