ভাড়া বাসাকে স্থায়ী ঠিকানা দেখানোয় চাকরি গেল আবিদের

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
চাকরি করেছেন মোটে সাত মাস। এরপর আচমকা একদিন ধরিয়ে দেওয়া হলো চাকরি না থাকার চিঠি। অপরাধ— ভাড়া বাসাকে স্থায়ী ঠিকানা দেখানো। ঘটনা ফেনী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিতে; সহকারী জুনিয়র ইঞ্জিনিয়ার মাহতাব আবিদ রেছানীর সঙ্গে।
স্থায়ী ঠিকানা না থাকলেও চাকরি হবে, ভুল করলেও চাকরি হতে নেই বাধা— আদালত বা সমাজ সংস্কারকদের এই বার্তা কোনো কাজে দিচ্ছে না। দিলে কি আর আবিদের চাকরি যায়! চাকরি এমন সময় কেড়ে নেওয়া হলো, যখন তার স্ত্রী আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা।
বছর কুড়ি আগে মা-বাবার বিচ্ছেদে মায়ের সঙ্গে আবিদের বসত শুরু ঢাকার ভাড়া বাসায়। মিরপুরের পল্লবীতে। পরে সেখানেই বড় হন। বাবা কোনো খবর নেননি। মা সংগ্রাম করেছেন। লেখাপড়া শিখিয়েছেন। মা-ই সব। মায়ের ভাড়া বাসার ঠিকানা থেকেই স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলরের দেওয়া নাগরিকত্ব সনদে হয় জাতীয় পরিচয়পত্র বা এনআইডি। যেখানে স্থায়ী ঠিকানার কলামে লেখা হয় মায়ের ভাড়া বাসার ঠিকানা।
আবিদের নিয়োগ গত বছরের ৬ অক্টোবর। ১৩ দিন পর যোগদান। পুলিশ ভেরিফিকেশন হওয়ার কথা আগে। এখানে হলো উল্টো। চাকরি শুরুর পর শুরু পুলিশ ভেরিফিকেশন। স্থায়ী ঠিকানায় অমিল থাকার বিষয়টি উঠে আসে পুলিশের তদন্তে। বিষয়টি লুফে নেয় পল্লী বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (আরইবি) পবিস মানবসম্পদ পরিদপ্তর। ফেনী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি তাকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেয় ৮ জুন।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ফিরোজ মিয়া চাকরিচ্যুতির বিষয়টি মানতেই পারছেন না। নিয়োগ বাতিলকারী কর্তৃপক্ষের বিচার চেয়েছেন। তার মত, নিয়ম হলো পুলিশ ভেরিফিকেশনের পর চাকরির নিয়োগপত্র দেওয়া। কিন্তু একজন চাকরিরত অবস্থায় পুলিশ ভেরিফিকেশন করে তার নিয়োগ বাতিল করা বেআইনি। তা ছাড়া নিয়োগের আগেও পুলিশ ভেরিফিকেশনে যদি স্থায়ী ঠিকানার বিষয়টি আসত, তাতেও এ কারণে কাউকে চাকরিচ্যুত করার কোনো বিধান নেই। আবার কেউ চাইলে স্থায়ী ঠিকানা পরিবর্তনও করতে পারেন। যারা এ ধরনের কাজ করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে ভুক্তভোগী আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারেন।
এই জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ বলেছেন, ‘যেকোনো নাগরিকের দেশের যেকোনো স্থানে স্থায়ীভাবে বসবাস করার অধিকার সাংবিধানিক। ভাড়া বাসায় থাকলে হবে না— এমন কোনো কথা কোথাও উল্লেখ নেই। তাহলে যারা ভাসমান, তাদের কী হবে? এখানে স্থায়ী বসবাসের সপক্ষে প্রমাণ থাকলেই হলো। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বা পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর যদি সনদ দেন যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি উল্লিখিত এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা, তাহলে অন্য কারও এটি প্রত্যাখ্যান করার সুযোগ নেই। নিজস্ব বাড়িঘর বা জায়গাজমি না থাকা স্থায়ী বাসিন্দা চিহ্নিত করার মাপকাঠি হতে পারে না।
ফেনী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জ্যেষ্ঠ মহাব্যবস্থাপক মুহাম্মদ নুরুল হোসাইন আগামীর সময়কে জানান, পুলিশ ভেরিফিকেশনে মাহতাবের স্থায়ী ঠিকানা মেলেনি, যা নিয়োগ শর্তের পরিপন্থী। বিষয়টি আরইবিকে জানানোর পর তাদের সিদ্ধান্তে তাকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
উচ্চ আদালতের রায়
শুধু স্থায়ী বসবাসের ঠিকানায় অসংগতি বা পরিবর্তনের কারণে কোনো প্রার্থীকে চাকরি থেকে বঞ্চিত করা যাবে না বলে এর আগে এক রায়ে মত দিয়েছেন উচ্চ আদালত।
২০২১ সালে স্থায়ী ঠিকানা নিয়ে এমন জটিলতায় পড়েন আট ব্যক্তি। যারা ‘উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা’ পদে চাকরির জন্য প্রাথমিক লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর মৌখিক ও মেডিকেল পরীক্ষায়ও উত্তীর্ণ হন। কিন্তু ঠিকানা নিয়ে পুলিশ ভেরিফিকেশন প্রতিবেদনের কারণে এই আটজনকে বাদ দিয়ে এক হাজার ৬৫০ প্রার্থীকে নিয়োগ দেয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। পরে নিয়োগ না দেওয়ার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ২০২১ সালে উচ্চ আদালতে রিট আবেদন করেন তারা। সে রিটে জারি করা রুল নিষ্পত্তি করে ২০২২ সালের ২৪ অক্টোবর রায় দেন বিচারপতি কাশেফা হোসেন ও বিচারপতি কাজী জিনাত হকের বেঞ্চ। যেখানে রায়ের অনুলিপি পাওয়ার পর ৩০ দিনের মধ্যে আবেদনকারীদের নিয়োগ দিতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরকে নির্দেশ দেওয়া হয়।
