নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন
দ্রুত বিচারের মামলায়ও ধীরগতি
- এক বছরে ২০৩৮ মামলার ৭৫০টির তদন্ত শেষ হয়নি
- গত ৪ মাসে তদন্ত শেষ হয়েছে মাত্র ৯ শতাংশ মামলার
- জানুয়ারি-এপ্রিলে ৪০৩টি মামলা দায়ের, তদন্তাধীন ৩৬৭টি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
রাজধানীর হাজারীবাগের ১৬ বছরের একটি মেয়েকে গত বছরের ৩ মে এলাকারই একটি আবাসিক হোটেলে নিয়ে ধর্ষণ করার অভিযোগ ওঠে কথিত প্রেমিকের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় করা মামলাটির তদন্তের সময়সীমা শেষ হয়েছে ৫ আগস্ট। আর গত এক বছরে ১৭ বার সময় নিয়েও তদন্ত শেষ করতে পারেনি পুলিশ।
অন্য ঘটনায়, এসএসসি পরীক্ষার্থী একটি মেয়েকে ধর্ষণের অভিযোগে গত বছরের ২৬ এপ্রিল রাজধানীর কদমতলী থানায় মামলা করে ভুক্তভোগীর পরিবার। এরপর বছর পেরিয়েছে এবং ২০ বার সময় নিয়েও তদন্ত শেষ করতে পারেনি পুলিশ। অথচ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলার ‘তদন্তে সময় অর্ধেক’ করে দেয়। কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ে কোনো তদন্ত শেষ হচ্ছে না।
গত বছরের এপ্রিল থেকে চলতি এপ্রিল পর্যন্ত রাজধানীর ৫০ থানায় মোট ২০৩৮টি মামলা হলেও ৭৫০টির তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। বাকি ১২৮৮টির তদন্ত শেষে আদালতে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। তবে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে কোনো মামলার তদন্ত শেষ হয়নি। আর চলতি বছরের প্রথম চার মাসে হওয়া মামলার মাত্র ৯ শতাংশের তদন্ত শেষ হয়েছে।
আইনজ্ঞদের ভাষ্য, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ধারা ১৮ অনুযায়ী, এই আইনে মামলার তদন্ত নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে শেষ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। অভিযুক্ত ব্যক্তি হাতেনাতে গ্রেপ্তার হলে, গ্রেপ্তারের তারিখ থেকে পরবর্তী ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত শেষ করতে হবে। হাতেনাতে গ্রেপ্তার না হলে, প্রাথমিক তথ্যপ্রাপ্তি বা তদন্তের আদেশ পাওয়ার তারিখ থেকে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত শেষ করতে হবে।
আগে অনেক ক্ষেত্রে তদন্তের জন্য ৩০ কার্যদিবস সময় ব্যবহৃত হতো। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ঘোষণার পর ধর্ষণের মামলাগুলোর তদন্ত ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে শেষ করার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। অধিকাংশ মামলায় ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত সম্পন্ন হচ্ছে না। অনেক মামলায় তদন্ত মাসের পর মাস ধরে চলমান থাকে। ফরেনসিক রিপোর্ট, ডিএনএ পরীক্ষা, সাক্ষী সংগ্রহ, জনবল সংকট এবং তদন্তের অতিরিক্ত চাপ— এসব কারণে সময়সীমা প্রায়ই অতিক্রম করা হচ্ছে।
তবে আইন এ অবস্থার জন্যও ব্যবস্থা রেখেছে। ধারা ১৮(২) অনুযায়ী, যুক্তিসংগত কারণে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ করা সম্ভব না হলে তদন্ত কর্মকর্তাকে সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই কেস ডায়েরিসহ বিলম্বের কারণ উল্লেখ করে ট্রাইব্যুনাল বা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে লিখিত প্রতিবেদন দিতে হবে। আদালত সন্তুষ্ট হলে অতিরিক্ত ১৫ কার্যদিবস সময় দিতে পারেন। ডিএনএ পরীক্ষার প্রয়োজন হলে সময় আরও বাড়ানোর সুযোগও রয়েছে।
অন্যদিকে, তদন্ত কর্মকর্তা যদি বিলম্বের গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা দিতে ব্যর্থ হন, তাহলে ধারা ১৮(৬) অনুযায়ী তা অদক্ষতা ও অসদাচরণ হিসেবে গণ্য হতে পারে। এক্ষেত্রে ট্রাইব্যুনাল বা ম্যাজিস্ট্রেট সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করতে পারেন এবং বিষয়টি তার বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদনেও লিপিবদ্ধ হতে পারে। অতএব, আইন শুধু দ্রুত তদন্তের সময়সীমাই নির্ধারণ করেনি, তদন্ত কর্মকর্তা ও বিচার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জবাবদিহির ব্যবস্থাও রেখেছে। কিন্তু বাস্তব প্রয়োগে কাঙ্ক্ষিত গতি এখনো অর্জন করা সম্ভব হয়নি।



