চাঁদা-ছিনতাইয়ের মহাকেন্দ্র বাবুবাজার ব্রিজ
- ভোরে মুরগির গাড়ি বিকালে কাঁচাবাজার থেকেও ওঠে চাঁদা
- অটোভ্যান-অটোরিকশা থেকে মাসে আদায় ৮১ লাখ টাকা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
রাজধানীর ব্যস্ততম প্রবেশপথগুলোর একটি বাবুবাজার ব্রিজ। সকাল হলেই গাড়ির সারি, হর্ন আর মানুষের ভিড়ে যেন নাভিশ্বাস ওঠে এখানে। কিন্তু যানজটের এই দৃশ্যের আড়ালে এখানে গড়ে উঠেছে বহুস্তরের চাঁদাবাজির এক মহাকেন্দ্র। উপরি চলে ছিনতাই। ব্রিজের দুই প্রান্তে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও অটোভ্যানের অবৈধ স্ট্যান্ড, দুপাশে হাঁটার জায়গায় কাঁচাবাজার, ভোরে মুরগিবোঝাই গাড়ি থামিয়ে টাকা আদায় আর সন্ধ্যা নামলে ছিনতাই এখানকার নিত্যকার চিত্র। অভিযোগ রয়েছে, এসব নিয়ন্ত্রণ করছে একাধিক চক্র। তাদের কাছ থেকে নিয়মিত বখরা পান কিছু রাজনৈতিক নেতা ও অসাধু পুলিশ সদস্য।
জানা গেছে, পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর বুড়িগঙ্গার পোস্তগোলা ও বাবুবাজার সেতু দিয়ে যানবাহন চলাচল বেড়েছে। তার ওপর পোস্তগোলা ব্রিজ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর যানবাহনের চাপ খুব বেড়ে যায় বাবুবাজার ব্রিজে। তা ছাড়া গাবতলী, আমিনবাজার, পুরান ঢাকা, সাভার ও গাজীপুরের বাস-ট্রাক, কাভার্ডভ্যানের চালকরা ব্যবহার করছেন এই রুট। এ কারণে আগের চেয়ে কয়েক গুণ যানবাহন চলাচল করছে এই পথে। তবে পরিবহন চলাচলে বড় অন্তরায় ব্রিজে তিন শতাধিক যাত্রীবাহী অটোভ্যান ও প্রায় আড়াইশ সিএনজিচালিত অটোরিকশা রাখার অবৈধ স্ট্যান্ড। এগুলো আবার ব্রিজের ওপর দাঁড়িয়েই যাত্রী তোলে, যাত্রী তোলার জন্য ব্রিজ ঘুরতে থাকায় যানজটের এক অবর্ণনীয় দশা সৃষ্টি হয়।
সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, ব্রিজে চলাচলকারী প্রায় ২৫০ অটোরিকশা থেকে প্রতিদিন ৬০০ টাকা করে মাসে আদায় হচ্ছে প্রায় ৪৫ লাখ টাকা। তিন শতাধিক অটোভ্যান থেকে দৈনিক ৪০০ টাকা করে মাসে আরও প্রায় ৩৬ লাখ টাকা তোলা হয়। অর্থাৎ শুধু এ দুই খাতেই মাসে চাঁদার অঙ্ক দাঁড়ায় প্রায় ৮১ লাখ টাকা।
পরিবহন চালকদের অভিযোগ, ব্রিজের ওপর ও দুই পাশে শত শত অটোভ্যান ও অটোরিকশা দাঁড় করিয়ে রাখায় যানজট হয় ভয়াবহ। ইলিশ পরিবহনের এক চালক জানিয়েছেন, পদ্মা সেতু চালু হওয়া এবং পরে পোস্তগোলা ব্রিজ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বাবুবাজার ব্রিজে পরিবহন চলাচল ১০ গুণ বেড়েছে। তবে বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে অটোভ্যান ও অবৈধ অটোরিকশা।
শতাব্দী পরিবহনের এক চালক জানিয়েছেন, বাবুবাজার ব্রিজে স্ট্যান্ড করে রাখা অটোভ্যান ও অবৈধ অটোরিকশার কারণে যানজট লেগেই থাকছে। তাদের কোনো কিছু বললেই দলবেঁধে এসে মারধর করে। এ ঘটনা বহুবার ট্রাফিক পুলিশকে জানালেও কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। গত কয়েকদিন সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, বাবুবাজার ব্রিজের গোড়ায় ট্রাফিক পুলিশ বক্সের পাশেই সারি করে রাখা হয়েছে শতাধিক অটোরিকশা। এই রাখার জন্য চাঁদা লাগে। অভিযোগ, নির্দিষ্ট টাকা না দিলে ১ হাজার ২০০ টাকার রেকার বিল করা হচ্ছে। ট্রাফিক পুলিশকে এ কাজে সহায়তা করে বিল্লাল, রিপন, রনি, মনির, শাখাওয়াত, ফারুকসহ কয়েকজন। তাদের এই ‘আটক বাণিজ্যের’ ভিডিও ফুটেজ রয়েছে প্রতিবেদকের কাছে।
অটোরিকশায় মাসে ৪৫ লাখ: ব্রিজে উঠতেই ২০ থেকে ২৫টি সিএনজিচালিত অটোরিকশা সব সময়ই স্ট্যান্ড করে রাখা থাকে। এসব অটোরিকশা রাজধানীতে ঢুকতে পারে না। প্রায় ২৫০টি অটোরিকশা ব্রিজে নিয়মিত চলাচল করে।
