ঝুঁকিতে ভরা রাতের হাতিরঝিল

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
অন্ধকারাচ্ছন্ন সড়ক। দূরে মৃদু আলো। আরও দূরে একটি সড়ক বাতি। হঠাৎ সামনে গর্ত। নিতে হলো ব্রেক। সেই গর্তে বৃষ্টির পানি। ঝলমল করছিল চাঁদের আলো। তারপর কিছুটা এগোতেই চিহ্নহীন গতিরোধকে হোঁচট। গতিরোধকের পাশেও খানাখন্দ। সব মিলিয়ে এ যেন রাতের আতঙ্ক। এই বর্ণনা কোনো গ্রামের মেঠোপথের নয়, নয় কোনো আঞ্চলিক সড়কের। চোখের সামনে যে ছবি ভেসে উঠছে— তা ঢাকার জনপ্রিয় সড়ক হাতিরঝিলের কথা।
এফডিসি পার হলেই গুলশানমুখী হাতিরঝিল রোড। সারা দিনই ব্যস্ত থাকে এই সড়ক। তবে সন্ধ্যা নামলেই যেন ঝুঁকি বাড়ে। আলোর স্বল্পতা, ভাঙাচোরা পিচ, ছোট-বড় গর্ত যেন পরীক্ষা নেয় চালকের। একটু অসাবধান হলেই ঠেলে দেবে দুর্ঘটনার দিকে। এফডিসি থেকে হাতিরঝিলের প্রবেশপথে খানাখন্দ তুলনামূলক কম। তবে এগোতে থাকলেই রাস্তার দশা ক্রমশ বেহাল। প্রতি দুই কদম পর পর যেন একটি গর্ত। কোথাও কোথাও ল্যাম্পপোস্টের খুঁটির নিচে মাথা তুলছে পিচ। রাতের চলাচলে সতর্ক হয়েও এগোবেন সেই অবস্থা নেই। আলোর স্বল্পতায় রাস্তার এসব খাদ সহজে চোখে পড়ে না চালকদের।
একে তো আলোর স্বল্পতা, তার ওপর রাস্তায় নুয়ে আসা গাছ। বাঁক নিতে গেলে দেখা যায় না সামনের কোনো গাড়ি। ফলে যেকোনো সময় ঘটে যেতে পারে বড় দুর্ঘটনা
বেশি সমস্যায় পড়েন নতুন চালকরা। হাতিরঝিলের রাস্তার এমন দশা নতুন নয়। ফলে নিয়মিত যাত্রীরা অনেকটা অভ্যস্ত। তবে এই রাস্তা যাদের অপরিচিত, তাদের কাছে এটি এক আতঙ্ক। তারা জানেন না, রাস্তার কোথায় ভাঙাচোরা পিচ, কোথায় গর্ত। অথচ যেকোনো সময় ঝাঁকুনিতে ঘটতে পারে দুর্ঘটনা। বড় গর্তে আটকে যেতে পারে গাড়ি। ধাক্কা খেয়ে বিকল হয়ে যেতে পারে গাড়ির ইঞ্জিনও।
বনশ্রীর বাসিন্দা রফিক আহমেদ যাচ্ছিলেন মোটরসাইকেল নিয়ে। আগামীর সময়কে বললেন, ‘আমরা যারা নিয়মিত যাতায়াত করি তারা এই রাস্তার কোথায় ভাঙা আছে সেটা জানি। তারপরও অনেক সময় গতিরোধকে চিহ্ন না থাকায় ব্রেক করতে ভুলে যাই। তাহলে যারা এই রাস্তায় নিয়মিত চলাচল করে না তাদের একটু অসাবধানতায় দুর্ঘটনা ঘটা স্বাভাবিক। এ ছাড়া বৃষ্টি হলেই রাস্তার গর্তগুলোতে পানি জমে যায়। এ সময় আরও ঝুঁকি।’
