ক্রেতা কমে অস্তিত্ব সংকটে পুরনো শপিং মলগুলো
- রাজধানীর কাকরাইলের কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি শপিং কমপ্লেক্স বন্ধ
- ধুঁকছেন ইস্টার্ন প্লাজা ও পলওয়েল সুপার মার্কেটের ব্যবসায়ীরা
- অর্থনীতিতে গতি ফিরলে দিন বদলাবে, আশা মালিক সমিতির

কয়েক বছরে নিত্যপণ্যের সঙ্গে গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানির দামও বেড়েছে। কিন্তু সেভাবে আয় না বাড়ায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে মানুষের কেনাকাটায়ও। যার সরাসরি ভুক্তভোগী রাজধানীর বিভিন্ন শপিং মল। ক্রেতা সংকটে দোকান ভাড়া, ইউটিলিটি ও বিভিন্ন চাঁদা দিয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে ব্যবসায়ীদের। আশঙ্কাজনকভাবে কমছে গ্রাহক, বন্ধ হচ্ছে জনপ্রিয় ও পুরনো শপিং মল।
‘কয়েক বছর ধরেই ব্যবসায় মন্দা। আর গত বছরের তুলনায় এ বছর পরিস্থিতি তো আরও খারাপ,’— বলছিলেন রাজধানীর হাতিরপুলের ইস্টার্ন প্লাজার তরুণিমা ফ্যাশনের মালিক মোহাম্মদ সারোয়ার। ব্যবসার কথা বলতে গিয়ে তার কণ্ঠ ভারী হয়ে এলো নানামুখী হতাশায়।
ইস্টার্ন প্লাজার শুরুটা ১৯৯২ সালে। সাড়ে চারশ দোকান নিয়ে চালু হয় বিপণিবিতানটি। ‘শপিংয়ে মজা, ইস্টার্ন প্লাজা’— এমন বিজ্ঞাপন তখন দেখা যেত টেলিভিশনের পর্দায়। শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, চলন্ত সিঁড়ি, ক্যাপসুল লিফটে আধুনিক এই বিপণিকেন্দ্র হয়ে উঠেছিল কেনাকাটার আকর্ষণীয় গন্তব্য। কারণ তখনো বসুন্ধরা সিটি কিংবা যমুনা ফিউচার পার্কের মতো আধুনিক মার্কেট হয়নি ঢাকায়। কিন্তু সময় বদলেছে। ঢাকায় হয়েছে অসংখ্য শপিং মল। মানুষও পেয়েছেন নিত্যদিনের কেনাকাটার বিকল্প জায়গা। ফলে ইস্টার্ন প্লাজা হারিয়েছে পুরনো সে আবেদন।
এই মার্কেটের তৃতীয় তলায় ১৬ বছর ধরে পোশাকের দোকান চালাচ্ছেন সারোয়ার। তবে কয়েক বছর ধরে ক্রেতা যে হারে কমেছে, তাতে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা যাবে কি না, তা নিয়ে সন্দিহান তিনি।
হাতিরপুলের ইস্টার্ন প্লাজার কাছাকাছি সময়ে ঢাকায় জমজমাট বিপণিকেন্দ্রগুলোর মধ্যে ছিল আলপনা প্লাজা, পলওয়েল সুপার মার্কেট, কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি শপিং কমপ্লেক্স। এর মধ্যে কাকরাইলের কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি শপিং কমপ্লেক্স গত মাসেই বন্ধ হয়ে গেছে। বাকিগুলো এখনো চালু থাকলেও ধুঁকছে। ব্যবসায়িক পরিবেশও অনুকূল নয় বলে দাবি দোকান মালিকদের। তাদের ভাষ্য, অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে লড়াই করছেন তারা।
কেন এসব বিপণিবিতানের ব্যবসায় মন্দা— এ বিষয়ে জানতে চাইলে তারা বললেন, বিপণিবিতান কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে না পারার বিষয়টি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনলাইনে কেনাকাটার প্রসারও তাদের ব্যবসার পরিধি সীমিত করেছে। ক্রেতা না আসার পেছনে দেশের অর্থনীতি গতিশীল না থাকাও দায়ী।
তবে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনের ধারণা ভিন্ন। তিনি আশা করছেন, এখন সব ধরনের ব্যবসায় মন্দা যাচ্ছে। জাতীয় অর্থনীতিতে গতি ফিরলে কয়েক মাসের মধ্যে বদলে যাবে চিত্র।
২৮ বছর পর বন্ধ কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি
চার তলার ওপর সবুজ উদ্যান, চলন্ত সিঁড়ি, ক্যাপসুল লিফট, সিসিটিভি, শিশুদের খেলার পার্ক— এমন সব সুবিধা নিয়ে ১৯৯৮ সালে চালু হওয়া কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি শপিং কমপ্লেক্স বন্ধ হয়ে যায় গত ১ অক্টোবর। এ শপিং মলে এক সময় ১৯৮টি দোকান ছিল। তবে কমতে কমতে বন্ধের আগ পর্যন্ত টিকে ছিল মাত্র ২৩ থেকে ২৫টি। ব্যবসায়ীরা বলছিলেন, উড়াল সড়ক নির্মাণের প্রভাব, মহামারীর সময়ে ব্যবসায় ধস, ক্রেতাদের আস্থার সংকট এবং বড় শপিং মলগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ায় ধীরে ধীরে ক্রেতাশূন্য হয়ে গেছে। এ কারণে মার্কেটটি বন্ধ হয়ে যায়।
ইস্টার্ন প্লাসেও ক্রেতার দেখা নেই
শান্তিনগরের ইস্টার্ন প্লাস শপিং মলেও ক্রেতার উপস্থিতি তেমন দেখা যায়নি। বিপণিবিতানটির নিচতলার কসমেটিকস, হস্তশিল্প ও খেলনার দোকানগুলোতে কিছু ক্রেতা থাকলেও অন্য তলাগুলোতে তেমন ভিড় নেই। কোনো কোনো পোশাকের দোকানে দু-একজন ক্রেতার দেখা মিললেও অধিকাংশ দোকান ছিল প্রায় ক্রেতাশূন্য। সাফিন ফ্যাশনের ব্যবস্থাপক মো. জয়নাল বললেন, পূজার পর থেকে ক্রেতা নেই বললেই চলে। সামনে শীতের পোশাক উঠলে বিক্রি কিছুটা বাড়তে পারে।
এ ছাড়া আলপনা প্লাজা ও পলওয়েলের অবস্থাও প্রায় একই। নেই আগের সেই বেচাকেনা। ব্যবসায়ীরা জানালেন, কয়েক বছর আগেও এখানে ভালো বিক্রি হতো। পরে পণ্য আমদানি সহজ হওয়ায় দেশ জুড়ে আমদানিকারকের সংখ্যা বেড়েছে। পাশাপাশি আশপাশে নতুন নতুন বিপণিবিতান গড়ে ওঠায় পলওয়েল মার্কেটের ব্যবসায় ভাটা পড়েছে।
মোশাররফ ট্রেডার্সের ব্যবসায়ী আজম খান বললেন, নয়াপল্টন এখন রাজধানীর অনেকটা পেছনে পড়ে গেছে। গুলিস্তান স্টেডিয়াম মার্কেট চালু হওয়ার পর ইলেকট্রনিকসের ব্যবসায়ও ধস নেমেছে। আগে ঈদে যে পরিমাণ বিক্রি হতো, এখন তা হয় না। পাইকারি বিক্রি কিছুটা হলেও খুচরা বিক্রি অনেক কমে গেছে।