চালকদের ভাষ্য, প্রতিটি গাড়ি থেকে দিনে ৬০০ টাকা নেওয়া হয়। নতুন গাড়ি যুক্ত করতে অগ্রিম দিতে হয় প্রায় ৩০ হাজার টাকা। স্থানীয়দের অভিযোগ, ফারুক ও বিল্লাল নামের দুজন এ কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করেন। চালকদের দাবি, আগে ব্রিজ পারাপারে জনপ্রতি ভাড়া ছিল ৫ টাকা, এখন নেওয়া হচ্ছে ২০ টাকা। অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় যারা চাঁদা তুলত, তাদের অনেকেই এখনো একইভাবে সক্রিয়।
স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, অটোরিকশা রাখার গ্যারেজ থেকেই এসব চাঁদার নিয়ন্ত্রণ করা হয়। কারণ, এর আগে র্যাব অভিযান চালিয়ে লাইনম্যান মানিককে আটক করার পর থেকেই চাঁদাবাজরা কৌশল পাল্টায়। প্রতিদিন তোলা হচ্ছে ১ লাখ ৫০ হাজার, যা মাসে দাঁড়ায় ৪৫ লাখ টাকা। ব্রিজের দুই পাড়ের কিছু রাজনৈতিক নেতা এ চাঁদার ভাগ পাচ্ছেন। ট্রাফিক ও থানা-পুলিশও ভাগ নিচ্ছে।
অটোভ্যানেও ৩৬ লাখ: ব্রিজের মাঝামাঝি ঢাকার পাশে, সিঁড়ির আশপাশে সিরিয়াল করে রাখা হয় শত শত যাত্রীবাহী অটোভ্যান। প্রতিটি ভ্যান থেকে দৈনিক ৪০০ করে মাসে ওঠে প্রায় ৩৬ লাখ টাকা। রানা ও সাজ্জাদ নামে দুজন চাঁদা তোলেন বলে অভিযোগ।
ভোরে মুরগির গাড়ি, বিকালে কাঁচাবাজার: ভোর হলেই ব্রিজের কেরানীগঞ্জ প্রান্তে মুরগিবোঝাই ভ্যান ও পিকআপ থামিয়ে ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত আদায়ের অভিযোগ রয়েছে আকাশ নামে এক ব্যক্তির চক্রের বিরুদ্ধে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, টাকা দিতে দেরি হলে কখনো কখনো মুরগিও নিয়ে যায় তারা। এক মুরগি ব্যবসায়ী এ প্রতিবেদককে বললেন, ‘দেশটা এখনো চাঁদাবাজের দখলে। আওয়ামী লীগের আমলে ২০ টাকা দিতেন, এখন দিতে হচ্ছে ৫০ থেকে ১০০ টাকা।’ অন্যদিকে ব্রিজের দুপাশে হাঁটার জায়গায় বেলা ৩টা থেকে রাত সাড়ে ১১টা পর্যন্ত কাঁচাবাজার বসিয়ে চাঁদাবাজি করছে একটি সিন্ডিকেট। প্রায় ৬০টি দোকান থেকে প্রতিদিন ২০০ টাকা করে তোলা হচ্ছে বলে অভিযোগ। মাসে প্রায় ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা।
বাজারের আবর্জনা রাতের আঁধারে বুড়িগঙ্গায় ফেলে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। একাধিক মাঝি এ প্রতিবেদককে বলেছেন, রাত ১১টা হলেই কাঁচাবাজারেরর আবর্জনা নদীতে ফেলছে দোকানিরা। কোনো কোনো সময় নৌকার যাত্রী কিংবা মাঝির মাথায়ও পড়ছে।
সন্ধ্যা নামলেই ছিনতাইয়ের আতঙ্ক: চাঁদাবাজির পাশাপাশি বাবুবাজার ব্রিজ এখন ছিনতাইয়েরও আতঙ্ক। আরমানিটোলার কেমিক্যাল ব্যবসায়ী ফয়সাল বললেন, ‘সন্ধ্যায় রিকশায় ওঠার কিছুক্ষণ পর চারজন আমার রিকশা থামিয়ে অস্ত্র দেখিয়ে ৬ হাজার টাকা নিয়ে যায়।’ ইসলামপুরের কাপড় ব্যবসায়ী জাকির জানালেন, তিন দশক ধরে এ এলাকায় ব্যবসা করছেন। আগেও ছিনতাই ছিল, এখন তা আরও বেড়েছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) লালবাগ কোতোয়ালি জোনের বাবুবাজার টিআই বিদ্যুৎ বলেছেন, ‘বাবুবাজার ব্রিজে পরিবহন বেড়েই চলছে। অটোরিকশা ও যাত্রীবাহী অটোভ্যান চলছে। মাঝে মাঝে রেকার করা হচ্ছে। তবে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতার জন্য সামাল দিতে পারছি না। সরকার গেজেট করলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে পারব।’
ডিএমপির লালবাগ বিভাগের ডিসি মুহাম্মদ তালেবুর রহমান বলেছেন, ‘আমরা কয়েকদিন আগে ওই এলাকায় ব্যাপক অভিযান চালিয়ে বেশ কয়েকজন চাঁদাবাজকে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় নিয়ে এসেছি। এ ছাড়া যেসব এলাকায় এ জাতীয় অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে, সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’



