ভরণপোষণ আইন ২০১৩
জেল-জরিমানাতেও যায় না চাকরি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বৃদ্ধ মা-বাবার ভরণপোষণে অবহেলা করলে মামলা হতে পারে; হতে পারে লাখ টাকা জরিমানা। জরিমানা না দিলে জেল খাটতে হতে পারে তিন মাস পর্যন্ত। এতেও যায় না সরকারি চাকরি। চাকরি যেতে হলে লাগবে আরও বড় অপরাধ। সরকারি চাকরি আইন বলছে, চাকরি হারানোর জন্য প্রয়োজন ফৌজদারি মামলায় এক বছরের বেশি কারাদণ্ড। ফলে শাস্তির বিধান থাকলেও আইনটি অনেক ক্ষেত্রে প্রতীকী সতর্কবার্তাতেই আটকে আছে।
রাজধানীর মিরপুরে ৭৫ বছর বয়সী নুরজাহান বেগমের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় দেশ জুড়ে সন্তানদের দায়িত্ববোধ, পারিবারিক মূল্যবোধ এবং প্রবীণদের নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা চলছে। সামনে এসেছে মা-বাবার ভরণপোষণ না করার দায়ে দণ্ডিত হলে একজন চাকরীজীবীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি।
আইন ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন, ২০১৩-তে শাস্তির বিধান থাকলেও সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর কাঠামোর কারণে এ অপরাধে দণ্ডিত কোনো সরকারি কর্মচারীর চাকরি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হওয়ার সুযোগ নেই। তবে বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে তার বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার পথ খোলা থাকে।
নুরজাহান বেগমের মৃত্যুর ঘটনায় তোলপাড় সৃষ্টি হলে তার ছেলে আনিসুর রহমানকে ওএসডি করা হয়। এরপরই আলোচনায় আসে ২০১৩ সালের ভরণপোষণ আইন।
বৃদ্ধ মা-বাবার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ২০১৩ সালে প্রণয়ন করা হয় ‘পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন’। আইনটিতে ছেলে ও মেয়ের মধ্যে কোনো পার্থক্য করা হয়নি, অর্থাৎ মা-বাবার ভরণপোষণের দায়িত্ব উভয়ের সমান।
আইনের ৩ ধারায় বলা হয়েছে, প্রত্যেক সন্তান তার পিতা-মাতার ভরণপোষণ নিশ্চিত করতে বাধ্য। একাধিক সন্তান থাকলে আলোচনা ও সমঝোতার ভিত্তিতে দায়িত্ব ভাগ করে নিতে হবে। ভরণপোষণ বলতে শুধু অর্থ দেওয়া নয়; চিকিৎসা, পরিচর্যা, নিয়মিত খোঁজখবর রাখা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং মানসিক সহায়তা দেওয়াও এর অংশ।
সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ৪২ ধারা অনুযায়ী কোনো সরকারি কর্মচারী ফৌজদারি মামলায় মৃত্যুদণ্ড বা এক বছরের বেশি মেয়াদের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হলে রায়ের দিন থেকেই তার চাকরি স্বয়ংক্রিয়ভাবে অবসান হবে
কোনো সন্তান তার মা বা বাবাকে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বৃদ্ধনিবাস বা অন্য কোনো স্থানে থাকতে বাধ্য করতে পারবেন না। মা-বাবা আলাদা থাকলেও সন্তানদের নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
আইনের ৪ ধারায় দাদা-দাদি ও নানা-নানির ভরণপোষণের বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পিতার অবর্তমানে দাদা-দাদির এবং মায়ের অবর্তমানে নানা-নানির দায়িত্ব সন্তানের ওপর বর্তায়।
মা-বাবার ভরণপোষণ নিশ্চিত করা শুধু আইনি বাধ্যবাধকতা নয়; এটি একটি মৌলিক মানবিক ও নৈতিক দায়িত্ব
আইনের ৫(১) ধারা অনুযায়ী, কোনো সন্তান পিতা-মাতার ভরণপোষণে ব্যর্থ হলে সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন। অর্থদণ্ড, অনাদায়ে তাকে সর্বোচ্চ তিন মাসের কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে। শুধু সন্তানই নয়; কোনো সন্তানের স্ত্রী বা স্বামী, পুত্র-কন্যা কিংবা অন্য নিকটাত্মীয় যদি ভরণপোষণে বাধা দেন বা অসহযোগিতা করেন, তাহলে তারাও একই ধরনের শাস্তির মুখোমুখি হতে পারেন।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ফিরোজ মিয়া বলেছেন, ‘সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ৪২ ধারা অনুযায়ী কোনো সরকারি কর্মচারী ফৌজদারি মামলায় মৃত্যুদণ্ড বা এক বছরের বেশি মেয়াদের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হলে রায়ের দিন থেকেই তার চাকরি স্বয়ংক্রিয়ভাবে অবসান হবে।’