বলা হয়, অন্য কোনো সমস্যা না থাকলে শুধু ঠিকানা-সংক্রান্ত একটি অসংগতির কারণে কেউ কোনো পদের নিয়োগ থেকে বঞ্চিত হতে পারেন না।
রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, একজন ব্যক্তি সব সময় একই ঠিকানায় বসবাস করবেন— এটি অযৌক্তিক এবং দুর্বল চিন্তা। যেকোনো সময় যেকোনো কারণে যে কারও বসবাসের ঠিকানা বা স্থায়ী ঠিকানার পরিবর্তন হতে পারে।
ওই সময় পুলিশের দেওয়া প্রতিবেদনে বেশির ভাগ রিট আবেদনকারী সম্পর্কে বলা হয়েছিল, তাদের ভাড়া বাড়িতে বসবাস করতে দেখা গেছে এবং তারা চাকরির আবেদনে যেসব ঠিকানা দিয়েছিলেন, সেখানে তাদের পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে আদালত পর্যবেক্ষণে বলেন, ‘আমাদের বিবেচিত মত হচ্ছে, ভাড়া বাড়িতে থাকা বা আত্মীয়ের বাড়িতে থাকা মোটেই অস্বাভাবিক কিছু না। আর্থিক এবং পারিপার্শ্বিক কারণে যে কারও স্থায়ী বসবাসের ঠিকানায় পরিবর্তন ঘটতে পারে।’
অতএব, আদালতের বিবেচনা হচ্ছে, একজন ব্যক্তির শুধু স্থায়ী ঠিকানা পরিবর্তনের কারণে তাকে বিধিবদ্ধ পদের কর্মসংস্থান থেকে বঞ্চিত করা যায় না।
এই রায়ের কথা স্মরণ করিয়ে দিলে ফেনী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জ্যেষ্ঠ মহাব্যবস্থাপক মুহাম্মদ নুরুল হোসাইন বললেন, ‘উচ্চ আদালতের বিষয়টি আমার জানার বিষয় নয়। এখানে পল্লী বিদ্যুতের সিদ্ধান্তে নীতিমালার আলোকে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তিনি (মাহতাব) চাইলে আইনের আশ্রয় নিতে পারেন।’
জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন বিধিমালা অনুযায়ী, ‘স্থায়ীভাবে বসবাসের স্থান, অর্থাৎ কোনো ব্যক্তির স্থায়ী ঠিকানা বা কোনো ব্যক্তি যে স্থানে ন্যূনতম ৩ (তিন) বৎসর যাবৎ বসবাস করিতেছেন অথবা নদী ভাঙ্গনে বা অন্য কোনো কারণে স্থায়ী ঠিকানা বিলুপ্ত হওয়ায় নূতন কোনো স্থানে যেকোনো সময়ের জন্য বসবাস করিতেছেন বা নূতন কোনো স্থানে কোনো স্থাবর সম্পত্তি ক্রয় করিয়া যেকোনো সময়ের জন্য উক্ত স্থানে বসবাস করিতেছেন।’
মাহতাব আবিদ রেছানী আগামীর সময়কে বলেন, ‘আমি যে স্থায়ী ঠিকানা ব্যবহার করেছি, ওই এলাকাতে ২০১১ সাল থেকে থাকি। মিরপুর ১১ নম্বরে প্রগতি উচ্চ বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে সেখান থেকে এসএসসি পাস করি। এর পর ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করি ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে। জন্মস্থান চাঁদপুরে হলেও মা-বাবার বিচ্ছেদের কারণে সেখানে আর যাইনি। ২০২৩ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর ইস্যু করা জাতীয় পরিচয়পত্রে ঠিকানা হিসেবে মিরপুরের পল্লবী এলাকার কথাই আছে। আবার ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন থেকে দেওয়া নাগরিকত্ব সনদেও উল্লেখ আছে একই এলাকার ঠিকানা।’
পুলিশ ভেরিফিকেশনে ঝামেলা আঁচ করতে পেরে মাহতাব স্থায়ী ঠিকানা সংশোধনের জন্য গত ২৩ ফেব্রুয়ারি ফেনী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিতে আবেদন করেন। সেখান থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে গত ১২ মার্চ আবেদন করেন আরইবিতে।
আবেদনে তিনি উল্লেখ করেন, ঢাকার ভোটার এবং স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলরের কাছ থেকে নাগরিক সনদপত্র নেওয়ায় পল্লবীকেই স্থায়ী ঠিকানা হিসেবে দেখিয়েছিলেন। পারিবারিক বিচ্ছেদের পরও পৈতৃক ঠিকানাকেই স্থায়ী ঠিকানা হিসেবে উল্লেখ করতে হবে, তা তিনি জানেন না। এখানে ব্যক্তিগত সুবিধা, জেলা কোটার সুযোগ (যদিও তার চাকরিতে জেলা কোটার কোনো বিষয় নেই) বা তথ্য গোপন করার কোনো ইচ্ছা ছিল না। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হওয়ায় বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিতে দেখারও আবেদন করেন মাহতাব।
সার্বিক বিষয়ে বক্তব্য জানতে ঢাকায় আরইবির পবিস মানবসম্পদ পরিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ মইনুল হাসানের মোবাইল ফোনে সোমবার একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও তার সাড়া মেলেনি।