২০১৩ সালে হাতিরঝিল প্রকল্প নির্মাণ শেষে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। ঢাকার তেজগাঁও, গুলশান, বাড্ডা, রামপুরা, মৌচাক, ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার ও মগবাজার এলাকার বাসিন্দাসহ এ পথ দিয়ে চলাচলকারী যাত্রীদের বিশেষ সুবিধা দেওয়ার জন্যই করা হয়েছিল প্রকল্পটি। রাজধানীর যানজট নিরসনের কথাও অগ্রাধিকার পেয়েছিল। এক হাজার ৯৭১ কোটি টাকার এই প্রকল্পটি প্রায় দেড় যুগ পর এসে যেন বেহাল। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণও নেই।
হাতিরঝিল প্রকল্পের নকশার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি ইকবাল হাবিব। তার কাছে আগামীর সময় জানতে চেয়েছিল এসবের দায় কে নেবে, সমাধানের পথ কী? উত্তরে তিনি বলছিলেন, ‘হাতিরঝিলের এই দুর্দশা অনেক দিনের। সমস্যা দৃশমান থাকলেও সমাধানের কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। (সমাধানের) দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের। এটি জনবান্ধব করতে রাজউক পরিকল্পনা করেছে; কিন্তু কোনো বাস্তবায়ন নেই। তাই ঝুঁকিও থেকে গেছে।’
চালকদের অভিযোগ, সবচেয়ে ঝুঁকিতে পড়তে হয় হাতিরঝিল রোডের ব্রিজে উঠলে। রোডটি হয়ে যেতে দুটি ব্রিজ। দুটিতেই ল্যাম্পপোস্ট। তবে বাতি জ্বলে না। প্রথম ব্রিজটির ল্যাম্পপোস্টগুলো সব অচল। দ্বিতীয় ব্রিজে জ্বলে একটি। দুটি ব্রিজ মিলে রয়েছে একটি মাত্র বাতি। ব্রিজ দুটিতে উঠতেই ঘিরে ধরে অন্ধকার। দুই ধারে রোপণ করা আছে শোভাবর্ধনকারী গাছ। তবে এ গাছগুলোর পরিচর্যাও হয় না ঠিকঠাক। ডালপালা বেড়ে নুয়ে এসেছে রাস্তা পর্যন্ত।
রাস্তার পাশ ধরে মোটরসাইকেল চালালে ডালপালা লেগে যায় চালকের সঙ্গে। অনেক ক্ষেত্রে গাছগুলো ঢেকে দিয়েছে বাঁকের সামনের রাস্তা। একে তো আলোর স্বল্পতা, তার ওপর রাস্তায় নুয়ে আসা গাছ। বাঁক নিতে গেলে দেখা যায় না সামনের কোনো গাড়ি। ফলে যেকোনো সময় ঘটে যেতে পারে বড় দুর্ঘটনা। মৃত্যু ঝুঁকি তো আছেই।
চালক ও পথচারীরা বলছেন, পুরো রাস্তার অধিকাংশ স্পিডব্রেকারে নেই দৃশ্যমান দাগ। এতে চালকরা বুঝতেই পারেন না স্পিডব্রেকার কোথায়। আগে থেকে ব্রেক কষার সময়ই পান না চালকরা। ফলে গতি ধরে রাখলে দুর্ঘটনার শিকার হয় গাড়ি।
অবকাঠামো বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোয়াজ্জেম হোসেন মনে করেন, ‘বর্ষাকালে হাতিরঝিল ডেঞ্জার জোনে পরিণত হয়। আবার এই সময় মেরামতের উদ্যোগও কাজে আসে না। আরও কয়েক মাস আগে এগুলো ঠিক করা উচিত ছিল। আর পর্যাপ্ত আলো আছে কিনা সেই তদারকি করা সিটি করপোরেশনের নিয়মিত কাজ।’
এসব নিয়ে কথা বলতে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট বিভাগের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে কোনো সাড়া মেলেনি।