বর্তমান আইনে শাস্তির বিধান থাকলেও অভিযোগ দায়েরের সীমাবদ্ধতা এবং সামাজিক বাস্তবতার কারণে এর ব্যবহার এখনো খুবই সীমিত
‘পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন, ২০১৩-এ সর্বোচ্চ শাস্তি তিন মাসের কারাদণ্ড। ফলে শুধু এ আইনে দণ্ডিত হওয়ার কারণে কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারীর চাকরি স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলে যাওয়ার সুযোগ নেই’—যোগ করলেন তিনি।
ফিরোজ মিয়া মনে করিয়ে দেন, এক বছরের কম মেয়াদের কারাদণ্ড হলে চাকরি বহাল থাকলেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি প্রশাসনিক দায় থেকে মুক্ত হন না। এ ক্ষেত্রে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ চাইলে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত শুরু করতে পারে।
তার ভাষ্য, সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালার আওতায় তদন্তে অসদাচরণ বা শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ প্রমাণ হলে সতর্কীকরণ, তিরস্কার, বেতন বৃদ্ধি স্থগিত, পদাবনতি, বাধ্যতামূলক অবসর, চাকরি থেকে অপসারণ বা বরখাস্তসহ বিভিন্ন শাস্তি দেওয়া যেতে পারে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়য়ের সাবেক এই অতিরিক্ত সচিব বলছিলেন, ‘আদালতের দেওয়া ফৌজদারি দণ্ড এবং বিভাগীয় শাস্তি দুটি পৃথক বিষয়। ভরণপোষণ আইনে সাজা পাওয়ার কারণে চাকরি স্বয়ংক্রিয়ভাবে না গেলেও বিভাগীয় তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ আইনেই রয়েছে।’
আইনের ৬ ও ৭ ধারা অনুযায়ী, পিতা বা মাতা সরাসরি প্রথম শ্রেণির জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট অথবা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে লিখিত অভিযোগ করতে পারবেন। ওই আদালতই মামলার বিচার করবে। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা হলো, আদালত নিজ উদ্যোগে এ ধরনের মামলা গ্রহণ করতে পারেন না। পিতা বা মাতার লিখিত অভিযোগ ছাড়া মামলা শুরু হওয়ার সুযোগ নেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ কারণেই বহু ঘটনা প্রকাশ্যে এলেও আইনের আওতায় আসে না। অনেক প্রবীণ মা-বাবা সামাজিক লজ্জা, পারিবারিক সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার ভয় কিংবা সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে অভিযোগ করতে চান না।
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির নির্বাহী পরিচালক নূর খান লিটন বলেছেন, মা-বাবার ভরণপোষণ নিশ্চিত করা শুধু আইনি বাধ্যবাধকতা নয়; এটি একটি মৌলিক মানবিক ও নৈতিক দায়িত্ব।
তার মতে, শুধু কারাদণ্ড বা জরিমানার বিধান করলেই সমস্যার সমাধান হবে না; পরিবারে দায়িত্ববোধ সৃষ্টি এবং সামাজিক মূল্যবোধ চর্চার ওপরও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজকে দায়িত্বশীল সন্তান গড়ে তুলতে হবে। কারণ, অধিকাংশ প্রবীণ মা-বাবা আদালতে যেতে চান না; তারা চান সন্তানের দায়িত্বশীল আচরণ।
নুরজাহান বেগমের মৃত্যুর ঘটনা প্রবীণদের নিরাপত্তা, পারিবারিক দায়িত্ববোধ এবং বিদ্যমান আইনের কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান আইনে শাস্তির বিধান থাকলেও অভিযোগ দায়েরের সীমাবদ্ধতা এবং সামাজিক বাস্তবতার কারণে এর ব্যবহার এখনো খুবই সীমিত।
তাদের ভাষ্য, প্রবীণদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে শুধু আইন থাকাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন আইন প্রয়োগ, সামাজিক সচেতনতা, পারিবারিক দায়িত্ববোধ এবং রাষ্ট্রীয় নজরদারির সমন্বিত উদ্যোগ।





